ছেলের কাপড় বুকে জড়িয়ে আছেন মা, ছবি হাতে বাবার কান্না 

দেয়ালে এখনো শুকিয়ে থাকা রক্তের দাগ। আধাপাকা ঘরের ছোট্ট কক্ষে একটি খাট, পড়ার টেবিল, কাপড় রাখার আলনা ও একটি ট্রাঙ্ক—সবই পরিপাটি। এই ঘরেই দিনের বেশির ভাগ সময় কাটান রুবিনা আক্তার। এখানেই তিনি খুঁজে ফেরেন নিহত ছেলে রাকিব হাসানের স্মৃতি। কখনো ছেলের কাপড় বুকে জড়িয়ে থাকেন, কখনো তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র হাতে নিয়ে নির্বাক বসে থাকেন। ঘরের কোনো জিনিস অন্য কাউকে স্পর্শ করতেও দেন না। মাঝেমধ্যেই ঘরজুড়ে ভেসে আসে তার ফোঁপানো কান্না।

ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ঈশ্বরগঞ্জ ইউনিয়নের হাটুলিয়া গ্রামে কাঠমিস্ত্রি মো. আব্দুল ছালামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। রাকিবের ছোট ভাই সাকিবুল হাসান জানান, বড় ভাইকে হারানোর পর থেকে তাদের পরিবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেনি।

ছেলের কথা উঠতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন মা রুবিনা আক্তার। বিলাপ করে তিনি বলেন, আমার রাকিব যেদিন মারা গেছে, সেদিনই আমি মরে গেছি। জীবিকার তাগিদে আমরা স্বামী-স্ত্রী ছোট ছেলে সাকিবুলকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে থাকতাম। রাকিব বাড়িতে একাই থাকত। যাদের বন্ধু মনে করে ঘরে আনত, তারাই আমার সর্বনাশ করেছে। এখন শুধু ছেলের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বিচারের অপেক্ষায় বেঁচে আছি। 

পাশেই বসে ছিলেন বাবা আব্দুল ছালাম। ছেলের একটি ছবি হাতে নিয়ে তিনি হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। সন্তান হারানোর শোক যেন এখনো তাদের প্রতিটি মুহূর্তকে তাড়া করে ফিরছে।

পরিবার জানায়, রাকিব ২০২৩ সালে স্থানীয় হাটুলিয়া দাখিল মাদরাসা থেকে দাখিল পরীক্ষা দেওয়ার পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যাননি।

২০২৫ সালের ৯ জুলাই রাতে হাটুলিয়া গ্রামের নিজ বাড়ির বসতঘরে বিছানার ওপর গলাকেটে ও কুপিয়ে হত্যা করা হয় রাকিবকে। পরদিন বিকেলে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আব্দুল ছালাম বাদী হয়ে চারজনকে আসামি করে ঈশ্বরগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন।

তবে ঘটনার প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো মামলার চার্জশিট দাখিল হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে।

এরই মধ্যে নতুন করে বিপাকে পড়েছে পরিবারটি। আব্দুল ছালামের অভিযোগ, ছেলের বিচার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে পার্শ্ববর্তী সৈয়দ ভাকুরী গ্রামের প্রয়াত আব্দুল মান্নানের ছেলে শামছুল হুদা মারুফ তার কাছ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এখন টাকা ফেরত চাইলে উল্টো মামলা দিয়ে হয়রানির ভয় দেখানো হচ্ছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আব্দুল ছালাম বলেন, আমার ছেলেকে তো হত্যা করেছেই, এখন মামলার এক নম্বর আসামি জুবায়েরের বাবা আমাকে মামলা নিয়ে আর ঘাঁটাঘাঁটি না করতে হুমকি দিচ্ছে। আর বিচার পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে মারুফ আমার কাছ থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। বিচার তো পাচ্ছিই না, উল্টো আসামিরা জামিনে আছে। টাকা চাইলে এখন আমাকে মামলার ভয় দেখানো হচ্ছে। ছেলেকে হারিয়ে পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। তবুও মৃত্যুর আগে ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দেখে যেতে চাই। 

জানা গেছে, এ হত্যা মামলায় নিহতের মামাতো ভাই জুবায়ের হাসান (১৯), বন্ধু কাউসার আহমেদ (২০) ও জয়নাল (২১) গ্রেপ্তার হলেও বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন। অপর আসামি সাকিব মিয়া (২০) এখনো পলাতক।

ঈশ্বরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল আজম বলেন, রাকিব হাসান হত্যা মামলায় তিনজন আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। মামলার তদন্তকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে। পরিবারকে কেউ হুমকি দিয়ে থাকলে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।