আমাদের দেশে বলবানদের লোভের গ্রাসে দখল, বৃক্ষনিধন কিংবা প্রাকৃতিক কারণ ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের দায়িত্বহীনতায় বনভূমির বিপন্নতার চিত্র নতুন কিছু নয়। এর বিরূপ প্রভাবে রুষ্ট হচ্ছে প্রকৃতি, একই সঙ্গে পরিবেশ ও মানুষের সুরক্ষায় ক্রমেই বিপর্যস্ততার ছায়াও হচ্ছে প্রলম্বিত। কক্সবাজারের চকরিয়ার বনভূমি ক্রমেই কীভাবে বিলীন হচ্ছে, এই চিত্র উঠে এসেছে ১ জুলাই দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, চকরিয়ায় বন বিভাগের আওতাধীন ৪২ হাজার ৭২১ একর বনাঞ্চলের অন্তত ৪০ শতাংশ ইতিমধ্যে বেদখল হয়ে গেছে। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, কৃষি ও ফলের বাগান সম্প্রসারণ, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং দীর্ঘদিনের দখলদারির কারণে সংকুচিত হচ্ছে বনের পরিধি।
চকরিয়ার হারবাং, ফাঁসিয়াখালী, ডুলাহাজারা, খুটাখালী এবং এর সংলগ্ন বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে ধাপে ধাপে বনভূমি দখলের যে প্রবণতা গড়ে উঠেছে তাতে ওই বনের অস্তিত্ব সংকট প্রকট হয়ে উঠছে। চকরিয়ার বনের ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; সারা দেশেই সংরক্ষিত ও সামাজিক বনাঞ্চলের চিত্র প্রায় একই। বন উজাড় করে, পাহাড় কেটে বসতি গড়ে, কোথাও বলবানরা নিজেদের লাভালাভের অঙ্ক কষে যে অপকর্মে মেতে উঠেছেন তা আত্মঘাতীর নামান্তর। মনে রাখা দরকার, সংরক্ষিত ও সামাজিক বনায়ন হলো দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। সংরক্ষিত বনাঞ্চল সরকারি নিয়ন্ত্রণে কঠোরভাবে সংরক্ষিত থাকার কথা, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যত্যয় ঘটছে। অন্যদিকে সামাজিক বনায়নে স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের জীবনমান উন্নয়নের কাজ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত থাকলেও তাও যে যথাযথভাবে প্রতিপালিত হচ্ছে না, এরও নজির আছে অনেক। বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের যূথবদ্ধতায় বনের ওপর বহুমাত্রিক অভিঘাত লাগছে।
চকরিয়ার বন দখলের ব্যাপারে কক্সবাজার উত্তর ও চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের কর্মকর্তারা দেশ রূপান্তরে যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, একই সঙ্গে প্রতিকারের জন্য শুনিয়েছেন গৎবাঁধা কথা। ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিংবা বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে, সরকারি অনেক দায়িত্বশীলের এমন কথার জটাজালের বিষয়গুলোও অজানা নয়। জবাবদিহি কিংবা দায়িত্বহীনতার ঘাটতির বিরূপ ফল কী হতে পারে, চকরিয়ার বন এরই একটি দৃষ্টান্ত। অরণ্যের ভূমিকাই শুধু নয়, অরণ্যের ওপর অভিঘাত লাগলে অকল্যাণের কথা কীভাবে বলে তা আত্মস্থ করার যে গভীরতা দরকার তা ধারণ করার মতো মানুষের সংখ্যা সমাজে অগণিত নয়। বন-বৃক্ষ-নদী অর্থাৎ প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গগুলোর বিপন্নতা-বিপর্যস্ততার জন্য কতিপয়ের অপরিণামদর্শিতায় মানুষ-জীববৈচিত্র্য-পরিবেশ বিপন্ন হতেই থাকবে আর প্রতিকারের বিষয়টি ‘হবে’, ‘হচ্ছে’র বৃত্তবন্দি থাকবে তা হতে পারে না।
আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে বনভূমি থাকা উচিত ২৫ শতাংশ, কিন্তু সেখানে বনভূমি রয়েছে ১৬ শতাংশ। এই ঘাটতি কাটিয়ে ওঠার উদ্যোগ-আয়োজন যে বহুক্ষেত্রেই শুধু উচ্চারণ অথবা আয়োজনসর্বস্ব, এও অসত্য নয়। জাতীয় বন নীতিতে বনভূমি সংরক্ষণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও বাস্তবায়ন ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে দেশের বনভূমি পড়েছে ধ্বংসের মুখে। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘অরণ্যের কোনো চাহিদা নেই, কিন্তু তা নিঃস্বার্থভাবে তার জীবনের সবকিছু উজাড় করে দেয়। এমনকি যে কুঠার দিয়ে তাকে কাটা হয়, তাকেও সে ছায়া দিয়ে আশ্রয় দেয়।’ আর খ্যাতিমান অস্ট্রেলীয় গবেষক, লেখক ও বিজ্ঞানী বিল মলিসন বলেছেন, ‘আপনি যদি বনভূমি হারিয়ে ফেলেন, তবে আপনি আপনার একমাত্র শিক্ষককেও হারিয়ে ফেলবেন।’
আমাদের বক্তব্য বন ও বনসম্পদ অর্থাৎ মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সংরক্ষিত ও সামাজিক বনাঞ্চলের ব্যবস্থাপনায় মনোযোগ বাড়াতেই হবে। বন উজাড়-দখল বন্ধে প্রতিশ্রুতিই নয়, মাঠপর্যায়ে বন রক্ষা ও বন পুনর্জন্মের নীতিগত সিদ্ধান্ত সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি। এসব নিয়ে কথা হয়েছে বিস্তর, এবার আমরা কাজের কাজ দেখতে চাই। ‘বৃক্ষ তোমার নাম কী ফলে পরিচয়’, চাই এ প্রবাদের দৃশ্যমান প্রতিফলন। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, জাতীয় বন নীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বাইরে গিয়ে অনেক সময় রাজস্বকেন্দ্রিক অবস্থানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। গুরুত্ব দিতে হবে প্রতিটি অঞ্চলের স্বতন্ত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত প্রয়োজনীয়তাকে। চকরিয়ার দখলকৃত বনভূমি উদ্ধারে নির্মোহ অবস্থান নিতে হবে।