পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজনীতি

পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি ও সমাজনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এ নিয়ে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হচ্ছে, কোন কোন বদল নিয়ে আপনি বেশি জানতে আগ্রহী বা কোনটি না জানলেও, আপাতত চলবে। দুমাসের কম সময়ের মধ্যে নতুন বিজেপি সরকার, একের পর এক নতুন নতুন যে কর্মসূচি নিচ্ছেন, তার তালিকা দীর্ঘ। এই ডাবল ইঞ্জিন সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে, দ্রুততার সঙ্গে রেলস্টেশন থেকে বুলডোজার চালিয়ে যেভাবে হকার উচ্ছেদ করতে শুরু করে, তা অভাবনীয় না হলেও, কিঞ্চিৎ দৃষ্টিকটু। এই হকারদের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অন্তত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কয়েক হাজার পরিবারের রুজি-রোজগার। দমদম, বালি, চন্দননগর, পার্ক সার্কাস সব জায়গায় রেলের জমিতে ‘আইনিভাবে দখল’ করার  ‘অপরাধে’ হকারদের বিকল্প পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে, রাতারাতি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার স্বল্প পুঁজির তিলেতিলে গড়ে ওঠা স্বপ্ন। নতুন আইন আনতে চলেছে সরকার। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে। সরকার যদি কাউকে দেশের পক্ষে বিপজ্জনক মনে করে, তবে তাকে এফআইআর ছাড়াই, বিনা বিচারে গ্রেপ্তার করতে পারে।  শোনা যাচ্ছে, লাভজেহাদ বা বিভিন্ন বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আসতে চলেছে। ইতিমধ্যেই ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ চালুর প্রস্তাব এসেছে। এই বিধি অবশ্য দীর্ঘদিন ধরে, বিজেপির ঘোষিত নীতি। এক দেশে সব সম্প্রদায়ের জন্য এক আইন, এক নীতি। সমস্যা হচ্ছে, যে আপাতভাবে অভিন্ন প্রশ্নে কারু কোনো দ্বিমত নেই, থাকতেও পারে না। বিজেপির মূল সমর্থক, বিপুল সংখ্যক মধ্যবিত্ত সোচ্চারে বলতে শুরু করেছে যে, এক দেশে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের আলাদা আলাদা আইন রাখার যৌক্তিকতা নেই। এদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন, সরকারের তল্পিবাহক কয়েকজন জাতীয়তাবাদী মুসলিম বুদ্ধিজীবী। ‘জাতীয়তাবাদ’ শব্দের জনক মূলত মূলধারার মিডিয়া। না হলে অন্য মুসলিম বা খ্রিস্টান জনগোষ্ঠীর লোকজন, কোন জাতির সমর্থক তা কিন্তু স্পষ্ট নয়। ভারতে আইন সাধারণভাবে দুটি। ফৌজদারি ও দেওয়ানি। ফৌজদারি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক। ধরুন, একজন মুসলিম ডাকাতি করলেও যা বিচার পাবে, হিন্দু ডাকাতি করলেও আইনি পদ্ধতি থাকবে এক। জমি, সম্পত্তি, পারিবারিক বা অন্যান্য দেওয়ানি বিষয়েও আইন অভিন্ন। শুধু দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব কিছু রীতি নীতি, কাস্টমস, প্রথা বহু বছর ধরে আলাদা। এ শুধু মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রে নয়। হিন্দুদের মধ্যে, বাঙালি ও জৈনদের আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে  আদিবাসীদের মধ্যে তো আছেই। যদিও বলা হচ্ছে, বিজেপি আদিবাসী, জনজাতির আলাদা আইন সংশোধন করবে না। তাহলে কি শুধুই নির্দিষ্ট একটি সম্প্রদায়ের দিকে তাকিয়ে সংস্থা! ধরে নিলাম, আইন করে সবার সমানাধিকার হলো। মুসলমান বিবাহে যে ‘দেনমোহর’ ব্যবস্থা আছে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটলে গচ্ছিত অর্থ প্রক্রিয়ার কী হবে!  নতুন করে পশ্চিমবঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পুনরুত্থান ঘটেছে। জুন মাসের ২০ তারিখ ঘটা করে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালিত হলো। স্কুলে স্কুলে শিশুদের মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ চিন্তা চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ইতিহাস পুনর্পাঠ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু লোকবিশ্বাস আর ইতিহাস এক নয়। এটা ঠিক যে, ভারত ভাগ না হলেও বাংলা ভাগ চেয়েছিলেন শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভা। পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের হিন্দু নেতাদের অনেকে, এর বিরোধিতা করেছিলেন। অখিল দত্ত, সত্যরঞ্জন বক্সী, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখ বহু হিন্দু নেতার আশঙ্কা ছিল, দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে পাকাপাকি বিচ্ছেদ ভবিষ্যতে অনেক ধরনের জটিলতার জন্ম দেবে। দুই বঙ্গের দিকে তাকালে বোঝা যায়, একুশ শতকের ছবি ক্রমে ক্রমে যেন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের রাজনীতিবিদরা, কালনেমির লঙ্কা ভাগের নেশায় মানুষের স্বার্থ বিস্মৃত হন। গণতন্ত্রের বড় শর্ত-বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা। দুনিয়ায় তা আজ নিছক আভিধানিক শব্দ হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি, ভারতের স্কুল পাঠ্য থেকে ফরাসি, রুশ বিপ্লবের আখ্যান তুলে দেওয়া হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী নাকি বলেছেন, মোগল পাঠান নাম কলকাতার রাস্তা থেকে মুছে ফেলা হবে। তারা পেছনে ফিরতে ফিরতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব, কে জানে! যে হিন্দু ধর্মের জয়ধ্বনি দিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি ক্ষমতায় এসেছে, সেই ধর্ম কোনো দিন একমাত্রিক নয়। শৈব, বৈষ্ণব, চার্বাকপন্থি, নৈয়ায়িক বহু মতবাদের আধার হিন্দু ধর্ম। বাংলা ভাষা প্রসারে মুসলিম শাসকদের ভূমিকা কম নেই। গৌড়াধিপতি হুসেন শাহ ছিলেন সমন্বয়বাদী। বাংলার ইতিহাসে, বৌদ্ধদের অবদান যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের মসনদে বিজেপি আসীন হওয়ার পর থেকে, আগেই বলেছি রাজনীতি, সমাজনীতিতে দ্রুত পরিবর্তন ঘটছে। অর্থনীতির কথা এখনো স্পষ্ট না হলেও, গরু বেচাকেনা নিয়ে নিষেধাজ্ঞার জেরে গ্রামীণ অর্থনীতি যে বিপাকে, তা এর মধ্যেই পরিষ্কার।

আশঙ্কা সব থেকে বেশি বহুত্ববাদী সংস্কৃতি নিয়ে। ছোটখাটো অনেক ঘটনার মধ্য দিয়ে মনে হচ্ছে শাসকের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, অভিরুচি জোর করে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ‘সংস্কৃতি’ বলে চালিয়ে দেওয়ার লক্ষণ সুবিধার নয়। কিছু ক্ষেত্রে মনে হচ্ছে, আগামী দিনে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসেও বদল আসবে। আমিষ বনাম নিরামিষ দ্বন্দ্ব খবরের শিরোনাম হচ্ছে।  সব থেকে উদ্বেগজনক হলো, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি হিন্দুদের বড় অংশের মধ্যে, রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের ন্যারেটিভ গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মিডিয়া এবং সোশ্যাল মিডিয়া দেখলে আতঙ্কিত হতে হয়। তবে হতাশার মধ্যেও বহু কিছু ইতিবাচক ঘটনাও চোখে পড়ে। সাতাশ লাখ ভোটারের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিন্তু অনেকে সোচ্চার হচ্ছেন। ঠিক যেমন বুলডোজার সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে দেখছি, সব ধর্মের মানুষকে। বিপদের দিনেই বন্ধু চেনা যায়। সব মিলিয়ে এটা ঠিক, পশ্চিমবঙ্গ এক নতুন অধ্যায়ের মুখোমুখি। মাঝেমধ্যে ছবিটা কেমন যেন ১৯৪৬ মনে করাচ্ছে। শ্যামাপ্রসাদ চর্চার পাশাপাশি চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু ও শরৎচন্দ্র বসুর কথা বেশি করে সামনে আসুক। আবুল হাশিমদের কথা বলে বিতর্কে গেলাম না।

লেখক : ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা ও লেখক, কলকাতা। 

sdastidar27@gmail.com