চল্লিশ বছরের দীর্ঘ খরা, সাত-সাতটি নকআউট পর্বের টানা ব্যর্থতার অভিশাপ আর সবশেষে মাঠের বুকে আছড়ে পড়া বজ্রঝড়; কোনো কিছুই দমাতে পারল না অপ্রতিরোধ্য মেক্সিকোকে। মেক্সিকান বা স্পানিশ ভাষায় একটি শব্দ আছে ‘আনসিয়া’; যার অর্থ দীর্ঘ অপেক্ষার পর তৈরি হওয়া এক তীব্র ব্যাকুলতা। চার দশক ধরে মেক্সিকান ফুটবলের বুকে চেপে থাকা সেই চেনা ‘আনসিয়া’ আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটল মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক এস্তাদিও আজতেকা স্টেডিয়ামে। ৮০ হাজারেরও বেশি উন্মাল দর্শকের সামনে ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ১৬-তে পা রাখল স্বাগতিকরা। ১৯৮৬ সালের পর এই প্রথম বিশ্বমঞ্চের নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচ জিতল ‘এল ত্রি’রা। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম কনকাকাফ অঞ্চলের দল হিসেবে নকআউট ম্যাচে লাতিন আমেরিকার কোনো পরাশক্তিকে বিদায় করার নতুন রেকর্ডও গড়লো তারা।
বজ্রপাতের কারণে খেলা শুরুর নির্ধারিত সময় এক ঘণ্টা পিছিয়ে গেলেও গ্যালারির সবুজ সমুদ্রের গর্জন বিন্দুমাত্র কমেনি। উল্টো ম্যাচের শুরু থেকেই ইকুয়েডরকে চেপে ধরে স্বাগতিকরা। ম্যাচের ২২ মিনিটে রবার্তো আলভারাডোর রক্ষণচেরা পাস থেকে বল পেয়ে ইকুয়েডরের হাই-প্রেসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জালে জড়ান হুলিয়ান কিনোনিয়োস। টুর্নামেন্টে এটি তার তৃতীয় গোল। এর ঠিক ৯ মিনিট পর, ৩১ মিনিটে ইকুয়েডর রক্ষণভাগের ভুলের সুযোগ নিয়ে কিনোনিয়োসের সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করে বক্সের কোনা থেকে জোরালো শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড রাউল জিমেনেজ। এই গোলের মাধ্যমে দেশের হয়ে ৪৭টি গোল করে কিংবদন্তি জ্যারেড বোরগেত্তিকে ছাড়িয়ে গেলেন জিমেনেজ।
ম্যাচ শেষে মেক্সিকোর ডাগআউটে চার দশক আগের স্মৃতি রোমন্থন করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৬৭ বছর বয়সী কোচ হাভিয়ের আগুয়েরে। কেননা, ১৯৮৬ সালের সেই বিশ্বকাপে তিনি ফুটবলার হিসেবে ছিলেন মেক্সিকোর দলে। ঘরের মাটিতে সেবার কোয়ার্টার ফাইনালে টাইব্রেকারে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নিয়েছিল মেক্সিকো। ৪০ বছর এবার আগুয়েরে মেক্সিকোর ডাগআউটে এবং আরও একবার বিশ্বকাপ তার দেশেই। সেখানে রোমাঞ্চকর এই জয়ের পর আগুয়েরে বলেন, ‘আজতেকা স্টেডিয়ামকে এই রূপে দেখার জন্য আমাকে প্রায় ৪০ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমি ক্যারিয়ারে অনেক বড় বড় জয় পেয়েছি, কিন্তু আজকের মতো জয় একটিও ছিল না। কারণ আজ আমরা নিজেদের মাটিতে আমাদের সমর্থকদের সামনে খেলেছি, যারা দলের জন্য মাঠে নিজেদের হৃদয় উজাড় করে দিয়েছিল।’
দ্বিতীয়ার্ধে হাজার হাজার মেক্সিকান সমর্থক গ্যালারিতে সমস্বরে সেøাগান তুলতে শুরু করেন ‘ই সি সি?’ (যার অর্থ : ‘যদি এবার সত্যিই তেমন কিছু ঘটে?’)। সমর্থকদের বুক বাঁধার এই অবিশ্বাস্য বিশ্বাসের মর্যাদা মাঠের বুকেও ধরে রেখেছিল মেক্সিকোর ইস্পাতকঠিন রক্ষণভাগ। গ্যালারির সেই আবেগকে ভরসা দিয়ে পুরো টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত চার ম্যাচ খেলে আটটি গোল করলেও নিজেদের জালে একটি বলও জড়াতে দেয়নি মেক্সিকান ডিফেন্স। আর মাঠের সেই জমাট রক্ষণকে যখন ডাগআউট থেকে হাভিয়ের আগুয়েরে নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত করছিলেন, তখনই ফুটবল রোমান্টিকদের মনে দোলা দিয়ে যায় আরেকটি রূপকথা; মাত্র ১৭ বছর ২৫৯ দিন বয়সে মাঠে নেমে কিংবদন্তি পেলের পর বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে সবচেয়ে তরুণ খেলোয়াড় হিসেবে শুরুর একাদশে খেলার এক অনন্য নজির গড়েন মেক্সিকোর বিস্ময়বালক গিলবার্তো মোরা।
এদিকে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে প্রতিপক্ষের সঙ্গে তর্কের সময় নিয়ম ভেঙে মুখ হাত দিয়ে চেপে ধরায় ইকুয়েডরের ডিফেন্ডার পিয়েরো হিনকাপিয়েকে লাল কার্ড দেখতে হলে ১০ জনের দলে পরিণত হয় ইকুয়েডর। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারিতে মেক্সিকোর ঐতিহ্যবাহী মারিয়াচি গান ‘এল রে’ (দ্য কিং) বেজে ওঠে এবং থামে তাদের ৪০ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা।
অন্যদিকে, গ্রুপ পর্বে জার্মানিকে হারিয়ে রূপকথা তৈরি করা ইকুয়েডরের বিদায়টা ছিল বেশ করুণ। এই হারের পর ইকুয়েডরের কোচের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দেন সেবাস্তিয়ান বেকসেসে। বিদায়বেলায় তিনি বলেন, ‘বিশ্বকাপের সাথেই আমার চুক্তি শেষ হয়ে গেছে। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, ইকুয়েডরের ইতিহাসে এটিকে সেরা বিশ্বকাপ বানানোর, তা আমরা পূরণ করতে পারিনি। তাই আজ আমার বিদায় নেওয়ার পালা। প্রথমার্ধে মেক্সিকো আমাদের পুরোপুরি বোতলবন্দি করে রেখেছিল।’
এখন আজতেকাজুড়ে কেবলই স্বপ্নের ফানুস ওড়ানোর দিন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২ হাজার মিটারেরও উঁচুতে অবস্থিত এই দুর্ভেদ্য দুর্গে মেক্সিকানদের দীর্ঘ চল্লিশ বছরের দীর্ঘশ্বাস ধুয়ে গেছে এক পশলা বজ্রবৃষ্টিতে। শেষ বাঁশির পর লাউডস্পিকারে যখন মারিয়াচি সুর বাজছিল, তখন গ্যালারির হাজারো চোখ লস অ্যাঞ্জেলেসের আতশবাজির মতোই রঙিন হয়ে উঠেছিল। সেই আলোর রোশনাই গায়ে মেখে, ইতিহাস আর আবেগের ডানায় ভর করে আগামী ৮ জুলাই এই আজতেকাতেই মেক্সিকো মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড কিংবা কঙ্গোর। দীর্ঘ অভিশাপের আগল ভেঙে ‘এল ত্রি’রা এখন প্রস্তুত তাদের আজন্ম আরাধ্য সেই স্বপ্নকে আরও এক ধাপ ওপরে নিয়ে যেতে।