ব্রিফিংয়ে চীনা রাষ্ট্রদূত

অর্থনৈতিক করিডরের সুযোগ শেষ হয়নি অন্যদের জন্যও খোলা

আঞ্চলিক সংযোগের ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে নিয়ে অর্থনৈতিক করিডর গঠনে বেইজিং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তবে এ উদ্যোগে অন্য দেশগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার চীনা দূতাবাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর নিয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ কথা বলেন। খবর ইউএনবি

রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, ‘এ সহযোগিতাই শেষ কথা নয়; আমরা উন্মুক্ত এবং অন্য দেশগুলো যদি প্রস্তুত থাকে, আমরা তাদেরও স্বাগত জানাই। তবে তারা এর অংশ হতে চায় নাকি আরও কিছু সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে চায়, তা সম্পূর্ণ তাদের সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিক করিডর গঠনে চীন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’

১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) ফোরামের অধীনে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক করিডর ধারণার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি এ মন্তব্য করেন। রাষ্ট্রদূত বলেন, অর্থনৈতিক করিডর নির্মাণের বিষয়টি নতুন নয়। এর আগে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে আলোচনা হলেও তাতে অগ্রগতি হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমার বিশ্বাস মিয়ানমারও এ ধরনের সহযোগিতা চায়। আমাদের তিন দেশ মিলে এ সংযোগ (অর্থনৈতিক করিডর) গড়ে তুলতে পারব।’

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে কুনমিং থেকে বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বহুমাত্রিক (মাল্টিমোডাল) যোগাযোগব্যবস্থা জোরদার এবং চীন-বাংলাদেশ-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, এটি সম্পূর্ণ সফল একটি সফর। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটি একটি মাইলফলক, যা সম্পর্ককে এক নতুন কৌশলগত উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘এ সফর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের উন্নয়নে শক্তিশালী গতি সঞ্চার করেছে। দুই দেশের মধ্যে নতুন মাত্রার পারস্পরিক আস্থা তৈরি হয়েছে।’

তিস্তা প্রকল্পে চীনের অবস্থান অপরিবর্তিত : তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প (টিআরসিএমআরপি) প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। কারণ এ প্রকল্পের সঙ্গে লাখো মানুষের জীবিকা জড়িত। তিনি বলেন, ‘তিস্তা বাংলাদেশের প্রকল্প। এটি আপনাদের প্রকল্প।’ ইয়াও ওয়েন জানান, সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি গোয়িংয়ের বৈঠকে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

নদী ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ পরিকল্পনা, বন্যা প্রতিরোধ, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জনবল প্রশিক্ষণে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চীন প্রস্তুত উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘একটি বিষয় আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই তিস্তা প্রকল্পের প্রতি চীনের প্রতিশ্রুতি অপরিবর্তিত রয়েছে।’

রাষ্ট্রদূত জানান, তিস্তা প্রকল্পে চীন তাদের সক্ষমতার মধ্যে সহায়তা অব্যাহত রাখবে এবং সম্ভাব্যতা সমীক্ষাসহ সংশ্লিষ্ট কাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের সহযোগিতা করবে।

নতুন কৌশলগত সংলাপ ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা : রাষ্ট্রদূত বলেন, সফরের গুরুত্বপূর্ণ অর্জনের মধ্যে রয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ চালু এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষাবিষয়ক ‘২+২’ সংলাপ কাঠামো চালুর বিষয়ে আলোচনা। এ ব্যবস্থাগুলো দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত যোগাযোগের জন্য একটি শক্তিশালী এবং আরও স্থিতিশীল প্ল্যাটফর্ম প্রদান করবে। তবে কোনো নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয় নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের সফর, সুশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদারে সম্মত হয়েছে।

জিডিআই ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক : রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন সবসময় বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী নীতিতে অবিচল রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব পরিস্থিতি যেমনই পরিবর্তিত হোক না কেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের বিষয়ে চীন তার অঙ্গীকার থেকে সরে আসবে না। বাংলাদেশ সবসময় চীনের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার থাকবে।’

তিনি জানান, গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (জিডিআই) ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস’-এ বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়েছে চীন এবং এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক কার্যকর করতে একসঙ্গে কাজ করবে।

নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি : ইয়াও ওয়েন বলেন, এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো বাংলাদেশ-চীনের বিদ্যমান সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে উন্নীত করে ‘নতুন যুগের অভিন্ন ভবিষ্যতের চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গঠনের সিদ্ধান্ত। তার ভাষায়, এটি এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্কের সর্বোচ্চ স্তরের কাঠামো।

রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, ‘দুই দেশের নেতারা আন্তরিক ও ফলপ্রসূ আলোচনা করেছেন। তারা গুরুত্বপূর্ণ নতুন ঐকমত্যে পৌঁছেছেন এবং আরও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার বার্তা দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, এ সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন বন্ধুত্বের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। আমাদের দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরবর্তী ‘স্বর্ণালি ৫০ বছরে’ পদার্পণের এই লগ্নে, আমাদের নেতাদের অর্জিত ঐকমত্য বাস্তবায়নে চীন বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।

প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ ও চীন ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে, যার মধ্যে রয়েছে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) চুক্তি, একটি যৌথ কর্মপরিকল্পনা এবং একটি কৃষি বাণিজ্য প্রোটোকল। পাশাপাশি গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) বাস্তবায়নে একটি সমঝোতা স্মারক এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বিনিময় ও সহযোগিতাবিষয়ক আরেকটি সমঝোতা স্মারকও সই হয়।