নারী ও কিশোর-কিশোরীদের ঝুঁকি বেশি

মাদকাসক্তি শুধু একটি অভ্যাস নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মস্তিষ্ক ও আচরণগত সমস্যা (দীর্ঘস্থায়ী পুনরাবৃত্তিমূলক ব্যাধি)। অনেক সময় আইসোলেশন একজন ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে মাদক থেকে দূরে রাখে। কিন্তু মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক কারণগুলো পরিবর্তন না হলে পুনরায় আসক্তির ঝুঁকি থাকে। আর এর  পেছনে কাজ করে, ট্রিগার ও পুরনো পরিবেশে ফিরে যাওয়া অনেক ব্যক্তি চিকিৎসার সময় মাদক থেকে দূরে থাকেন। কিন্তু বাইরে এসে আগের বন্ধু, স্থান ও পরিস্থিতির মুখোমুখি হলে মস্তিষ্কের পুরনো অভ্যাস সক্রিয় হয়।

রাকিব (ছদ্মনাম)। ২৮ বছর বয়সী একজন যুবক, তিনবার রিহ্যাবে ছিলেন। প্রতিবারই চিকিৎসার পর সুস্থ ছিলেন। কিন্তু বাড়ি ফিরে একই বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, কর্মহীনতা এবং পরিবারের সঙ্গে দূরত্বের কারণে ৩-৪ মাসের মধ্যে আবার মাদক গ্রহণ শুরু করেন। মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, তার সমস্যা মাদক নয়;  বরং মানসিক চাপ মোকাবিলার দক্ষতা, সামাজিক সমর্থন ও মানসিক নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। মানসিক সমস্যার উপস্থিতি অনেক আসক্ত ব্যক্তির মধ্যে বিষণœতা, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও ট্রমা বা আত্মমূল্যবোধের ঘাটতি থাকে। তারা মাদককে নিজের কষ্ট কমানোর উপায় হিসেবে ব্যবহার করে।

পরিবারের ভূমিকার অভাব শুধু চিকিৎসা নয়, পরবর্তী সময়ে পরিবারের সহযোগিতা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সম্পর্কের উন্নয়ন না হলে আগের অবস্থায় ফেরার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। মস্তিষ্কের পুরস্কার ব্যবস্থা মাদক মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেমের পরিবর্তন আনে। ফলে ব্যক্তি জানে ক্ষতি হচ্ছে, তবু আকর্ষণ অনুভব করে। সাধারণ গবেষণা অনুযায়ী, পরিসংখ্যানে আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলোতে দেখা যায়, মাদকদ্রব্য ব্যবহার ব্যাধি-জি পুনরায় আসক্তি হার অনেক ক্ষেত্রে ৪০-৬০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে, বিশেষ করে যদি চিকিৎসার পর পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তা না থাকে।

নারীদের মাদকে জড়িয়ে পড়ার কারণ কী- এই প্রশ্নটি অনেক সময়ই ওঠে। নারীদের মাদকাসক্তির কারণ অনেক সময় পুরুষদের থেকে ভিন্ন। এখানে সামাজিক চাপ, সম্পর্ক, ট্রমা ও মানসিক যন্ত্রণার ভূমিকা বেশি দেখা যায়। এর মধ্যে মানসিক যন্ত্রণা গেস ট্রমা অন্যতম। অনেক নারী মানসিক নির্যাতন, সম্পর্কের ভাঙন, শৈশবের খারাপ অভিজ্ঞতা বা দীর্ঘদিনের চাপ থেকে পালানোর জন্য মাদকের দিকে ঝুঁকতে পারেন। সুমি (ছদ্মনাম)। ৩২ বছর বয়সী একজন নারী। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য দ্বন্দ্ব ও একাকিত্বের পর তিনি প্রথমে ঘুমের ওষুধ ও পরে অন্যান্য মাদকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। থেরাপিতে দেখা যায়, মূল সমস্যা মাদকে ছিল না; বরং দীর্ঘদিনের অপ্রকাশিত কষ্ট, আত্মমর্যাদার অভাব এবং মানিয়ে চলার অসুবিধা।

এ ছাড়া কিছু নারী সঙ্গী বা ঘনিষ্ঠ মানুষের মাধ্যমে প্রথমবার মাদকের সংস্পর্শে আসেন। সামাজিক চাপ ও পরিচয়ের সংকট পারিবারিক দায়িত্ব, সামাজিক প্রত্যাশা, একাকিত্ব এসব থেকেও অনেকে ঝুঁকিতে পড়েন। মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। উদ্বেগ, বিষণœতা, ট্রমা-পরবর্তী মানসিক সমস্যা থাকলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। নারী আসক্তিকে শুধু ‘খারাপ আচরণ’ হিসেবে দেখলে চিকিৎসা কঠিন হয়। প্রয়োজন হয় সহানুভূতিশীল, নিরাপদ ও গোপনীয় চিকিৎসা পরিবেশ।

অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণীদের মাদকাসক্তির জন্য দায়ী কারা- প্রশ্ন ওঠে এ নিয়েও। কিশোর বয়স হলো মস্তিষ্কের বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঝুঁকি বোঝা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি পরিণত হয় না। এই বয়সে মাদকের মতো মরণ নেশায় জড়িয়ে যাওয়ার পেছনে পরিবার, বন্ধুদের প্রভাব ও সামাজিক পরিবেশ দায়ী। পরিবারের অতিরিক্ত কঠোরতা, অবহেলা, যোগাযোগের অভাব বা পারিবারিক দ্বন্দ্ব কিশোরদের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আরিফ (ছদ্মনাম)। ১৬ বছর বয়সী কিশোর। বাবা-মায়ের ব্যস্ততা, পরিবারের মধ্যে নিয়মিত ঝগড়া এবং স্কুলে একাকিত্বের কারণে সে বন্ধুদের মাধ্যমে মাদকের সঙ্গে পরিচিত হয়। এরপর সহকর্মী ও বন্ধুদের প্রভাবে কিশোর-কিশোরীরা অনেক সময় গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার জন্য বন্ধুদের আচরণ অনুসরণ করে। এ ছাড়া যেই সমাজে মাদক সহজলভ্য, সেখানে ঝুঁকি বেশি।

শুধু শাস্তি নয়, এ বয়সে তাদের প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, জীবন দক্ষতা প্রশিক্ষণ, কাউন্সেলিং ব্যবস্থা ও নিরাপদ আলোচনা পরিবেশ। সমাজে মাদককে শুধু অপরাধ হিসেবে নয়, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা। পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি কিশোরদের জন্য খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ ও ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা। এ ছাড়া প্রমাণভিত্তিক প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি চালু করা। বিশ্বব্যাপী গবেষণায় দেখা যায়, কৈশোরে মাদক শুরু করলে পরবর্তী সময়ে নির্ভরশীলতার ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। কারণ তখন মস্তিষ্কের পুরস্কার এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিকাশমান থাকে।

মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে শুধু ‘ইচ্ছাশক্তির দুর্বল মানুষ’ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো যায় না। আসক্তির পেছনে থাকে মস্তিষ্কের পরিবর্তন, মানসিক চাপ, সম্পর্কের সমস্যা, ট্রমা ও সামাজিক পরিবেশ। মাদকাসক্তদের সফল পুনর্বাসনে প্রয়োজন চিকিৎসা, মনোসামাজিক সহায়তা, পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকা। কারণ একজন মানুষ শুধু মাদক ছাড়ে না, তাকে একটি নতুন অর্থপূর্ণ জীবন গড়ে তুলতে সাহায্য করতে হয়।

লেখক : সিনিয়র সাইকোলজিস্ট অ্যান্ড অ্যাডিকশন প্রফেশনাল, স্বাস্থ্য বিভাগ, ঢাকা আহ্ছানিয়া মিশন