অ্যাপে গড়া নতুন সভ্যতা

আপডেট : ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৮:২২ এএম

সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুগকেই আলাদা করে চেনার একটি উপায় হলো সেই যুগের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করতে পারা। এক সময় সেরকম প্রতিষ্ঠান ছিল দুর্গ। পরে এলো কারখানা। সবশেষে এসেছে ব্যাংক। এই পরিবর্তন স্থাপত্য বা অর্থনীতিকে যতটা, তারচেয়ে অধিক মানুষের পারস্পরিক বিশ^াসের বিবর্তনকে ধারণ করছে। অর্থ লেনদেনের ধরন যত বদলেছে, ততটাই বদলে গেছে মানুষ কীভাবে নিরাপত্তা, আস্থা ও ভবিষ্যৎকে কল্পনা করে তার ধারণাও। মাত্র দু-তিন দশক আগেও ব্যাংকে যাওয়া মানে ছিল এক ধরনের আনুষ্ঠানিকতা উঁচু সিঁড়ি, ভারী কাচের দরজা, সেই দরজায় প্রহরীর গম্ভীর মুখ, ভেতরে টোকেন হাতে অপেক্ষমাণ মানুষ আর ক্যাশ কাউন্টারের ওপারে ব্যস্ত কর্মকর্তারা। আমাদের কাছে তখন ব্যাংক মানে ইট, পাথর, লোহা আর কাগজের সমাহার। সেই সময় আমাদের বিশ^াসগুলোও তালাবদ্ধ থাকত ব্যাংকের ভল্টে।

পৃথিবী আজ অনেক পাল্টে গেছে। ব্যাংকিংও এসে দাঁড়িয়েছে নতুন এক মোড়ে। এখন আর ব্যাংকের ঠিকানা শহরের সদর রাস্তা কিংবা এলাকার বড় বড় বাজারে সীমাবদ্ধ নয়। ব্যাংক এখন মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে আমাদের পকেটে পকেটে। ব্যাংক এখন একটি অ্যাপে, অদৃশ্য সফটওয়্যারে। ব্যাংক ধীরে ধীরে ভাবগম্ভীর, অবকাঠামো-নির্ভর প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ঝেড়ে ফেলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। তবুও বাংলাদেশের গল্পটা একটু ভিন্ন। আমরা এখনো ভাবি, একটি নতুন অ্যাপ তৈরি হলেই বুঝি ডিজিটাল ব্যাংক হয়ে গেল। এ যেন শত বছরের পুরনো শহরের দেয়ালগুলো রঙ করে হঠাৎই তাকে আধুনিক শহর ঘোষণা করা। অথচ একটি শহরকে আধুনিক করে তার রাস্তা, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ পরিষেবা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, গণপরিবহন, নাগরিকসেবা এবং মানুষের জীবনযাপন। শুধু উঁচু ভবন আর নতুন রঙ করা হলেই শহর বোঝায় না। ডিজিটাল ব্যাংকিংও তেমনই। শুধু একটি অ্যাপ নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম। এই ইকোসিস্টেমের মধ্যে থাকে পরিচয় যাচাই, তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান, নিরাপদ পেমেন্ট অবকাঠামো, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সেবার পারস্পরিক সংযোগ। এদের কোনো একটি দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থার ওপরই তার প্রভাব পড়ে।

ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে একটি অ্যাপের পেছনে একটি পূর্ণাঙ্গ ইকোসিস্টেম কাজ করে। ব্যাংকগুলোর ভেতরে এখনো বহু সিদ্ধান্তের কেন্দ্র ব্যাংকের শাখা, অথবা প্রধান কার্যালয়। অথচ ডিজিটাল যুগে প্রতিটি মানুষের হাতের মুঠোয় একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা বা হেড অফিস থাকার কথা, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। একজন কৃষক যদি গ্রামের মাঠে দাঁড়িয়ে, একজন উদ্যোক্তা যদি কারখানায় বসে, একজন প্রবাসী যদি হাজার হাজার মাইল দূর থেকে সহজে ব্যাংকের সব সেবা নিতে না পারেন তাহলে বুঝতে হয়, পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখনো এ দেশে অসম্পন্ন অবস্থাতেই আছে। এই অসম্পন্ন দশার একটি বড় কারণ লুকিয়ে আছে আমাদের প্রযুক্তির ভেতরেই। বাংলাদেশের অধিকাংশ ব্যাংকের কোর ব্যাংকিং সিস্টেম এমন এক প্রবীণ বৃক্ষের মতো, যার শিকড় গভীরে হলেও নতুন ডালপালা মেলতে তার কষ্ট হয়। তাই শুধু নতুন সফটওয়্যার যোগ করলেই সমস্যার সমাধান হয় না, প্রয়োজন এমন একটি প্রযুক্তিগত ভিত্তি, যা আগামী দশকের পরিবর্তনের সঙ্গেও সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি যোগ করতে গিয়ে পুরনো কাঠামোর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ওপেন এপিআই, তাৎক্ষণিক তথ্য বিশ্লেষণ কিংবা ক্লাউডভিত্তিক সেবা অনেক সময় তাই প্রযুক্তিগত সক্ষমতার চেয়ে কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কাছে গিয়ে আটকে যায়। যদিও প্রযুক্তি কখনোই ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাণ নয়।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রাণ যে আস্থা বা বিশ^াস, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রেও সেটিই প্রধান শর্ত হিসেবে থাকে। এই আস্থা একদিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘ সময় ধরে নির্ভুল সেবা, স্বচ্ছতা, দ্রুত সমস্যা সমাধান এবং ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি ডিজিটাল ব্যাংক মানুষের নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠে। স্ক্রিনের ওপারে যে মানুষটি ঋণের আবেদন করছেন, তিনিই কি সত্যিই তিনি? যে ব্যক্তি কয়েক লাখ টাকা স্থানান্তর করছেন, তিনিই কি প্রকৃত হিসাবধারী? এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তরই একজন গ্রাহকের কাছে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে আস্থা রাখার ভিত্তি। বাংলাদেশে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক যাচাই, ই-কেওয়াইসি অনেক দূর এগিয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের বিভিন্ন তথ্যভা-ার, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ডেটা এবং অন্যান্য সেবার মধ্যে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ লিংক তৈরি হয়নি। ফলে প্রযুক্তি দৌড়াতে সক্ষম হলেও তথ্যসমূহ এখনো পায়ে হেঁটে চলছে।

ঋণের ক্ষেত্রেও এখনো আমরা অতীত ধ্যান-ধারণার অনুসারী। একজন মানুষের আগামী দিনের সম্ভাবনা আমরা বিচার করি তার বিগত দিনের কাগজপত্র দিয়ে। আমরা চাই বেতন সিøপ, আয়কর রিটার্ন, জামানত, ব্যাংক স্টেটমেন্ট। অথচ আধুনিক ডিজিটাল অর্থনীতি মানুষকে দেখে তার আর্থিক আচরণের ভেতর দিয়ে। নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল, মোবাইল ওয়ালেটের ব্যবহার, ছোট ছোট লেনদেনের শৃঙ্খলা, ব্যবসার নগদ প্রবাহ, এমনকি ডিজিটাল উপস্থিতিও হয়ে উঠতে পারে আস্থার নতুন ভাষা। পৃথিবীর অনেক দেশে এই ভাষা এখন বাস্তবতা। বাংলাদেশে যা এখনো সম্ভাবনার স্তরে রয়ে গেছে। তথ্য নিয়ে আমাদের আরও একটি বড় সংকট রয়েছে। আমাদের ব্যাংকগুলোতে এখনো একজন মানুষকে সামগ্রিকভাবে দেখা হয় না। দেখা হয় কয়েকটি আলাদা আলাদা ফাইলে। একটি ফাইলে তার সঞ্চয়, আরেকটিতে তার ঋণ, তৃতীয়টিতে কার্ড, চতুর্থটিতে লেনদেন। একই মানুষের জীবন ব্যাংকের চারটি ভিন্ন আয়নায় বিভক্ত হয়ে আছে। ফলে একজন কাস্টমারকে ব্যাংকের একজন পূর্ণ গ্রাহক হিসেবে না দেখে, আমরা তার খ-িত প্রতিচ্ছবিগুলোকে দেখি।

অন্যদিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে তাল মিলেয়ে ডিজিটাল পৃথিবীর অন্ধকারও ক্রমে গভীর হচ্ছে। আগে ব্যাংকে ডাকাত ঢুকত অস্ত্র নিয়ে। এখন ঢোকে একটি লিংক হয়ে, একটি ভুয়া ফোনকল বা একটি প্রতারণামূলক এসএমএস হয়ে। এ কারণে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তার পাশাপাশি আর্থিক সাক্ষরতা ও ডিজিটাল সচেতনতা এখন ব্যাংকিং ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। একজন ব্যবহারকারীর একটি অসতর্ক ক্লিকও কখনো কখনো বহু বছরের সঞ্চয়কে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ভল্ট ভাঙতে এখন আর বিস্ফোরক লাগে না, মানুষের বিশ^াস ভাঙাই যথেষ্ট। তাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা সংক্রান্ত দুশ্চিন্তাও সফটওয়্যারে বা প্রযুক্তিতে নয়, রয়ে গেছে ব্যবহারকারীর সচেতনতায়। আসলে এদেশে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আদৌ প্রযুক্তির নয়, আদ্যোপান্ত মনস্তত্ত্বের। বাংলাদেশের মানুষ এখনো ব্যাংকের সঙ্গে একটি মানবিক সম্পর্ক খোঁজে। পরিচিত কর্মকর্তার চোখে ভরসা দেখতে চান। প্রয়োজনে একটি কাগজে সই করতে চান। নগদ টাকা হাতে নিয়ে হতে চান নিশ্চিন্ত। এই মনস্তত্ত্বকে অস্বীকার করে ডিজিটাল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। প্রযুক্তিকে মানুষের অভ্যাসের বিরুদ্ধে নয়, বরং মানুষের অভ্যাসকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে হবে।

তবে সময় থেমে থাকে না। আজ যে কিশোর স্কুলে বসে মোবাইলে সঞ্চয় করতে শিখছে, কাল সে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়াতে চাইবে না। তার প্রত্যাশাও হবে ভিন্ন। সে চাইবে কয়েক সেকেন্ডে হিসাব খোলা, তাৎক্ষণিক ঋণ অনুমোদন, স্বয়ংক্রিয় বিনিয়োগ পরামর্শ এবং যেকোনো সময়, যেকোনো স্থান থেকে সমান মানের সেবা। এই প্রত্যাশাই আগামী দিনের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত পরিবর্তনের দিকে ঠেলে দেবে। আজ যে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ‘বাংলা কিউআর’ কোডে টাকা নিচ্ছেন, কাল তিনিই হয়তো কয়েক মিনিটে জামানতহীন ঋণ চাইবেন। আজ যে প্রবাসী এক ক্লিকে দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন, কাল তিনি বিনিয়োগও করবেন একই সহজলভ্যতায়। বাংলাদেশে তাই নতুন প্রজন্মের হাতেই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের ভবিষ্যৎ। সামনের পৃথিবীতে ব্যাংক আর মানুষের আলাদা কোনো গন্তব্য থাকবে না। ব্যাংক মিশে যাবে মানুষের প্রতিটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তের সঙ্গে। আপনি গাড়ি কিনতে চাইবেন, অর্থায়নের প্রস্তাব নিজেই চলে আসবে। ব্যবসা বড় করতে চাইবেন, আপনার লেনদেনের ইতিহাসই হয়ে উঠবে জামানত। সন্তানের বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি নিশ্চিত হলে সঞ্চয় পরিকল্পনাও আপনার সামনে হাজির হবে। আর তখনই ব্যাংক শুধু একটি ভবনের ভাবমূর্তি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে।

এই কারণেই প্রযুক্তি বা এর জন্য বিনিয়োগের অঙ্কের চেয়েও বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নতুন করে চিন্তা করতে পারার সক্ষমতা অর্জন করা। আমাদের ভাবতে হবে শাখাকেন্দ্রিক বা হেড অফিসনির্ভর ব্যাংক থেকে তথ্যকেন্দ্রিক ব্যাংকে, কাগজনির্ভর ব্যাংক থেকে আস্থাভিত্তিক ডিজিটাল ইকোসিস্টেমে এবং প্রতিষ্ঠানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বরং গ্রাহকের অভিজ্ঞতায় উত্তরণের মধ্য দিয়ে। কারণ ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত তারাই জয়ী হয়, যারা নতুন সময়কে বুঝতে পারে, ধরতে পারে; নতুন যন্ত্র কিনতে পারে বলে নয়। বাংলাদেশের ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আসল প্রশ্ন তাই প্রযুক্তি কতটা আধুনিক, তা নয়; বরং প্রশ্নটা হলো, আমাদের চিন্তা কি এখনো ইট-পাথরের ভবননির্ভর ব্যাংকে আটকে থাকবে, নাকি আমরা সত্যিই আস্থা ও বিশ^াসকে মানুষের হাতের মুঠোয় পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত?

লেখক : ব্যাংকার ও কথাসাহিত্যিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত