খাদ্যশস্য পরিবহনে পাটের বস্তা ব্যবহারকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে পাটের বস্তা কেনার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের অর্থ লোপাট মেনে নেওয়া যায় না। এ কা-টি ঘটেছে খাদ্য অধিদপ্তরে। লোপাট হওয়া অর্থের পরিমাণ পরিমাণ ৩৭ কোটি টাকা। দেশে লাখ-কোটি টাকার কেনাকাটার তুলনায় বস্তা কেনায় ৩৭ কোটি বেহাত হওয়া তেমন বেশি মনে নাও হতে পারে। তবে দেশ রূপান্তরে গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই টাকা লুটে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছেন, তাতে তৃণমূল পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চর্চা হওয়ার চিত্র ফুটে এসেছে।
অভিযোগ উঠেছে ৫০ কেজি খাদ্যশস্য বহন করা যাবে, এমন এক কোটি পাটের বস্তা বেসরকারি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে কেনা হচ্ছে। অতিরিক্ত ব্যয়ে কেনার বন্দোবস্তে বাজারদর যাচাই কমিটিসহ অনেকের ভূমিকা রয়েছে।
সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ২৪তম সভায় ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার এক কোটি বস্তা ১২৬ কোটি ২৫ লাখ ২২ হাজার ৪০০ টাকায় কিনতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাব অনুমোদন করে। এ হিসাবে একেকটি বস্তার দাম প্রায় ১২৭ টাকা।
বেশি দামে কেনার এ বিষয়টি অধিদপ্তরের অনেক কর্মকর্তাই জানতেন। কারণ এর আগে গত বছর নভেম্বরে ৫০ কেজি বহন করা যায়, পাটের এমন প্রতিটি বস্তা পরিবহন, লাভ, ভ্যাটসহ সব মিলিয়ে ৯৫ টাকায় কেনা হয়। সে হিসাবে, এবার বস্তাপ্রতি বেশি খরচ হচ্ছে প্রায় ৩২ টাকা। এক কোটি বস্তা কিনতে বাড়তি ব্যয় হচ্ছে ৩২ কোটি টাকা।
এ কেনাকাটায় পাটের বাজার দর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কমিটি যখন প্রতিটি বস্তার প্রাথমিক মূল্য নির্ধারণ করেছে, তখন প্রতি মণ পাটের দাম ধরা হয় প্রায় চার হাজার ৯৮৮ টাকা। এতে এক কেজি পাটের দাম পড়ে প্রায় ১২৫ টাকা। অথচ এখনো বাজারে প্রতি মণ ভালো মানের পাটের দাম চার হাজার ৪০০ টাকার বেশি নয়। গত বছর প্রতি বস্তা ৯৫ টাকায় কেনার আগে ভালো মানের প্রতি মণ পাটের দাম ছিল সর্বোচ্চ চার হাজার ৪০০ থেকে চার হাজার ৫০০ টাকা। একই মানের পাট এখনো একই দরে বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের পাট চার হাজার ৩০০ টাকাতেও পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে পাটের বর্তমান দাম বস্তার দাম বেশি হওয়ার যুক্তি গ্রহণযোগ্য হওয়ার কথা নয়। দাম নির্ধারণে জড়িত ব্যক্তিদের মনে প্রশ্ন হিসেবে এ বিষয়টি আসতে পারত; কিন্তু সম্ভবত ‘আসেনি’। আর কেউ তুলে থাকলেও তা ‘এড়িয়ে’ গেছেন। মিলমালিক ও খোদ সরবরাহকারী হিসেবে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ৫০ কেজি ধারণক্ষমতার বস্তার সরবরাহ মূল্য ১০০ থেকে ১১০ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়। এ কারণে, অনেকে মনে করছেন, কমিটি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে প্রতিটি বস্তার যে দর নিয়েছে, সেগুলো বাজারে যাচাই না করেই বস্তার ক্রয়মূল্য সুপারিশ করা হয়েছে। এটা করা হয়েছে সরবরাহকারীদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগসাজশে।
অনেক কর্মকর্তা মনে করেন, দরপত্রে যারা অংশ নেন, তাদের কাছ থেকেই প্রতি বস্তার দাম নেওয়া কোনোভাবেই উচিত নয়। একই সঙ্গে বাজারদর যাচাই কমিটি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কমিটিতে কিছু কর্মকর্তা রাখা হয়েছে, যারা এ খাতের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নন। সেখানে রেলওয়ে এবং টিসিবির দুই কর্মকর্তাও ছিলেন, যাদের এ কাজের সঙ্গে কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।
প্রতি বছর প্রায় আট কোটি বস্তা কেনে অধিদপ্তর। কাজেই, অর্থ লোপাট কেবল এক কোটি বস্তা কেনায় সীমিত রয়েছে, এমনটি নাও হতে পারে। কর্তৃপক্ষ পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির অবসান ঘটাবেন, এমন প্রত্যাশা সবার।