আগে তাড়াতে হবে সর্ষের ভেতরের ভূত

আপডেট : ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:১২ এএম

সম্প্রতি দেশ রূপান্তরে দেশে মাদকের উৎস-বিস্তার-বাণিজ্য এবং আরও বিভিন্ন দিকে নজর দিয়ে ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে যে চিত্র উঠে এসেছে তাতে ফের প্রতীয়মান হলো মাদক সমাজকে শুধু গ্রাসই করেনি, এর বহুমাত্রিক নেতিবাচকতার অপছায়ায় অন্ধকারের তলিয়ে যাচ্ছে তরুণ ও যুব সমাজের উল্লেখযোগ্য অংশ। ফিরে তাকাই পেছনে। ১৩ বছর আগে রাজধানীর একটি নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ‘ও’ লেভেলের শিক্ষার্থী ১৭ বছর বয়সী ঐশীর হাতে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার পুলিশ কর্মকর্তা বাবা ও বেসরকারি চাকুরে মা-এর জোড়া খুন দেশের গন্ডি পেরিয়ে সারা বিশ্বে আলোচিত ঘটনা ছিল। ঘটনার দুদিন পর ঐশী নিজেই দোষ স্বীকার করে থানায় আত্মসমর্পণ করে। মেডিকেল প্রতিবেদনে ওঠে আসে ঐশী ইয়াবা আসক্ত ছিল। মাদকের ছোবল কী ভয়াবহ সামাজিক পরিণতি নিয়ে আসতে পারে ঐশী ঘটনা এর বড় উদাহরণ। নিম্ন আদালত ঐশীকে মৃত্যুদন্ড দেয়। পরবর্তী সময় আপিলে তার বয়স বিবেচনায় ও আগের কোনো অপরাধের নজির না থাকায় ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেওয়া হয়।

ওই মর্মান্তিক জোড়া খুনের ঘটনাটি মাদকাসক্তের ভয়াবহ পরিণতির দিকটিই কেবল নির্দেশ করে না; বরং পিতৃত্ব ও মাতৃত্ব এবং সন্তানের প্রতি তাদের দায়দায়িত্বের প্রসঙ্গটিও সামনে নিয়ে আসে। দেশের অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়-দায়িত্ব নিয়েও তখন প্রশ্ন ওঠে। ঘটনার ৩-৪ মাস আগে ঐশী বেপরোয়া জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। স্কুলের বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে প্রায়ই বাইরে রাত কাটাত। এরই মাঝে ইয়াবা জগতে প্রবেশ। অভিভাবকের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার খেসারত দিতে হয় নিজ ঔরসজাত কন্যার হাতে জীবন দিয়ে। ২০১৮ সালে সাতক্ষীরায় ২৪ বছর বয়সী মাদকাসক্ত টুম্পাকে বেপোরোয়া চলাফেরায় বাঁধা দেওয়ায় লোহার রডের উপর্যুপরি আঘাতে মা মমতাজ বেগম প্রাণ হারান। বর্তমানে সারা দেশে কত ঐশী-টুম্পার সৃষ্টি হয়েছে তার সঠিক তথ্য-উপাত্ত নেই। তবে অবস্থা যে বেশ সঙ্গিন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। হয়তো ঐশী টুম্পার মতো হন্তারকের সংখ্যা কম; তবে অনেক পরিবার ও সমাজ মাদকের ছোবলে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে সেটার কিছুটা সংবাদমাধ্যমে আসে; বেশিরভাগই লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে যায়। দেশব্যাপী মাদকের ছড়াছড়ি ও প্রতিদিনই মাদক উদ্ধারের ঘটনায় সংকটের গভীরতা সহজেই অনুমেয়। একটা সময় কোনো বিশেষ এলাকা মাদক জোন হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে সারা দেশে মাদকমুক্ত এলাকা পাওয়া কঠিন।

দেশের মাদক সমস্যা কতটা ভয়াবহ তার কয়েকটি তথ্য উল্লেখ করা যেতে পারে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়ের এক জরিপে বলা হয়, দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৮২ লাখ। আসক্তদের মধ্যে প্রায় ৩৩ শতাংশ ৮-১৭ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ করে। আর প্রায় ৫৯ শতাংশ প্রথম মাদক নেয় ১৮-২৫ বছর বয়সে। দেশের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা। গাঁজাসেবীর সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ। এর পরেই রয়েছে ইয়াবা। এতে আসক্ত প্রায় ২৩ লাখ। আর ফেনসিডিল-হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকে আসক্ত ২০ লাখের বেশি। মাদকের পেছনে গড়পড়তা মাসিক খরচ ৬ হাজার টাকারও বেশি, এই তথ্য একটি ইংরেজি দৈনিকের। এ হিসেবে মাসিক ব্যয় ৪ হাজার ৯২০ কোটি টাকা, যা বছরে দাঁড়ায় ৫৯ হাজার ৪০ কোটি টাকায়, যা যেকোনো মেগা প্রজেক্টের বাজেটের ২-৩ গুণ। এ ছাড়া মাদক সংক্রাক্ত অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, আদালত ও কারাগার এবং স্বাস্থ্যজনিত খরচের কথা তো বাদই রইল। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্যেই ওঠে আসে দেশে ২২.৯২ লাখ ইয়াবা আসক্ত প্রতিদিন ৬৮.৭৬ লাখ থেকে ১.১৪ কোটি পিল নেন। দেশের ৬০.৭৯ লাখ গাঁজাসক্তের দৈনিক চাহিদা ৩০ হাজার ৩৯৯ কেজিরও বেশি গাঁজা। সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর তৎপড়তায় দেশব্যাপী প্রতিদিন গড়ে ৭০ হাজার ৭৮৭ পিস ইয়াবা ও ১৭৬ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়, এই তথ্য অন্য একটি ইংরেজি দৈনিকের।

চরম উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব প্রচলিত মাদকের পাশাপাশি দেশে ম্যাজিক মাশরুম, ক্রিস্টাল মেথ, আইস, খাট, এলএসডি ও ডিএমটি, এস্কাফেসহ সিনথেটিক মাদকের বিস্তার ঘটছে আশঙ্কাজনক হারে। যাকে বলা হচ্ছে নতুন প্রজন্মের মাদক। এমন সব ড্রাগকে আমাদের তরুণ-তরুণীরা মাদক হিসেবে নেয়, যা বিদ্যমান আইনে মাদকের সংজ্ঞাতে পড়ছে না। অবস্থা যখন ভয়াবহ হয় তখন সেটাকে মাদক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে আইনের আওতায় নেওয়া হয়। নিত্যনতুন অভিনব মাদকের গোড়াপত্তন হচ্ছে দেশে। ‘ড্যানড্রাইট’ বা জুতা জোড়া লাগানোর আঠাও নেশার তালিকায়। পথশিশু ও কিশোরদের সস্তা নেশা এটি। নাম ড্যান্ডি। ফেনারগান নামক সর্দি-কাশির সিরাপ দিয়েও নেশা করে এদেশের তরুণ-তরুণীরা। ঘুমের বড়ি তো আমাদের দেশে সহজলভ্য নেশা।

অপরাধ মানেই এর বহুমুখী নেতিবাচক প্রভাব থাকবে। কেউ না কেউ এর পরিণতি ভোগ করবে। কিন্তু মাদকাসক্ত এমন একটি অপরাধ, যা কেবল ওই অপরাধীর মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেকেই এর ভুক্তভোগী। মাদকের প্রভাবে পরিবার-সমাজ তথা পুরো দেশকে মাশুল গুনতে হচ্ছে। আসক্ত ব্যক্তির বিচারবোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ, নৈতিক মূল্যবোধই কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হয় না; পুরো পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে এর ক্ষত ছড়াচ্ছে । সমাজে অপরাধ ও সহিংসতা বৃদ্ধির পেছনে অনেকাংশেই দায়ী মাদক। সাম্প্রতিককালে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, এর পেছনেও রয়েছে মাদক। ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িত মাদক। গত মাসে সিলেটে এক র‌্যাব সদস্যের প্রাণ যায় মাদকাসক্ত ছিনতাইকারীর হাতে। পারিবারিক ভাঙন ও সামাজিক অস্থিরতার প্রধান কারণ মাদক। বর্ধিত চুরি, ডাকাতি ও হত্যাসহ বেশিরভাগ সহিংসতার জন্যও অনেক ক্ষেত্রে দায়ী মাদক। ধ্বংস হচ্ছে আক্রান্ত তরুণ-তরুণীদের শিক্ষা ও কর্মজীবন। আসক্ত তরুণ-তরুণীদের কর্মঘণ্টা ও উৎপাদন ক্ষমতা কমে দেশ হারাচ্ছে সম্ভাবনাময় জনশক্তি। নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চরমে পৌঁছেছে মাদকের বিস্তারে। মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে দেশের সেরা মেধাবীদের অবস্থান সেখানেও মাদকের ছড়াছড়িতে তাদের একটা অংশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। স্কুল-কলেজ পর্যায়েও পড়েছে এর থাবা। কোনো কোনো শিক্ষকও মাদকাসক্ত, এমন বার্তাও মিলেছে সংবাদমাধ্যমেই। যেন দেশে মাদকের বিস্তার ঘটছে জ্যামিতিক হারে।

অভিযোগ আছে, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত এলাকাগুলো হলো মাদক চোরাচালানের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। মাদক পাচারের কুখ্যাত ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল’-এর নিকট অবস্থানের দরুণ মাদক চোরাচালান ও বিস্তারের দুই ঝুঁকিতেই আছে বাংলাদেশ। আর খোলা সমুদ্রপথ তো রয়েছেই। এমনকি বাংলাদেশের আকাশপথও মাদকের চোরাচালান থেকে মুক্ত না। এক সময় গাঁজাকে বলা হতো দেশীয় মাদক। ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবাসহ সিনথেটিক মাদকসমূহ আসতো চোরাচালানের মাধ্যমে বিদেশ থেকে। দেশে উৎপাদিত গাঁজায় মাদকের চাহিদা মিটছে না বিধায় ভারত ও মিয়ানমার থেকে প্রতিদিন শত শত কেজি গাঁজা প্রবেশ করছে দেশে, সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রকাশ। বাংলাদেশে পাচারের জন্য যেন সীমান্তে বিশাল এলাকাজুড়ে গাঁজা চাষ হচ্ছে। এ জন্য কী পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে তারও হিসাব নেই। আবার মাদক ব্যবসার অর্থ দেশ বিরোধী কর্মকা-ে ব্যবহৃত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

মাদকের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিবেচনায় এনে এর সমাধান করতে হবে। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হিসেবে দেশে প্রায় ২১ হাজার মাদক কারবারি রয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে প্রতিদিনকার গ্রেপ্তার ও মাদক উদ্ধারের ঘটনা দেখলে মনে হয় বাস্তবে মাদককারবারির সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি। মাদক চোরাচালানি ও মাদকসেবীরা গ্রেপ্তার হয় আবার জামিনে বের হয়ে যায়। কারও কারও সাজাও হয়। জেল থেকে বের হয়ে তারা আবার যুক্ত মাদক কারবারে! মাদকাসক্ত ব্যক্তির নিরাময় যেমন দুরূহ; তেমনি মাদককারবারি ও চোরাচালানীদের এ পেশা মাদকাসক্ত ও মাদককারবারির মধ্যকার প্যাট্রন বা পৃষ্ঠপোষক সম্পর্ক ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। মাদকের বিস্তারজনিত সমস্যাটা কেবল মাদকজনিত অপরাধেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। মাদক সমস্যা সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ সংকট কেবল জাতীয় নয়; বরং আন্তঃমহাদেশীয় ও আন্তর্জাতিক। সংকট গভীর হলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ পর্যন্ত ঘটতে পারে। পানামা ও ভেনিজুয়েলা এক্ষেত্রে জ¦লন্ত উদাহরণ। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার। মাদকের বিস্তার ঘটিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দেওয়া তেমনই একটি ষড়যন্ত্র মনে করি।

বাংলাদেশের জনমিতিক সুফল বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনের পথে বড় বাধা মাদক। সুশিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান এবং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে ওঠার বিপরীতে মাদক বিকশিত সমাজ গড়ার স্বপ্নে অভিঘাত করছে। সর্ষের ভেতর ভূত রেখে তা তাড়ানো কঠিন। অভিযোগ আছে, মাদক নির্মূলে যাদের দায়দায়িত্ব তাদের অনেকের বিরুদ্ধে রয়েছে যোগসাজশের অভিযোগ। আগে এর নিরসন জরুরি। টোটকা দাওয়াইয়ে এ ক্ষেত্রে সুফল মিলবে না, একবারে উৎসে নজর দিয়ে কঠিন পদক্ষেপের বিকল্প নেই। তরুণদের উন্নয়নে বিনিয়োগ, বাজেট বরাদ্দে শিক্ষা খাতকে গুরুত্ব, মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সংস্কৃতিচর্চার উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে মাদকের বিস্তারে।

লেখক : সমাজ বিশ্লেষক ও অধ্যাপক উপাচার্য, মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি, সিলেট

[email protected] 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত