তিন্দু স্কুল : অল্প কথার গল্প নয়

একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা কতটা মানবিক, তা বোঝার জন্য বড় শহরের আধুনিক বিদ্যালয়ের চেয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চল, পাহাড়ের দুর্গম জনপদ, চরাঞ্চলের স্কুল কিংবা হাওরের ছোট ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাস্তবতাই বেশি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। বান্দরবানের থানচির ‘তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের’ ঘটনা আমাদের সামনে ঠিক সেই বাস্তবতাই উন্মোচন করেছে। স্কুলের প্রধান শিক্ষক নিজের ছুটির দিনগুলোতে, ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে পর্যটক পরিবহন করেন আর সেই আয় দিয়ে সহকর্মী শিক্ষকদের বেতন পরিশোধ করছেন। তার এই গল্প অল্প কথায় শেষ করার নয় এবং এ ঘটনা কেবল একজন শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়, রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের অবহেলার এক বেদনাদায়ক চিত্র।

বিদ্যালয়টি জাতীয়করণের লক্ষ্যে, সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। দীর্ঘদিনের অবহেলার পর রাষ্ট্রের এই উদ্যোগ শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। তবে এই ঘটনায় আমাদের সামনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তা হলো একজন প্রধান শিক্ষককে কেন শিক্ষকদের বেতন পরিশোধের জন্য নৌকার মাঝি হতে হলো? কেন একটি বিদ্যালয় বছরের পর বছর এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে চলল? কেন রাষ্ট্রের নজর সেখানে পৌঁছাতে একটি সংবাদপত্রের প্রতিবেদন ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষা করতে হলো? বাংলাদেশে দুর্গম অঞ্চলের শিক্ষা নিয়ে অতীতে বহু পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলো শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষকসংকট নিরসনের জন্য নানা উদ্যোগও নিয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পাহাড়, চর, হাওর কিংবা উপকূলের বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এখনো সীমিত অবকাঠামো, শিক্ষকসংকট এবং আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম করছে। তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয় সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই একটি প্রতীক।

শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন দেখিয়েছেন- শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়, সমাজের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা এবং নৈতিক অঙ্গীকারেরও নাম। নিজের ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে তিনি বিদ্যালয়টিকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তার এই ত্যাগ নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, কোনো রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না। একজন শিক্ষক যদি বিদ্যালয় চালানোর জন্য নৌকা চালাতে বাধ্য হন, তাহলে তার সেই সংগ্রাম যেমন ব্যক্তিগত সাহস ও নিষ্ঠার পরিচয় বহন করে, তেমনি রাষ্ট্রের নীতিগত ব্যর্থতাকেও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। আমরা প্রায়ই শিক্ষকদের ‘জাতি গঠনের কারিগর’ বলি। কিন্তু সেই কারিগরের ন্যূনতম আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে, এই কথাগুলো কেবল আনুষ্ঠানিক প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকে। শিক্ষকের মর্যাদা কেবল ফুলের তোড়া বা সংবর্ধনায় প্রতিষ্ঠিত হয় না; প্রতিষ্ঠিত হয় তার কর্মপরিবেশ, সম্মানজনক বেতন এবং নিশ্চিন্ত জীবনের মাধ্যমে। তিন্দুর এই ঘটনা আমাদের সেই সত্য আবারও স্মরণ করিয়ে দিল।

ঘটনাটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সত্যও সামনে এনেছে। একটি সংবাদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জনমত তৈরি করেছে এবং শেষ পর্যন্ত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এতে জনস্বার্থভিত্তিক সাংবাদিকতার কার্যকারিতা স্পষ্ট হয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে যায়, যেসব বিদ্যালয়ের দুর্দশা এখনো আলোচনায় আসেনি, তাদের সমস্যার সমাধান কীভাবে হবে? রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল ভাইরাল ঘটনার প্রতিক্রিয়া জানানো নয়; তথ্যভিত্তিক উদ্যোগে আগেভাগেই সংকট শনাক্ত করা। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অসংখ্য বিদ্যালয় শিক্ষকসংকট, দুর্বল অবকাঠামো ও অর্থাভাব নিয়ে টিকে আছে। কোথাও শিক্ষক নিজের অর্থ ব্যয় করে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন, কোথাও শিক্ষার্থীরা কষ্ট করে বিদ্যালয়ে পৌঁছায়। এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, একই কাঠামোগত দুর্বলতার লক্ষণ। তিন্দু বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ তাই একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়েও বড় অর্থ বহন করে। বার্তাটি হচ্ছে দেশের কোনো শিশু যেন ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয়। রাজধানীর একটি বিদ্যালয় এবং পাহাড়ের একটি বিদ্যালয়ের মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য যত কমবে, ততই সংবিধানের সমতার চেতনা বাস্তব রূপ পাবে।

তবে জাতীয়করণই শেষ কথা নয়। বিদ্যালয়টি যেন পর্যাপ্ত শিক্ষক, প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ, বিজ্ঞানাগার, তথ্যপ্রযুক্তি সুবিধা এবং নিরাপদ অবকাঠামো পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় কর্মরত শিক্ষকদের জন্য বিশেষ ভাতা, আবাসন সুবিধা এবং প্রণোদনার বিষয়টিও নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। কারণ কেবল প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ করলেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না, তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। আমাদের আরও একটি বিষয় নিয়ে ভাবতে হবে। দেশে এমন অনেক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক রয়েছেন, যাদের অসাধারণ অবদান কোনো সংবাদে আসে না। কেউ নিজের বেতনের টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের বই কিনে দেন, কেউ দূরবর্তী গ্রামে নৌকা বা হেঁটে স্কুলে পৌঁছান, কেউ আবার বিদ্যালয় টিকিয়ে রাখতে ব্যক্তিগত সম্পদ বিক্রি করেন। রাষ্ট্রের উচিত এমন শিক্ষকদের চিহ্নিত করা, তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়া।

তিন্দুর নৌকার মাঝি প্রধান শিক্ষকের গল্প আমাদের আবেগাপ্লুত করে। কিন্তু একটি সভ্য রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত, ভবিষ্যতে যেন আর কোনো শিক্ষক বিদ্যালয় চালানোর জন্য অতিরিক্ত জীবিকার এমন পথ বেছে নিতে বাধ্য না হন। শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষেই সর্বাধিক প্রয়োজনীয়, নৌকার বৈঠায় নয়। এই ঘটনাকে তাই বিচ্ছিন্ন সাফল্য হিসেবে নয়, বরং সারাদেশের প্রান্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বাস্তবতা পুনর্মূল্যায়নের একটি সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। যদি তিন্দুর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, সরকার দেশের সব দুর্গম বিদ্যালয়ের একটি সমন্বিত মূল্যায়ন করে এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে- তবে সেটিই হবে এই ঘটনার সবচেয়ে বড় সাফল্য। তখন একজন নৌকার মাঝি, প্রধান শিক্ষকের ব্যক্তিগত সংগ্রাম সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

লেখক : কবি, সংস্কৃতি ও অধিকারকর্মী

shahedkayes@gmail.com