গোল... গোল...

লাভলুর বাড়ি ছিল এয়ারপোর্টের কাছে। বাড়ি বলতে আসলে ঠিক বাড়িও নয়। এই এলাকায় থাকত। রেলস্টেশন, ফুটপাত- যখন যেখানে ইচ্ছা ঘুমাত। সারাদিন কাগজ, বোতল, ভাঙারি জিনিসপত্র কুড়াত। দিন শেষে ভাঙারির দোকানে সেসব বিক্রি করত। যা টাকা পেত তা দিয়ে পাউরুটি, কলা, যখন যা সম্ভব কিনে খেত। মাঝে মধ্যে মেজবানি মামার দোকান থেকে বিশ টাকায় মেজবানি খাবার খেত। আসলে এগুলো কোনো অনুষ্ঠানের খাবারের উচ্ছিষ্ট। এভাবেই কাটছিল লাভলুর জীবন। সেই পাঁচ বছর বয়স থেকে এখানে এভাবে বসবাস।

পিন্টু, রবি, শিপলু ওরাও থাকত একসঙ্গে। এদের মধ্যে লাভলুর সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল রবি। রবি লাভলুকে সবচেয়ে ভালো বুঝতে পারত। রবি জানত লাভলু ফুটবল ভীষণ পছন্দ করে। বিশ্বকাপ খেলা শুরু হলে রবি কোত্থেকে যেন একটা আর্জেন্টিনার পতাকা এনে দেয় লাভলুকে। আকাশি নীল ও সাদা রঙের। লাভলু প্রিয় দলের পতাকা পেয়ে আকাশ সমান খুশি হয়। সে ফুটবল খেলা দেখার জন্য পাগল ছিল। টিভিতে বিশ্বকাপ খেলা দেখার জন্য রবিকে নিয়ে চলে যেত খিলক্ষেত। সেখানে এক ভাঙারি মামার দোকানে এক কোণে একটা ছোট্ট টিভি রাখা ছিল। ভাঙারি মামা তাতে বিশ্বকাপ খেলা দেখত। ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে রবিকে লাভলু সেখানে নিয়ে গিয়েছিল। ভাঙারি দোকানের বাইরে বসে চুপচাপ খেলা দেখত দুজন। ভাঙারি মামা খুব ভালো মনের মানুষ ছিল।

আদর করে বলত, কিরে লাভলা খেলা দেখনই লাগব? আয় বস।

বলেই ভাঙারির টিবির সামনে বসতে দিত দুজনকে। লাভলু মনোযোগ দিয়ে খেলা দেখত। আর্জেন্টিনার খেলায় মেসির বল পাসিং ও বাম পায়ের ড্রিবলিং দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকত। ফ্রান্সের খেলা হলে এমবাপ্পের দ্রুতগতি ও ফিনিশিং দেখে লাভলুর মুখ হা হয়ে যেত। তারকা খেলোয়াড়দের দুর্দান্ত সব খেলার কৌশল এক এক করে মাথায় ঢোকে। কিন্তু মাথা পর্যন্তই থাকে। পায়ে গড়ানোর সুযোগ খুব একটা ছিল না। মাঝে মাঝে মন চাইত বল নিয়ে ইচ্ছেমতো দুই পায়ে কসরত দেখাতে। কিন্তু সেজন্য যে বলটা প্রয়োজন তা তো ওর নেই। পুঁটলি বলে কি আর এসব করা যায়? পুঁটলি বল মানে ওরা মাঝে মাঝে কুড়ানো কাগজ বিশেষ পদ্ধতিতে দড়ি দিয়ে পাকিয়ে পলিথিনে মুড়িয়ে বল বানাত। তাই দিয়ে ফাঁকা জায়গায় খেলত।

লাভলু খেলত আর মনে মনে ভাবত, ইশ! একটা সুন্দর বল যদি হতো। ওর দুই পা নিশপিশ করতে লাগল। একদিন তো রেলস্টেশনে ঘুমাতে ঘুমাতে স্বপ্নে দেখেছিল, বড় একটা মাঠে সে খেলছে। অন্য একটি দেশের বিপরীতে। গ্যালারি ভরা দর্শক। সবাই দুই হাত উঠিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে চিৎকার করে তার চমৎকার খেলা দেখে উল্লাস প্রকাশ করছে।

এ স্বপ্ন যে একদিন তার জীবনে সত্যি হবে তা কোনোদিন ভাবেনি। গত বছর একটি বেসরকারি সংস্থা লাভলুকে নিয়ে গিয়েছিল। পথশিশু বিকাশ কেন্দ্রে। সেখানে লাভলুর মতো অনেক পথশিশু রয়েছে। সবাইকে পড়ালেখা শেখানো হয়। ভালো খাবার দেওয়া হয়। খেলাধুলারও ব্যবস্থা আছে বেশ। ফুটবল খেলায় লাভলুর অন্যরকম দক্ষতা সবার নজর কাড়ে। একদিন বিকেল বেলা মাঠে সংস্থার পরিচালক এসে সবাইকে গোল করে বসালেন।

সবার উদ্দেশ্যে বললেন, আমাদের জন্য একটা ভালো খবর আছে। আমরা এবার দুবাই পথশিশু বিশ^কাপে অংশগ্রহণ করার অনুমোদন পেয়েছি। সেখানে বিশ্বের একুশটি দেশ অংশগ্রহণ করবে। হাতে সময় আছে ছয় মাস। তাই প্রথমে ভালো একটা টিম বাছাই করতে হবে। তারপর ভালো অনুশীলনের মাধ্যমে প্রস্তুতি নিতে হবে। টিম প্রস্তুত করার জন্য আগামীকাল থেকে দুজন অভিজ্ঞ কোচ থাকবেন।

পরিচালকের কথাগুলো শুনে লাভলু যেন নিজেই নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। গায়ে চিমটি কেটে দেখে এটা কি সত্যি নাকি স্বপ্ন দেখছে। এটা তার জন্য বিরাট একটা সুযোগ। যে করেই হোক তাকে এ টিমে থাকতেই হবে। টিমে থাকার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে। প্রতিজ্ঞা অনুসারে কঠোর অনুশীলন করে লাভলু টিমে যুক্ত হলো।

ছয় মাস সবার কঠোর অনুশীলনে টিম প্রস্তুত।

ওদের টিম নিয়ে কোচসহ অন্য সবাই এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

ওদের গাড়ি এয়ারপোর্টের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। লাভলুর কাছে সব পরিচিত জায়গাগুলো এক এক করে চোখের সামনে আসতে লাগল। এই এয়ারপোর্ট এলাকাতেই তো একসময় কেটেছে ওর দিন-রাত।

চোখ বুজে লাভলু ভাবে, একদিন ভাঙারির ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে এয়ারপোর্টের পাশে দাঁড়িয়ে বিমানের ওঠা নামা দেখছিল। মনে মনে ভাবছিল, ইশ! যদি কোনো দিন প্লেনে চড়তে পারতাম!

আর আজ সে ইচ্ছে পূরণের দিন।

সবার লাগেজ লাল সবুজ কাপড়ে মোড়ানো। এক এক করে সবাই প্লেনে উঠে বসল। পাঁচ ঘণ্টা ষোলো মিনিট স্বপ্ন বোঝাই প্লেনটি আকাশে উড়তে উড়তে গন্তব্যে পৌঁছাল। পরদিন দুবাই শহরে একটি বিশাল সুন্দর স্টেডিয়ামে খেলা। প্রথমদিনের খেলায় লাভলুরা এক এক গোলে ড্র করে।

অনুশীলনে কোচ জিসান আহমেদ সবাইকে বলেন, তোমাদের আরও ভালো করতে হবে। ডিফেন্স আরও শক্ত করতে হবে। মিডফিল্ডে পাসিং আরও নিখুঁত করার চেষ্টা করতে হবে।

টিমের সবাই যথাসম্ভব কোচের কথা অনুসরণের চেষ্টা করে যায়।

পরের খেলাগুলোতে বেশ ভালো করে। লাভলুরা ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।

ফাইনালে আফ্রিকার একটি দেশের সঙ্গে খেলা হয়।

নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে খেলা শেষেও কোনো দলের গোল হয়নি। তাই পেনাল্টি শুট হয়। পেনাল্টি শুটেও দুপক্ষের সমান গোল হয়। খেলার সাডেন ডেথ নিয়ম অনুসারে একটি করে শট হবে।

শেষের শটটি কে নেবে?

লাভলুর শটের নিশানা সবার চেয়ে ভালো। তাই সিদ্ধান্ত হয় লাভলুই করবে শেষ শটটি।

পুরো মাঠে দর্শকদের টান টান উৎকণ্ঠা। লাভলু দূর থেকে দৌড়ে এসে একটু বাঁকা করে শট নেয়। গোলপোস্টের ডান কোনা দিয়ে বল ঢুকে যায় জালে। গ্যালারি ভর্তি দর্শক চিৎকার দিয়ে ওঠে। গোল... গোল...।