অবসর! এখন ভাবনার সময় নয়

বয়সটা ৪১ বছর ১৪৭ দিন। এই বয়সে যেখানে ফুটবলাররা সাধারণত বুটজোড়া তুলে রেখে ডাগআউটে বসেন কিংবা আরামদায়ক অবসর কাটান, সেখানে তিনি মাঠ মাতাচ্ছেন বিশ্বমঞ্চের নকআউট পর্বে। তিনি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের ২-১ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয়ের পর ফুটবল পাড়ায় জোর গুঞ্জন, বোন কাতিয়া আভেইরোর ইঙ্গিত অনুযায়ী এই বিশ্বকাপই কি সিআরসেভেনের শেষ টুর্নামেন্ট? তবে টরন্টোর মাঠের লড়াই শেষে অবসরের সব আলোচনা এক ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়েছেন এই মহাতারকা। সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, এখন বিদায় নিয়ে ভাবার কোনো সময় নয়, বরং এটি তার জন্য ম্যাচ বাই ম্যাচ এগিয়ে যাওয়ার মুহূর্ত।

শেষ ৩২-এর এই ম্যাচে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পর্তুগালের জয় এবং শেষ ষোলো নিশ্চিত করার রাতটি ছিল পুরোপুরি রোনালদোময়। ম্যাচের ৫৩ মিনিটে ইভান পেরিসিচের গোলে ক্রোয়েশিয়া এগিয়ে গেলেও, এর ১৩ মিনিট পর পেনাল্টি থেকে গোল করে পর্তুগালকে সমতায় ফেরান রোনালদো। পেনাল্টি থেকে করা এই সমতাসূচক গোলটি অর্জনে মাঠের ৮১ মিনিটে প্রতিপক্ষের ডি-বক্সে রোনালদোর একমাত্র ছোঁয়া হলেও, এই এক শটেই ওলটপালট হয়ে গেছে ফুটবল ইতিহাসের একাধিক রেকর্ড বুক। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলতে নেমে এই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে গোলের দেখা পেলেন রোনালদো। একই সঙ্গে তিনি ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে ৪১ বছর বা তার বেশি বয়সে নকআউট পর্ব খেলা প্রথম আউটফিল্ড ফুটবলার এবং বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড এখন তার দখলে। পরবর্তী সময়ে ম্যাচের শেষদিকে বদলি খেলোয়াড় গনসালো রামোসের দুর্দান্ত হেডে জয় নিশ্চিত হয় রবার্তো মার্তিনেজের দলের।

ম্যাচ শেষে নিজের অবসর গুঞ্জন স্তিমিত করে রোনালদো সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘জাতীয় দলকে যেভাবে সমর্থন করে যাচ্ছেন, সেভাবেই সমর্থন করে যান এবং ম্যাচ বাই ম্যাচ চিন্তা করুন। এই মুহূর্তে ক্রিশ্চিয়ানোর ভবিষ্যৎ গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমি আমার পরিবারের সঙ্গে কথা বলব এবং তারপর সিদ্ধান্ত নেব। আবেগের বশে বা তাড়াহুড়ো করে আমি আর কোনো সিদ্ধান্ত নিই না। এখন বিশ্রাম নেওয়ার এবং পরের ম্যাচের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার সময়।’

অবসরের গুঞ্জন পাশে সরিয়ে রাখলে এই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় আরও একটি কারণে অমর হয়ে থাকবে। এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে এমন ৩ জন ফুটবলার একসঙ্গে মাঠে ছিলেন, যাদের প্রত্যেকেই ২০টির বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলেছেন; রোনালদো (২৬ ম্যাচ), লুকা মদ্রিচ (২৩ ম্যাচ) এবং ইভান পেরিসিচ (২১ ম্যাচ)। শুধু তাই নয়, সাবেক রিয়াল মাদ্রিদ সতীর্থ লুকা মদ্রিচের মুখোমুখি হয়ে রোনালদো ফুটবল ইতিহাসের প্রথম ম্যাচ উপহার দিলেন, যেখানে একই ম্যাচে ৪০ বা তার বেশি বয়সী দুজন আউটফিল্ড খেলোয়াড়

অংশ নিয়েছেন।

এর বাইরেও আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের গোলসংখ্যা ১৪৬ এবং ক্যারিয়ারের মোট গোল ৯৭৬-এ নিয়ে গেলেন আল-নাসর তারকা।

এদিকে চলতি বিশ্বকাপে এটি রোনালদোর ৩ নম্বর গোল, যা ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের পর এক আসরে তার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে ইতিহাসের প্রথম পুরুষ ফুটবলার হিসেবে পুরুষদের বিশ্বকাপ এবং ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ মিলিয়ে ২৫-এর বেশি গোল করার অনন্য কীর্তিও গড়লেন তিনি। এছাড়া বিশ্বকাপে এটি রোনালদোর চতুর্থ পেনাল্টি গোল, যেখানে ইতিহাসে তার চেয়ে বেশি পেনাল্টি গোল আছে কেবল হ্যারি কেইনের (৫টি)।

অশ্রুসজল চোখে উৎসর্গ

মাঠের এই তুমুল উত্তেজনা আর রোনালদোর রেকর্ডময় রাত ছাপিয়ে ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজতেই বিএমও ফিল্ডের আকাশ রূপ নিল এক পরম বেদনায়। মহাতারকার দুচোখ বেয়ে তখন নামছিল অশ্রুর ধারা। কারণ, এই ৩ জুলাই কেবল পর্তুগালের শেষ ষোলোর টিকিট কাটার দিন ছিল না, এটি ছিল তাদের সাবেক সতীর্থ ও ফুটবলার ডিয়োগো জোতার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছরের এই দিনে স্পেনে এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন জোতা। ম্যাচের আগেই স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে প্রয়াত জোতার সাদাকালো ছবি ভেসে উঠলে গ্যালারিতে এক আবেগঘন স্তব্ধতা নেমে আসে।

ম্যাচ শেষ হতেই মাঠের সব উৎসব একপাশে রেখে রোনালদো গায়ে জড়িয়ে নেন জোতার সেই চেনা ২১ নম্বর আন্তর্জাতিক জার্সিটি। পুরো দল আর কোচিং স্টাফকে মাঠের মাঝখানে এনে জার্সিটি উঁচিয়ে ধরে আকাশের দিকে আঙুল তোলেন অধিনায়ক যেন বিশ্বমঞ্চের এই অনন্য জয়কে পরপারে থাকা প্রিয় বন্ধুর উদ্দেশ্যে পাঠাচ্ছিলেন তারা। ম্যাচসেরার পুরস্কার নিতে এসেও রোনালদোর কণ্ঠ ছিল কান্নাভেজা। আবেগতাড়িত হয়ে সিআরসেভেন বলেন, ‘আমরা জানতাম আজকের দিনটি আমাদের জন্য কী অর্থ বহন করে। আমরা ডিয়োগোর জন্য জিতেছি, আমাদের জন্য জিতেছি, পর্তুগালের জন্য জিতেছি। ম্যাচের আগেই আমরা ড্রেসিংরুমে কথা বলেছিলাম। জীবনের এই অদ্ভুত কাকতালীয় ঘটনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। এই জয়টি আমাদের কাছে শুধু একটি ম্যাচ জেতার চেয়েও অনেক বেশি কিছু।’

বিশ্বমঞ্চে প্রিয় বন্ধুর স্মৃতি আর ২১ নম্বর জার্সি জড়িয়ে রোনালদোর এই চোখের জল ভক্তদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। এক ভক্ত এক্সে লিখেছেন, ‘বিশ্বমঞ্চে ডিয়োগো জোতার স্মৃতিকে এভাবে বাঁচিয়ে রাখার জন্য রোনালদোর প্রতি সম্মান আরও বেড়ে গেল। নেতৃত্ব আর শ্রদ্ধাবোধের অনন্য এক দৃষ্টান্ত।’