কোনো চাপ নেই, হারানোরও কিছু নেই সহ-আয়োজক কানাডার ফুটবলাররা এখন মাঠে নামছেন এক অদ্ভুত মানসিক স্বাধীনতা নিয়ে। তবে এই ‘ফ্রি হিট’-এর আড়ালেও জোনাথন ডেভিড কিংবা আলফোনসো ডেভিসদের মনে চড়া দিয়ে উঠছে চার বছর আগের এক হিসাব চুকানোর তীব্র তাড়না। ওদিকে ডাচদের টাইব্রেকারে বিদায় করে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে বর্তমান আফ্রিকা চ্যাম্পিয়ন ও গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কো। ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ১৬ পর্বের মহাযুদ্ধ শুরু হচ্ছে এই দুই দলের রোমাঞ্চকর লড়াই দিয়েই। হিউস্টনের এই ম্যাচের হাইভোল্টেজ আবহ ছাপিয়ে ফুটবল বিশ্বের নজর এখন ডাগআউটের মগজের লড়াইয়ে জেসি মার্শের হাই-প্রেসিং ট্যাকটিক্স কি পারবে অ্যাটলাস লায়ন্সদের সেই চেনা দুর্ভেদ্য রক্ষণকে গুঁড়িয়ে দিতে? নাকি মরক্কো তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখে শেষ আটে পা রাখবে?
কানাডার জন্য এবারের বিশ্বকাপ মানেই তো একের পর এক নতুন ইতিহাস লেখার গল্প। এর আগে বিশ্বমঞ্চে ৬টি ম্যাচ খেলে যারা একটি পয়েন্টের দেখাও পায়নি, ঘরের মাঠের দর্শকদের উন্মাদনায় এবার তারা রীতিমতো উড়ছে। কাতারকে ৬-০ গোলে গুঁড়িয়ে দেওয়া আর শেষ বত্রিশের ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ইনজুরি টাইমে স্টিফেন ইউস্তাকিওর সেই জাদুকরী নাটুকে গোল কানাডাকে এনে দিয়েছে এক পরম মুক্তি।
দলটির কোচ জেসি মার্শ তাই এই ম্যাচটিকে দেখছেন কোনো চাপ ছাড়া এক উন্মুক্ত সুযোগ হিসেবে। তবে মনে লুকিয়ে থাকা মরক্কোর কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে মার্শ বলেন, ‘মরক্কোর বিপক্ষে প্রস্তুতি নেওয়া যেন একটি রক্তক্ষয়ী, ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন দেখার মতো। তবে আমরা এই মঞ্চে থাকতে চেয়েছিলাম এবং এখানে থাকাটাই আমাদের প্রত্যাশা ছিল। আমরা খুব ভালো করেই জানি যে সবাই ইতিমধ্যে আমাদের হিসাবের বাইরে ফেলে দিয়েছে, আর ঠিক এর মধ্যেই আমাদের জন্য এক দারুণ সুযোগ লুকিয়ে আছে।’
দলের এই অবিস্মরণীয় যাত্রায় কোচের সুরেই সুর মিলিয়েছেন কানাডিয়ান মাঝমাঠের প্রাণভোমরা স্টিফেন ইউস্তাকিও। দলের ভেতরের একতা ও আত্মবিশ্বাসের কথা জানিয়ে এই তারকা মিডফিল্ডার বলেন, ‘আমার মনে হয় বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে আত্মবিশ্বাসটাই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। কে জানে, একটা ভালো দিনে আমরা যেকোনো কিছু ঘটিয়ে দিতে পারি। আমাদের দলটা খুব স্পেশাল, আমরা নিজেদের ভাই মনে করি। আমরা যখন একে অপরের জন্য জানপ্রাণ দিয়ে লড়াই করি, তখন বিশেষ কিছুই ঘটে।’
কিন্তু উত্তর আফ্রিকার ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’রা আবেগে ভেসে যাচ্ছে না। কাতারে প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে সেমিফাইনালে ওঠার গৌরব যে কোনো আকস্মিক ঘটনা বা ফ্লুক ছিল না, চার বছর পর এবার তা অক্ষরে অক্ষরে প্রমাণ করছে মরক্কো। গ্রুপ পর্বে পরাক্রমশালী ব্রাজিলের সঙ্গে ড্র করে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়া, আর শেষ বত্রিশে ইউরোপের অন্যতম শক্তি নেদারল্যান্ডসকে স্নায়ুক্ষয়ী পেনাল্টি শুটআউটে বিদায় করা মোহামেদ ওয়াহবির শিষ্যরা খেলছে এক অটুট আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
নকআউটের মঞ্চে কোনো রকম আলসেমি বা ভুল করার সুযোগ নেই বলে মনে করিয়ে দিয়ে মরক্কো বস ওয়াহবি বলেন, ‘এখানে সামান্যতম ভুল করলেই আমাদের বাড়ি ফিরে যেতে হবে। আমাদের নিশ্চিত করতে হবে যে আমাদের কাছে যত রকমের কৌশল আছে, তার সবটুকু এবং আমাদের অস্ত্রাগারের সেরা অস্ত্রগুলো ব্যবহার করে আমরা যেন এই টুর্নামেন্টে যতদূর সম্ভব এগিয়ে যেতে পারি।’
এই ম্যাচকে সামনে রেখে দুই দলের শক্তির গভীরতাও বেশ চমৎকার। কানাডা শিবিরে এখন সবচেয়ে বড় স্বস্তির নাম তাদের সবচেয়ে বড় তারকা ডেভিসের মাঠে ফেরা। ইনজুরির দীর্ঘ লড়াই শেষে আগের ম্যাচে বায়ার্ন মিউনিখের এই লেফট-ব্যাক বদলি হিসেবে শেষ ১৫ মিনিট খেলেছেন। মরক্কোর বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে তিনি শুরু থেকেই খেলতে পারেন বলে ইঙ্গিত মিলেছে। তবে কাতার ম্যাচে পা ভেঙে যাওয়া মিডফিল্ডার ইসমায়েল কোনের অভাবটা আরও একবার পোড়াবে কানাডাকে।
বিপরীতে মরক্কো দলের আশরাফ হাকিমি, যিনি এই ম্যাচে মাঠে নামলেই আফ্রিকান খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৫টি ম্যাচ খেলার নতুন রেকর্ড গড়বেন। সঙ্গে আছেন মাঝমাঠের ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক আইয়ুব বুয়াদ্দি আর বায়ার্ন মিউনিখের নতুন সাইনিং ইসমায়েল সাইবারি। আর টাইব্রেকারের ভাগ্য পরীক্ষায় গোলপোস্টের নিচে যার হাতজোড়া সবসময় ট্রফি জেতার স্বপ্ন দেখায়, সেই ইয়াসিন বোনু তো থাকছেনই।
অতীতের খেরোখাতা অবশ্য মরক্কোর পক্ষেই রায় দিচ্ছে, কারণ দুই দলের আগের দুই দেখায় শেষ হাসি হেসেছে আফ্রিকানরাই, যার সর্বশেষটি ছিল গত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে। তবে এবার সমীকরণ ভিন্ন।