গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর উপজেলার যুগিপাড়া গ্রামের জুয়েল মিয়া। ছোট বেলা থেকে শখ ছিল বাগান করবেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়িতে গড়ে তোলেন একটি বাগান। পরে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে সিদ্ধান্ত নেন কৃষিকাজে যুক্ত হবেন। সেই সিদ্ধান্তই বদলে দিয়েছে তার জীবন।
ইউটিউবের ভিডিও দেখে শিখেন বিদেশি আঙুর ফল উৎপাদনের কৌশল। তিন বছরের ব্যবধানে তার বাগানে ঝুলছে ৩৬ জাতের বিদেশি আঙুর। ফল ও চারা বিক্রি করে আয় করছেন প্রায় দুই লাখ টাকা। আঙুরের স্বাদ ও দেখতে ভিড় করছেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে মাদারহাট যুগিপাড়া গ্রাম। গ্রামটি সাদুল্লাপুর উপজেলার ইদুলপুর ইউনিয়নের অর্ন্তভুক্ত। ওই গ্রামের কৃষক আনছার আলী (৫০) ছেলে জুয়েল মিয়া। তিনি ২০১৪ সালে স্থানীয় একটি বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেন।
পরে চার বছর মেয়াদী পলিটেকনিক থেকে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং করেন। চাকরির জন্যে কোথায়ও না গিয়ে বাবার কৃষিপেশায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ছোট দুই বোন লিমা আক্তার (১৯) ও লিকসা আক্তার (১৬)। মা-বাবা ও স্ত্রী নিয়ে ছয় সদস্যের পরিবার। দুই বোন কলেজে পড়েন। কৃষি কাজ করেই সংসার চলে তাদের। ২০২৪ সালে প্রতিবেশী গ্রামের বিয়ে করেন তিনি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় বাগানের চিত্র। পাকা সড়কের পাশেই রয়েছে সাইনর্বোড ‘জুয়েল নার্সারী’। নার্সারীতে নানা গাছের মধ্যে আঙুর গাছ রয়েছে। গাছে ঝুলছে সবুজের মাঝে টসটস আঙুর। থোকা থোকা আঙুর পোকার আক্রামণ থেকে রক্ষা করতে এক ধরনের ব্যাগ ব্যবহার করছেন। তিনি আঙুরের থোকাগুলো ব্যাগ দিয়ে ডেকে রেখেছেন। বাগানের লোকজন আসছেন। তাদের আঙুর খাওয়াচ্ছেন। মিষ্টি আঙুর দেখে ক্রয় করছেন অনেকেই। কেউ আসছেন চারা নিতে। চারা গাছের আকার ভেদে দাম।
জুয়েল মিয়া মিয়া বলেন, ছোট বেলা থেকে বাগান গড়ার শখ ছিল। লেখাপড়ার পাশাপাশি প্রথমে ৫ শতাংশ জমিতে বাগান করি। চাকরি আমার ভালো লাগে না। চিন্তা ছিল কৃষিই কাজ দিয়ে স্বাবলম্বী হবো। প্রথমে বাগানে আম, কাঠাল, পিয়ারাসহ নানা চারা ছিল। ২০২২ সালের শেষের দিকে ১০ শতাংশ জমিতে আঙুর গাছ লাগানো হয়। পরের বছর ফল আসে। কিন্তু সেগুলো টক ছিল। অর্থাৎ মিষ্টি কম ছিল।
এরপর আঙুর মিষ্টি করা সম্ভব কি না বা মিষ্টি জাতের আঙুর দেশে আছে কি না, এ নিয়ে আমি ইউটিউব সাইটে ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি। তখন ইউটিউরের দেখে আঙুর চাষের কৌশল ও পরিচর্যা দেখি । পরে কুড়িগ্রামের এক চাষীর কাছ থেকে ২০২৩ সালে মাত্র পাঁচটি চারা সংগ্রহ করি। ফল আসলে সেগুলো মিষ্টি ছিল। এভাবে ওই গাছে কলম দিতে থাকি। এভাবে আমার আঙুর চাষ শুরু হয়।
জুয়েল মিয়া বলেন, বতর্মানে বাড়ির সামনে পাকা রাস্তা ঘেষে ১০ শতাংশ ও বাড়ির পিছনে ১৫ শতাংশ জমিতে আঙুর চাষ করছেন। বাগানে বাইকুনুর, বারগ্লিনা, জয় সিডলেস, গ্লিন লং, ক্লোম সিডলেস, রেড গ্লোরসহ ৩৬ জাতের বিদেশি আঙুর রয়েছে। সব মিলে বাগানে এখন ১১০টি গাছ রয়েছে।
প্রথমে গ্রামের লোকজন হাসি তামাসা করলেও এখন তারাও বাগান করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। অনেকেই চারা সংগ্রহে করেছেন। চলতি মৌসুমে ৩৫-৪০টি গাছে একযোগে ব্যাপক ফলন এসেছে।
বাগান দেখতে আসা প্রতিবেশী গ্রামের আশরাফুল ইসলাম বলেন, নিজ হাতে গাছ থেকে ছিড়ে এত সুন্দর সুস্বাদু আঙুর খেলাম। বাগানট দেখে বেশ সুন্দর। দুটি বাগানই দেখেছি। এক সাথে অনেক জাতের আঙুর দেখলাম। ভালো লাগছে।
তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা জুয়েল মিয়া বলেন, বিদেশি জাতের আঙুর গুলোর চারা সংগ্রহের পর নিজে চারা তৈরির কৌশল শিখি। এরপর চারা উৎপাদন করা শুরু করি। সেই চারা দিয়ে বাগান করেছি। ভিডিও দেখে দেখে নিজে চেষ্টা করে সফল হয়েছি। আশা করছি, আঙুর নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তিনি বলেন, ২৫ শতাংশ বাগান করতে প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ২০২৬ সালে ফল ও চারা বিক্রি হয়েছে প্রায় লক্ষাধিক টাকা। ৩০০-৪০০ টাকা কেজি দরে আঙুর বিক্রি হয়েছে। প্রতিটি আঙুরগাছের চারা ২০০ টাকা শুরু করে ৪০০ টাকা পযর্ন্ত বিক্রি করা হয়।
আঙুর চাষে প্রতিবন্ধকতা আছে কি না জানতে চাইলে জুয়েল মিয়া বলেন, অতিমাত্রায় বৃষ্টির কারণে ফল পচন ধরে। বিশেষ করে, যখন ফল পাকা শুরু করে, তখন এই সমস্যা বেশি দেখা দেয়। এবার অনেক ফল নষ্ট হয়েছে। বৃষ্টির হাত থেকে রক্ষা করতে প্রযুক্তি দরকার। বিদেশে বাগান গুলোতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা যায়, তারা পলি নেট ইত্যাদি ব্যবহার করছে। চেষ্টা করছি, এরকম ভাবে করতে। আমাদের দেশে এভাবে করতে পারলে ফল কম নষ্ট হবে। এতে ভালো ফলন পাওয়া যাবে। তখন বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন করে বিদেশেও রপ্তানি করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
গাইবান্ধা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ রোস্তম আলী জানান, আমরা ইতিমধ্যে বাগান দুটি পরিদর্শন করেছি। দোআঁশ মাটি ও সঠিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে গাইবান্ধায় আঙুর চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। কৃষি অফিস থেকে তাকে নানা পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।