প্রতিকূলতা ছাপিয়ে স্কালোনির অপ্রতিরোধ্য আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যেকোনো প্রতিপক্ষই বিষাদ ছড়াতে পারে, তার আরও একটি প্রমাণ মিলল মায়ামির শেষ বত্রিশের মঞ্চে। মাঠের অদ্ভুত আচরণ আর বলের মন্থর গতির মতো নানা প্রতিকূলতা ছাপিয়ে অবশ্য শেষ পর্যন্ত পুঁচকে কেপ ভার্দের বিপক্ষে জয় ছিনিয়ে নিয়েছে স্কালোনির অপ্রতিরোধ্য আর্জেন্টিনা।

তবে কাগজ-কলমে যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা দলটির বিপক্ষে এই শ্বাসরুদ্ধকর ৩-২ গোলের জয়টি যেন এক চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে আলবিসেলেস্তেদের। যারা ভেবেছিলেন গ্রুপ পর্বের সমীকরণ শেষে আর্জেন্টিনার জন্য এই ধাপটি একেবারেই সহজ হবে, তাদের একদম কড়া জবাব দিয়েছে এই আফ্রিকান পুঁচকে দলটি। আর ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের ক্লান্তি আর স্বস্তির মাঝে দাঁড়িয়ে মেসিদের কোচ লিওনেল স্কালোনি মনে করিয়ে দিলেন, বিশ্বমঞ্চে অন্তত আর্জেন্টিনার জন্য কোনো কিছুই সহজে আসে না; সব বাধা মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার নামই আর্জেন্টিনা।

যারা টুর্নামেন্টের ড্র হওয়ার পর আর্জেন্টিনার সহজ পথ নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন, তাদের উদ্দেশ্য করে ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনি বেশ কড়া সুরেই বলেন, “এই ম্যাচটি তাদের জন্য মোক্ষম জবাব, যারা বলেছিলেন ড্রয়ের পর আমাদের সামনে যাওয়ার রাস্তাটা নাকি খুব সহজ ছিল। অবশ্যই আমরা জেতার এবং পরের রাউন্ডে যাওয়ার যোগ্য দাবিদার ছিলাম, তবে মাঠের লড়াইটা ছিল অবিশ্বাস্য রকমের কঠিন।” 

১২০ মিনিটের এই হাড়ভাঙা খাটুনি আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট ফুটিয়ে তুলেছে। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচের ক্লান্তি আর পেশির টানের ধকল সামলে জয় ছিনিয়ে আনা ছেলেদের প্রশংসায় ভাসিয়েছেন কোচ। দলের লড়াকু মানসিকতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, “ছেলেরা ম্যাচ শেষে একদম নিংড়ে গেছে, ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। আমাদের কিছু জায়গায় এখনও উন্নতির সুযোগ আছে, তবে তারা যে ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা দেখিয়েছে, তা সত্যি দারুণ। অতিরিক্ত সময়ের কারণে ফুটবলাররা ভীষণ ক্লান্ত, অনেকের পায়ে ক্র্যাম্পও হচ্ছিল। তবে তারা যখন হৃদয় নিংড়ে খেলে, তখন যেকোনো বাধাই টপকে যাওয়া সম্ভব। আজ দল নিজের চরিত্র ও যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে।” 

ম্যাচের একপর্যায়ে যখন কেপ ভার্দের লেফট ব্যাক সিডনি লোপেস ক্যাব্রাল এক জাদুকরী শটে বল আর্জেন্টিনার জালে জড়িয়ে ম্যাচ সমতায় ফেরান, তখন মাঠের ফুটবলার থেকে শুরু করে ডাগআউটের ডিরেক্টরের হৃৎস্পন্দনও যেন থমকে গিয়েছিল। সেই রোমাঞ্চকর মুহূর্তের স্মৃতিচারণ করে স্কালোনি অকপটে স্বীকার করেন, তিনি তখন কেবল ম্যাচটি শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন। বাইরে থেকে শান্ত দেখালেও মনের ভেতর যে আশঙ্কার মেঘ জমেছিল, তা লুকাতে চাননি এই মাস্টারমাইন্ড।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন বা ফেভারিটের তকমা কি দলের ওপর বাড়তি কোনো মানসিক চাপ তৈরি করছে?—এমন প্রশ্নের উত্তরে স্কালোনি বেশ দৃঢ়তার সাথেই তা নাকচ করে দেন। তার মতে, আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা কখনোই থামতে জানে না। মাঠের অদ্ভুত আচরণ আর বলের মন্থর গতির প্রতিকূলতাকে জয় করেই বুক চিতিয়ে লড়েছে তার দল। তবে মাঠের কন্ডিশন নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে স্কালোনি সরাসরি বলেন, “মাঠের আচরণটা আজ ভীষণ অদ্ভুত ছিল; বল যেভাবে চলায় আমরা অভ্যস্ত, সেভাবে মোটেও চলছিল না। সত্যি বলতে, খেলার জন্য পরিস্থিতিটা একদমই আদর্শ ছিল না।” 

ম্যাচের কেপ ভার্দের লড়াইয়ের প্রশংসাও করেন স্কালোনি। সঙ্গে আর্জেন্টাইন ফুটবলের চিরন্তন এক দর্শন মনে করিয়ে তিনি বলেন, “আর্জেন্টাইন হওয়া মানে আসলে কী? এর মানে হলো ভুগতে শেখা, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কষ্ট সয়ে লড়াই করা। কেপ ভার্দে আজ মাঠে তাদের ২০০ ভাগ উজাড় করে দিয়েছিল, আর ফুটবলে যখন কেউ এমনটা করে, তখন শক্তির ব্যবধান ঘুচে যায়। আমাদের সমর্থকরা সবচেয়ে ভালো বোঝেন যে এটা আর্জেন্টিনা, আর আমাদের জন্য কোনো কিছুই সহজ নয়। এই জার্সির একটা আলাদা মাহাত্ম্য আছে। আমরা সামনে এগিয়ে যাব এবং এই কঠিন লড়াই আমাদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছে।” 

বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের মঞ্চে পুঁচকে কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে ১২০ মিনিটের হাড়ভাঙা খাটুনি। মাঠের অদ্ভুত আচরণ, বলের মন্থর গতি আর প্রতিপক্ষের অবিশ্বাস্য প্রতিরোধ—সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার শরীরী ভাষা তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়ার উপক্রম। ফুটবলারদের পায়ে ক্র্যাম্প, চোখে-মুখে চরম অবসাদ। কিন্তু ডাগআউটের মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি খুব ভালো করেই জানেন, আলবিসেলেস্তেদের আসল শক্তি লুকিয়ে আছে তাদের অন্তরে। ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের সেই ক্লান্তি আর স্বস্তির আবহেই স্কালোনি মনে করিয়ে দিলেন, কৌশল বা শারীরিক সক্ষমতা ছাপিয়ে বুক চিতিয়ে লড়াইয়ের চিরন্তন চরিত্রই আজ আর্জেন্টিনাকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলেছে।