বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের মঞ্চে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বিশ্ব র্যাংকিংয়ের ৬৪ নম্বর দলটির এমন বুক চিতিয়ে লড়াই করার দৃশ্য ফুটবলীয় সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচে ৩-২ ব্যবধানে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিলেও, তিনবারের বিশ্বজয়ীদের যেভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছিল কেপ ভার্দে, তা ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অনেকদিন অমলিন থাকবে।
প্রথমবারের মতো বিশ্বমঞ্চে এসেই স্পেন ও উরুগুয়ের মতো সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের রুখে দিয়ে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় চমক হয়ে উঠেছিল এই আফ্রিকান প্রতিনিধিরা। এবার মেসিদের সামনে বুক চিতিয়ে লড়াই করে দেখিয়ে দিল তারা এখন আর স্রেফ চমক নয়!
ম্যাচ শেষে ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা ছিল ভীষণ ভারী। যেখানে কান্না আর বিদায়ের বিষাদ একাকার হয়ে গিয়েছিল। তবে এই কান্নার মাঝেও ছিল বুকভরা গর্ব। দলের স্বপ্নসারথি এবং হেড কোচ বুবিস্তা শিষ্যদের এই লড়াকু মানসিকতায় ভীষণ গর্বিত। ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে নিজের আবেগ লুকাতে পারেননি এই মাস্টারমাইন্ড। তিনি বলেন, “ড্রেসিংরুমের পরিবেশটা এখন শুধুই বিষাদের। আমরা ম্যাচটা হেরেছি এবং টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিচ্ছি বলেই এই মন খারাপ। কারণ আমরা জয়ের খুব কাছে চলে গিয়েছিলাম, একদমই কাছে। তবে এই দুঃখের মাঝেও খেলোয়াড়রা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। এটাই আসলে একটা দলের গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া। এই অভিজ্ঞতা আমাদের আরও পরিপক্ক করবে এবং প্রমাণ করে যে এই দলটার একটা নিজস্ব প্রাণ আছে।”
দলের বেশির ভাগ ফুটবলারই বিশ্বের শীর্ষ সারির কোনো লিগে খেলেন না, অথচ আর্জেন্টিনার মতো বিশ্বসেরা তারকাবেষ্টিত দলের বিরুদ্ধে পুরো ১২০ মিনিট সমানে সমানে লড়াই করেছে তারা। কোচের মতে, এই বীরত্ব কেবল ফুটবলীয় দক্ষতার নয়, বরং আত্মমর্যাদা ও সাহসিকতার এক অনন্য দলিল। সেই প্রসঙ্গ বুবিস্তা বলেন, “আমি আমার ছেলেদের নিয়ে গর্বিত। তারা মাঠে সাহসিকতা ও মর্যাদার সাথে লড়াই করেছে। আর্জেন্টিনা কেন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন, তারা আজ সেটা প্রমাণ করেছে। তবে আমাদের দলটাও দেখিয়ে দিয়েছে এই ম্যাচটা জেতার জন্য তারা কতটা ক্ষুধার্ত ছিল। আমার মনে হয় না অন্য কোনো দল আর্জেন্টিনার জালে দুই গোল দিয়ে ম্যাচটিকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখাতে পারত। এটা আমাদের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও দক্ষতারই প্রমাণ।”
ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। এই বিশ্বকাপের মঞ্চটি তাদের কাছে কেবল ফুটবল খেলার মাঠ ছিল না, বরং বিশ্ব মানচিত্রে নিজেদের অস্তিত্ব ও আত্মপরিচয় মেলে ধরার এক সোনালী সুযোগ ছিল। পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে তারা সেই সংস্কৃতিরই প্রতিনিধিত্ব করেছে। তাই হারলেও যেন কেপ ভার্দের এই বিদায় ছিল সম্মান নিয়ে প্রস্থান।