হজের খরচ কমার বিষয়ে আমরা আশাবাদী

২০২৭ সালে পবিত্র হজ পালনে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের জন্য প্রাক-নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সৌদি আরবের নতুন হজ রোডম্যাপ অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। নিবন্ধনসহ হজের প্রস্তুতির নানা বিষয়ে কথা বলেছেন হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) সহসভাপতি হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মুফতি আতিকুর রহমান

দেশ রূপান্তর : প্রাক-নিবন্ধনে সাড়া কেমন?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : হজের জন্য প্রাক-নিবন্ধন প্রায় সারা বছরই করা যায়। তবে হজের পর কয়েক দিন সার্ভার বন্ধ থাকে। সে হিসেবে কয়েক দিন সার্ভার বন্ধ ছিল। ২০২৭ সালের হজে অংশগ্রহণে আগ্রহীরা ১ জুলাই থেকে প্রাক-নিবন্ধন করতে পারছেন। তবে নিবন্ধনে এখনও সেভাবে গতি আসেনি। এজেন্সিগুলো কাজ শুরু করেছে।

দেশ রূপান্তর : এবার হজ প্রস্তুতি কি একটু আগে শুরু হলো?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : আগামী বছরের হজের নিবন্ধনের সময় আরও এগিয়ে এনেছে সৌদি আরব। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, ২০২৭ সালের হজের জন্য বাংলাদেশি হজযাত্রীদের নিবন্ধন শেষ করতে হবে আগামী ২৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে। চলতি বছরের তুলনায় যা শেষ হবে ১৬ দিন আগে। একই সঙ্গে আবাসন, তাঁবু বুকিং, সেবা প্যাকেজ চূড়ান্ত করা এবং অর্থ স্থানান্তরসহ অধিকাংশ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে হজের কয়েক মাস আগেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাক-নিবন্ধন সম্পন্ন না করলে পরবর্তী হজ কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই আগ্রহী হজযাত্রীদের সময়মতো নিবন্ধন সম্পন্ন করা দরকার।

দেশ রূপান্তর : সৌদি আরবের নতুন সিদ্ধান্তে হজ ব্যবস্থাপনা কী কিছুটা জটিল হলো?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : আসলে এটাকে জটিল বলা যাচ্ছে না। তবে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে নিবন্ধনের লক্ষ্য পূরণ হওয়া নিয়ে। এসব নির্ভর করবে হজের খরচ কমানোর সরকারি প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়ন হবে, তার ওপর। সময়মতো হজের সিদ্ধান্ত ও নিবন্ধন নিশ্চিত করতে না পারলে আগামী হজ মৌসুমে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশ। সৌদি আরব এখন পুরো হজ ব্যবস্থাপনা অনলাইন ও কম্পিউটারাইজড সিস্টেমের আওতায় নিয়ে এসেছে। তারা আগে থেকেই সবকিছু গুছিয়ে নিতে চায়। সময়মতো প্রস্তুতি না হলে তাদের যেমন সমস্যা হয়, আমাদেরও হয়।

এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত ও বেশি সংখ্যক নিবন্ধন নিশ্চিত করা। নিবন্ধনই আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। আগামী কয়েক মাসে যত বেশি নিবন্ধন নিশ্চিত করা যাবে, তত সহজ হবে পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করা। এ জন্য হজ পালনেচ্ছুকদের সচেতন হতে হবে, সরকারকে হজ প্যাকেজ দ্রুত ঘোষণা করতে হবে। হজযাত্রীদের মধ্যে আগাম নিবন্ধনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বাড়াতে হবে প্রচার-প্রচারণা। গণমাধ্যম এবং হজ এজেন্সিগুলো একসঙ্গে কাজ করলে মানুষ আগেভাগেই নিবন্ধন সম্পন্ন করবে বলে আশা করছি।

দেশ রূপান্তর : দিন দিন বাংলাদেশ থেকে হাজির সংখ্যা কমছে কেন?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৮৭ হাজারের বেশি হজযাত্রী হজ পালন করেন। তবে সময়সূচি এগিয়ে আনা এবং নানা কারণে ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৭৮ হাজার ৫০০ জনে। চলতি বছর সরকারি ব্যবস্থাপনায় হজ পালন করেছেন ৪ হাজার ৫৬৫ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন। আগামী বছর হজযাত্রীর সংখ্যা কিছুটা কমতেও পারে, আবার বাড়তেও পারে। এটি পুরোপুরি নিবন্ধনের ওপর নির্ভর করবে।

সামগ্রিকভাবে হাজি কমার কারণ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা। আবার সৌদি আরবের নতুন নীতিমালার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারায় অনেকেই শেষ মুহূর্তে হজের নিয়ত করেও যেতে পারছেন না। কাউকে জোর করে হজে পাঠানো যায় না। আবার ইচ্ছা করলেই যাওয়া যায় না। একটা সিস্টেমের মধ্যে হাজিদের পাঠাতে হয়। গ্রামগঞ্জে এখনো অনেকেই মনে করেন শেষ সময়ে নিবন্ধন করলেও হজে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু নতুন বাস্তবতায় এ ধারণা একেবারেই ভুল।

আরেকটি বিষয় হলো, ফরজ হজের চেয়ে ওমরাহর দিকে মানুষ ঝুঁকছে। কিন্তু ওমরাহর কারণে হজ ফরজ হয় না বা ফরজ হজ মাফ হয় না, এটা অনেকেই বুঝেন না। এ বিষয়েও সচেতনতা কাম্য।

দেশ রূপান্তর : গত বছরের হজ কেমন হলো?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : বিগত কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দেশের হজ ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। হাজিদের সর্বোত্তম সেবা নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছে সার্বিক হজ কার্যক্রম।

ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ সুষ্ঠু হজ ব্যবস্থাপনার স্বার্থে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আগেই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন, হাজিদের সেবার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য বরদাশত করা হবে না। একই সঙ্গে উন্নত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য তিনি পুরস্কারের ঘোষণাও করেন। এ ছাড়া বেসরকারি হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (হাব) এবং হজ সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর প্রতিও কঠোর নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়, ঢাকা ও মক্কাস্থ বাংলাদেশ হজ মিশন এবং হাবের সদস্যরা সমন্বিতভাবে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হজযাত্রীদের ভিসা ও টিকিট ইস্যুর কাজ সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি হজ ফ্লাইট পরিচালনায়ও কোনো ধরনের শিডিউল বিপর্যয় ঘটেনি। ছোটখাটো দুয়েকটি ঘটনা ছাড়া হজযাত্রীদের লাগেজ ব্যবস্থাপনাও ছিল অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি সুশৃঙ্খল ও উন্নত।

দেশ রূপান্তর : এবার কেমন হতে পারে হজের খরচ?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : আগামী বছরের হজ নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় আগ্রহের জায়গা খরচ। তবে সৌদি প্রান্তের খরচ অপরিবর্তিত থাকলেও সরকারের প্রতিশ্রুতি বিবেচনায় নিলে এবার হজের খরচ কমছে, এটা মোটামুটি নিশ্চিত বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। গত ১৭ এপ্রিল চলতি বছরের হজ ফ্লাইট উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, চলতি বছর হজ ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে এবং আগামী বছর আরও কম খরচে মানুষকে হজে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিনও হজকে আরও সাশ্রয়ী করার কথা জানান। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে হজের খরচ কীভাবে কমিয়ে আনা যায়, সেটি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে। আমরা আশাবাদী হজের খরচ কমার বিষয়ে।

দেশ রূপান্তর : হজের ব্যয় কীভাবে কমনো যায় বলে মনে করেন?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : হজের ব্যয় কমানোর ক্ষেত্রে উড়োজাহাজ ভাড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দীর্ঘদিন ধরে উড়োজাহাজ ভাড়া যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার দাবি জানিয়ে আসছি। উড়োজাহাজ ভাড়া কমানো সম্ভব হলে সামগ্রিক হজ ব্যয়ও কমবে এবং আরও বেশি মানুষ হজ পালনের সুযোগ পাবেন।

আরেকটি কথা, সৌদি আরব আগামী হজ মৌসুমে সেবার কাঠামোতেও কিছু পরিবর্তন আনছে। বিশেষ করে কম খরচের ‘ডি’ ক্যাটাগরির সেবা বাতিল করা হয়েছে। ফলে আগামী বছর হজযাত্রীদের জন্য এ, বি ও সি ক্যাটাগরির সেবাই থাকবে। এতে খরচের ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

দেশ রূপান্তর : হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কোনো পরামর্শ দিতে চান সরকারকে?

হাফেজ মাওলানা নুর মোহাম্মদ : দেখুন, সৌদি সরকার তাদের নীতিমালা অনুযায়ী হজ কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। আমাদের দেশের সরকারও রাষ্ট্রীয় আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী হজ কার্যক্রম পরিচালনার পদক্ষেপ নেয়। সেক্ষেত্রে সৌদি সরকারের কোনো পদক্ষেপ যদি আমাদের আইন-কানুনের সঙ্গে সাংঘার্ষিক হয়, কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে তা সমাধান করা সরকারেরই দায়িত্ব। ভুলে গেলে চলবে না, প্রত্যেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সারা জীবনের লালিত স্বপ্ন থাকে, একবারের জন্য হলেও হজ পালন করা। তারা এ মহান কাজটির জন্য বিভিন্ন এজেন্সি মালিক এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করেন। কাজেই তারা যেন হজ সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পাদন করতে পারেন, সেজন্য এজেন্সিসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও দপ্তরের আন্তরিক সহযোগিতা জরুরি। হজ ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কাম্য নয়।