আমাদের সমাজে সবার সম্পদের পরিমাণ সমান নয়। কারও সম্পদ অনেক। কারও কম। সম্পদের এই কম-বেশির মধ্যেও মহান আল্লাহ তাদের জন্য সুসংবাদ দিয়েছেন, যারা অল্পে তুষ্ট থাকে, বিপদাপদে ধৈর্য ধারণ করে এবং তার ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকে। এমন সৌভাগ্যবান মানুষের জন্য দুঃখ-কষ্টে ভরা এ পৃথিবীও প্রশান্তি ও সুখের আবাসে পরিণত হয়। কারণ প্রকৃত সুখ ধন-সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, বরং আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টি, ধৈর্য এবং তার ওপর অটল বিশ্বাসের মধ্যেই নিহিত।
বস্তুত ধন-সম্পদ ও জাগতিক ঐশ্বর্যের প্রতি মানুষের স্বভাবজাত ভালোবাসা ও আকর্ষণ রয়েছে। মানবসভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই এই প্রবণতা মানুষের অন্তরে বিদ্যমান। তবুও যারা এই স্বাভাবিক আকর্ষণকে সংযত করে অল্পে তুষ্ট থাকার মহৎ গুণ অর্জন করতে সক্ষম হয়, তাদের জন্য ক্ষণস্থায়ী এ দুনিয়ার জীবনযাত্রা অনেক সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়। কারণ অল্পে তুষ্টি মানুষকে লোভ ও অতৃপ্তির শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দেয় এবং হৃদয়ে প্রশান্তির আলো জ্বালিয়ে দেয়। জীবনের কঠিন ও প্রতিকূল মুহূর্তে যখন একজন মানুষ অল্পের মধ্যেই নিজেকে মানিয়ে নিতে শেখে, তখন সে হয়ে ওঠে ধৈর্যশীল, সহনশীল ও দৃঢ়চেতা। দুঃখ-কষ্ট, অভাব-অনটন কিংবা জাগতিক বঞ্চনা তার কাছে আর অসহনীয় মনে হয় না। বরং সবকিছুই তার কাছে হালকা ও সহজ হয়ে যায়। ফলস্বরূপ সে লাভ করে অন্তরের প্রশান্তি, আত্মার গভীর তৃপ্তি এবং এমন সুখানুভূতি, যা বিপুল ধন-সম্পদ দিয়েও অর্জন করা সম্ভব নয়।
সুখ-দুঃখের মাপকাঠি : আমরা সাধারণত সুখ-দুঃখের মাপকাঠি নির্ধারণ করি অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য ও স্বল্পতার ভিত্তিতে। মনে করি, ধনীরাই সুখ-শান্তির প্রকৃত অধিকারী, আর অভাবী মানুষের জীবনে যেন আনন্দের কোনো স্থান নেই। অথচ বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। অর্থ দিয়ে প্রয়োজন মেটানো যায়, কিন্তু প্রকৃত সুখ ও মানসিক প্রশান্তি কেনা যায় না। সত্যিকার সুখ নির্ভর করে অন্তরের তৃপ্তি ও আত্মপ্রশান্তির ওপর।
এ কারণেই দেখা যায়, অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও অনেক মানুষ মানসিক অশান্তি, উদ্বেগ ও অতৃপ্তিতে ভোগে। ধন-সম্পদ, বিলাসিতা ও বাহ্যিক ঐশ্বর্য থাকা সত্ত্বেও তাদের জীবনে শান্তির ছোঁয়া থাকে না। অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ ও সীমাহীন চাহিদা তাদের অন্তরকে অস্থির করে তোলে। পক্ষান্তরে, অল্পে তুষ্ট ও আত্মতৃপ্ত একজন মানুষ সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও এমন প্রশান্তি লাভ করতে পারে, যা বিপুল সম্পদ দিয়েও অর্জন করা সম্ভব নয়।
সম্পদই সুখ নয় : অর্থ-কড়িই সুখ-শান্তির একমাত্র চাবিকাঠি নয়। বরং প্রকৃত সুখ নিহিত রয়েছে মনের প্রশান্তি ও হৃদয়ের তৃপ্তিতে। এই গভীর বাস্তবতাই আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মানবজাতিকে শিক্ষা দিয়েছেন।
একবার তিনি প্রিয় সাহাবি আবু জর (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আবু জর! তুমি কি সম্পদের প্রাচুর্যকেই স্বচ্ছলতা মনে করো? তিনি সম্মতিসূচক উত্তর দিলেন। এরপর নবীজি (সা.) আবার প্রশ্ন করলেন, অর্থের স্বল্পতাকেই কি তুমি দারিদ্র্য মনে করো? এবারও তিনি হ্যাঁ বললেন। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি সত্য তুলে ধরে বললেন, শোনো! প্রকৃত সচ্ছলতা হলো হৃদয়ের সচ্ছলতা, আর প্রকৃত দারিদ্র্য হলো হৃদয়ের দারিদ্র্য। (সহিহ ইবনে হিব্বান) অতএব, মানুষের প্রকৃত সম্পদ হলো তার অন্তরের প্রশান্তি। আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্টি এবং অল্পে তুষ্ট থাকার মানসিকতাই তাকে প্রকৃত অর্থে ধনী করে তোলে।
সম্পদের প্রতি আকর্ষণ : ধন-সম্পদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকা স্বাভাবিক। কেননা এটি মানুষের সৃষ্টিগত ও স্বভাবজাত প্রবণতা। মহান আল্লাহ মানবমনের এই বাস্তবতাকে সামনে রেখেই পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘মানুষের জন্য সুশোভিত করা হয়েছে প্রবৃত্তির ভালোবাসা, নারী, সন্তানাদি, সোনা-রুপা, চিহ্নিত ঘোড়া, গবাদিপশু ও শস্যক্ষেত। এগুলো দুনিয়ার জীবনের ভোগসামগ্রী। আর আল্লাহর নিকট রয়েছে উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।’ (সুরা আলে ইমরান ১৪)
এ বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আদম সন্তানের যদি দুটি উপত্যকাভর্তি সম্পদও থাকে, তবুও সে আরেক উপত্যকা সম্পদ কামনা করবে। মাটি ছাড়া আর কিছুই তার উদর পূর্ণ করতে পারবে না।’ (সহিহ বুখারি ৬৪৩৬)
অতএব, ধন-সম্পদের প্রতি মানুষের আকর্ষণ কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। অস্বাভাবিক হলো এর দাসে পরিণত হওয়া। পক্ষান্তরে, যারা প্রবল আকাক্সক্ষাকে সংযত করতে পারে এবং আল্লাহর দেওয়া রিজিকে সন্তুষ্ট থাকে, তাদের জন্য দুঃখ-কষ্টে ভরা এই পৃথিবীও প্রশান্তির জান্নাতে রূপ নেয়। তাদের অন্তর ভরে ওঠে আত্মতৃপ্তির নির্মল আনন্দে, মানুষ তাদের ভালোবাসে, আর সর্বোপরি মহান আল্লাহ তাদের বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহে আগলে রাখেন।
অল্পে তুষ্টির উপমা : হজরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন অল্পে তুষ্টি ও সরলতার উজ্জ্বল প্রতীক। সাদামাটা জীবনযাপনই ছিল তার জীবনের বৈশিষ্ট্য। লোভ-লালসা, ভোগ-বিলাস কিংবা জাগতিক ঐশ্বর্যের প্রতি মোহ তার পবিত্র সত্তার সম্পূর্ণ বিপরীত ছিল। তাই তার জীবনাদর্শ আমাদের শেখায়, প্রকৃত সুখ সম্পদের প্রাচুর্যে নয়, বরং অন্তরের প্রশান্তি ও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টির মধ্যেই নিহিত।
হাদিস ও সিরাতের গ্রন্থগুলো আজও তার সেই অনন্য জীবনচিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরে। সীমিত সামর্থ্যরে মধ্যেও তার হৃদয় ছিল পরিপূর্ণ প্রশান্তিতে ভরা। এমনও সময় গেছে, যখন তার ঘরের চুলায় কয়েক দিন ধরে আগুন জ¦লেনি। তবুও তার কাছে কোনো অভিযোগ ছিল না, ছিল না কোনো আক্ষেপ। জীবনের শেষ দিকে সমগ্র হেজাজ তার নেতৃত্ব ও কর্র্তৃত্বের অধীনে চলে এলেও জীবনযাপনে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন আসেনি। তিনি আগের মতোই ছিলেন বিনয়ী, সংযমী ও অল্পে তুষ্ট। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ইন্তেকাল করার আগ পর্যন্ত তার পরিবার কখনো পরপর দুদিন যবের রুটি পেট ভরে খেতে পারেনি।’ (সহিহ মুসলিম ২৯৭০)
ভাবতে অবাক লাগে, যার নেতৃত্বে সমগ্র হেজাজ নত হয়েছিল, তার ঘরের অবস্থা ছিল এতটাই সাধারণ। কিন্তু সেই অভাবের মাঝেও তার হৃদয়ে ছিল না সামান্য আক্ষেপ, ছিল না কোনো অভিযোগ। কারণ তার প্রকৃত সম্পদ ছিল আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থা এবং অন্তরের অফুরন্ত প্রশান্তি।
আমাদের করণীয় : প্রথমত ধৈর্য ধারণ করা। ধৈর্য সফলতার প্রথম সোপান। ধৈর্য ছাড়া কোনো মহান লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। তেমনি অল্পে তুষ্ট থাকার গুণও ধৈর্যের ওপরই প্রতিষ্ঠিত। তাই এ মহৎ গুণ অর্জন করতে হলে সর্বপ্রথম ধৈর্যের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করতে হবে। অভাব-অনটন কিংবা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিচলিত না হয়ে আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে হবে এবং তার কাছেই উত্তম প্রতিদানের আশা করতে হবে। যে ব্যক্তি ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকে, আল্লাহ তার অন্তরকে প্রশান্তিতে ভরে দেন।
দ্বিতীয়ত দুনিয়ার চাকচিক্যের প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করা। দুনিয়ার ধন-সম্পদ, বিলাসিতা ও বাহ্যিক জৌলুশ ক্ষণস্থায়ী। এগুলো জীবনের মূল লক্ষ্য নয়, বরং সাময়িক ভোগের কিছু উপকরণ মাত্র। মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই এসবের মোহ ও মূল্য ফিকে হয়ে যাবে। তাই একজন মুমিনের দৃষ্টি থাকবে চিরস্থায়ী আখেরাতের দিকে। এ সত্যকে স্পষ্ট করে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুনিয়ার সঙ্গে আমার দৃষ্টান্ত সেই অশ্বারোহীর মতো, যে সফরের পথে একটি গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার নিজের গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা হয়ে যায়।’ অর্থাৎ এই পৃথিবী কেবল ক্ষণিকের বিশ্রামস্থল, আমাদের প্রকৃত গন্তব্য আখেরাত।
তৃতীয়ত সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত লোভ-লালসা এবং অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ দূর করা। লোভ ও হিংসা মানুষের চরিত্রকে কলুষিত করে, অন্তরের প্রশান্তি কেড়ে নেয় এবং তাকে কখনোই প্রকৃত সুখের সন্ধান দেয় না। বরং এগুলো মানুষকে নিজের মর্যাদা বিসর্জন দিয়ে অন্যের সামনে নত হতে বাধ্য করে। তাই এ ধরনের নিকৃষ্ট প্রবৃত্তিকে পরিহার করে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ করা উচিত। তার জীবন ও আমাদের জীবনের পার্থক্যগুলো চিহ্নিত করে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধনের চেষ্টা করতে হবে।
পাশাপাশি এ কথাও মনে রাখতে হবে, অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য সব সময় কল্যাণকর নয়। অনেক সময় তা মানুষকে অহংকার, ভোগ-বিলাস ও নানা অপকর্মের দিকে ঠেলে দেয়।
আল্লাহর কাছে দোয়া করা জরুরি। কোনো কাজে সফল হওয়ার জন্য চেষ্টা যেমন অপরিহার্য, তেমনি সেই চেষ্টাকে সফল করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর হাতেই। মানুষের দায়িত্ব হলো আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, আর ফলাফলের জন্য রবের দরবারে বিনম্রভাবে প্রার্থনা করা। যখন নিরলস প্রচেষ্টার সঙ্গে আন্তরিক দোয়ার সমন্বয় ঘটে, তখন সফলতার সম্ভাবনা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
আমরা যদি ধৈর্য, দুনিয়াবিমুখতা, লোভমুক্ত জীবন এবং আল্লাহর প্রতি পূর্ণ নির্ভরতার এই শিক্ষাগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে ইনশাআল্লাহ আমাদের জীবন আর অপূর্ণতার ভারে ন্যুব্জ হবে না। বরং অন্তর ভরে উঠবে প্রশান্তিতে, জীবন সুশোভিত হবে তৃপ্তি ও প্রফুল্লতায়। আর প্রতিটি দিন হয়ে উঠবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন উপলক্ষ।
লেখক : শিক্ষার্থী, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া
কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা