বিক্ষোভে অচল আজাদ কাশ্মীর

টানা ২৬ দিন ধরে চলা তীব্র অসহযোগ আন্দোলনে কার্যত অচল ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পাকিস্তান অধ্যুষিত কাশ্মীর। আন্দোলনকারীদের অনড় অবস্থান আর সরকারের কঠোর দমননীতিদুয়ে মিলে অঞ্চলটির পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অঞ্চলজুড়ে উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। আন্দোলনকারীদের দাবি, সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৩০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। তবে সরকারি হিসাবে নিহতের সংখ্যা অন্তত ২০। এ ছাড়া পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে শতাধিক মানুষ আহত এবং এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় কাশ্মীরে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে এবং সেখানকার মানবিক পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে।

নিত্যপণ্যের দাম কমানো ও বিদ্যুতের দামে ভর্তুকির দাবিতে ২০২৩ সালের মে মাসে আন্দোলন শুরু হয়। বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে গঠিত অরাজনৈতিক সংগঠন জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি এ আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেও একই ধরনের অনির্দিষ্টকালের শাটডাউনে কাশ্মীরে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। পরে সরকার বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও তা কার্যকর না হওয়ায় গত ৯ জুন থেকে নতুন করে ৩৮ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এর আগে ৫ জুন সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং পলাতক নেতাদের ধরতে পুরস্কারও ঘোষণা করে সরকার। এবারের আন্দোলনে নারী, শিশু ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। আন্দোলনকারীদের ‘পাকিস্তানি বাহিনী কাশ্মীর ছাড়’, ‘আমরা মৌলিক অধিকার চাই’, ‘বিনামূল্যে শিক্ষা চাই’সহ নানা সেøাগান দিতে দেখা গেছে।

আন্দোলনের নেতারা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘদিন ধরে ইসলামাবাদ কাশ্মীরের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করে আসছে। তাদের দাবি, কাশ্মীরে উৎপাদিত বিদ্যুতই স্থানীয়দের উচ্চমূল্যে কিনতে হচ্ছে। পাশাপাশি খাদ্যপণ্যের দাম, সরকারি অপচয় এবং ভিআইপি প্রোটোকল বাতিলের দাবিও তুলেছেন তারা। আগামী ২৭ জুলাই অনুষ্ঠেয় বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নতুন গতি এসেছে। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কাশ্মীরের বাইরে থাকা শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষিত ১২টি আসন ব্যবহার করে কেন্দ্র সরকার এ অঞ্চলের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে। তাই ওই সংরক্ষিত আসন বাতিলের দাবিও জানানো হয়েছে। শুরু থেকেই আন্দোলনের অংশ হিসেবে পরিবহন ধর্মঘট, দোকানপাট বন্ধ, অবস্থান কর্মসূচি ও লংমার্চ পালন করা হচ্ছে। মুজাফফরাবাদ, রাওয়ালকোট, মিরপুরসহ বিভিন্ন শহরে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার বন্ধ রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, আন্দোলন দমাতে সরকার খাদ্য, জ্বালানি, ওষুধসহ জরুরি পণ্যের সরবরাহ সীমিত করেছে। পাশাপাশি ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট সেবা বন্ধ থাকায় ব্যাংকিং ও এটিএম কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। কারফিউ ও গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে অঞ্চলটি কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী কাশ্মীরিরাও পাকিস্তানের দূতাবাসের সামনে বিক্ষোভ করছেন। অ্যাকশন কমিটির নেতারা বলছেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রের বৈষম্য আর দমনপীড়নের ইতিহাস পুরনো। ৩৮ দফা দাবি না মানলে মুজাফফরাবাদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার পরিচালনা, কাশ্মীর থেকে পাকিস্তান হটানোর চূড়ান্ত কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন নেতারা। সম্প্রতি এক সমাবেশে জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটির নেতা সরদার আমান খান দাবি করেন, আজাদ কাশ্মীর কখনোই পাকিস্তানের অংশ ছিল না। তার বক্তব্য, কাশ্মীরের চেয়ে এই অঞ্চল পাকিস্তানেরই বেশি প্রয়োজন।