তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। জুন মাসের আট দিনের তাপপ্রবাহে ইউরোপের ৩ দেশ ফ্রান্স, বেলজিয়াম এবং নেদারল্যান্ডসে ৩ হাজার ৭০০ মৃত্যু হয়েছে। গতকাল শনিবার তিন দেশের সরকারি তথ্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। দেশগুলোর কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এ সংখ্যা এখনো প্রাথমিক। চূড়ান্ত হিসাব প্রকাশ হলে মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ফ্রান্সে তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে জুন মাসের শেষ সপ্তাহে রেকর্ড পরিমাণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। ফ্রান্সের স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্টেফানি রিস্ট জানিয়েছেন, তাপপ্রবাহ চলাকালে দেশটিতে ২ হাজার ২৫ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে; বিশেষ করে ৪৫ বছরের বেশি বয়সীদের মধ্যে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দেশটির জনস্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে বাড়িতে মৃত্যুর সংখ্যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ৯১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া নার্সিং হোম ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মৃত্যুর হার বেড়েছে। যাদের মৃত্যু হয়েছে, তারা সবাই কোনো না কোনো শারীরিক অসুস্থতা বা জটিলতায় ভুগছিলেন। স্টেফানি রিস্ট আরও বলেন ‘আমাদের ধারণা, সরকারিভাবে আমাদের হাতে যে সংখ্যা আছে, মৃতের প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে বেশি’। ফ্রান্সের জনস্বাস্থ্য কর্র্তৃপক্ষ সতর্ক করে বলেছে, অতিরিক্ত গরমজনিত কারণে মৃত্যুর বর্তমানে প্রকাশিত পরিসংখ্যানটি প্রাথমিক। পরবর্তী বিশ্লেষণে মৃত্যুর প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২০ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত স্থায়ী হওয়া এই তাপপ্রবাহ ইউরোপের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ। এ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়, বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম তাপপ্রবাহের পেছনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
বেলজিয়ামের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৮ থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত তাপপ্রবাহে দেশটিতে প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৫ বছর বা তার বেশি বয়সী ৫৩০ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া ৬৫ বছরের কম বয়সী ১৮০ জনের মৃত্যুও তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একে দেশের ইতিহাসে তাপপ্রবাহজনিত নজিরবিহীন মৃত্যুর ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছে। নেদারল্যান্ডসের কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তীব্র গরমে দেশটিতে প্রায় ৪৮০ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের অধিকাংশের বয়স ছিল ৮০ বছরের বেশি। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ইউরোপে ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। তাই জনস্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও অবকাঠামোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আরও প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ব্যাহত : যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের বড় অংশজুড়ে বয়ে যাওয়া ‘বিপজ্জনক’ তাপপ্রবাহের কারণে দেশটির স্বাধীনতা দিবসের উদযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, গত শুক্রবার দেশটিতে ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের অংশ হিসেবে দেশজুড়ে কয়েক ডজন প্যারেড, কনসার্ট এবং আতশবাজি প্রদর্শনী বাতিল বা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ওয়াশিংটনের ন্যাশনাল মলে আয়োজিত ‘দ্য গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’ও তীব্র গরমের কারণে বিঘিœত হয়েছে। গত শুক্রবার বিকালে ১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস) তাপমাত্রার কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আয়োজনটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
অবশ্য আয়োজকরা জানিয়েছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কুলিং টেন্ট (শীতলীকরণ তাঁবু) এবং পানি ছিটানোর বিশেষ মিস্ট স্টেশন বসানোর মতো কিছু বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে তা ফের চালু করা হবে। ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রা মধ্য-পশ্চিমাঞ্চল থেকে পূর্বাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে শুক্রবার ১৮৫ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ তাপ সতর্কতার (হিট অ্যালার্ট) আওতায় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অংশে সর্বোচ্চ ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত তাপমাত্রা চড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আবহাওয়াবিদ এবং সরকারি কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে, এই তাপপ্রবাহ প্রাণঘাতী হতে পারে। কাজের প্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া প্রত্যেক মানুষকে প্রচুর পানি পান করার, ছায়ায় থাকার এবং বিভিন্ন জনসমাগম ও গণঅনুষ্ঠানে গরমজনিত অসুস্থতার লক্ষণগুলোর দিকে কড়া নজর রাখার আহ্বান জানিয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তীব্র গরমের কারণে অন্তত সাতটি রাজ্যে বড় বড় অনুষ্ঠান বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মেরিল্যান্ডের টাকোমা পার্ক, ফিলাডেলফিয়ায় স্বাধীনতা দিবসের প্যারেড এবং ভার্জিনিয়ার লাউডন কাউন্টির বিভিন্ন মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান রয়েছে।