চুলে রঙ করা কি ভালো

ডা. জাহেদ পারভেজ

সহকারী অধ্যাপক, ত্বক চর্ম যৌন ও ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জারি বিভাগ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, ঢাকা

কারও চুল সাদা হলে কারও আবার ফ্যাশন ট্রেন্ডের সঙ্গে মানিয়ে চলতে চুল কালার করেন।  চুল রঙ করলে একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর রঙ করার প্রয়োজন হয়। অথচ এই হেয়ার কালারে অনেকটিতেই এমন কিছু রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, যা চুলের পাশাপাশি শরীরে নানা রকম ক্ষতি করে।

হেয়ার কালারের ক্ষতি       

আমেরিকার মেডিকেল জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষা থেকে জানা গিয়েছে, হেয়ার স্টাইলিংয়ের জন্য ব্যবহৃত প্রোডাক্টগুলোর মধ্যে যে রাসায়নিকগুলো ব্যবহার করা হয়, তাতে ক্যানসারের মতো রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। হেয়ার কালারের মধ্যে ডায়ামিনোসেল সালফেট এবং প্যারা-ফেনিল্যান্ডামাইনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। এই রাসায়নিকের ফলে মানুষের ডিএনএ সেল নষ্ট করে দিয়ে ক্যানসারের মতো কোষ উৎপন্ন করতে সাহায্য করে। এই রাসায়নিকগুলো হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে দিতেও সক্ষম।

চুলের রঙের কারণে হাঁপানির মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে বা বাড়তে পারে। যারা নিয়মিত চুল রঙ করেন, তাদের ত্বকে অ্যালার্জি সমস্যা দেখা দেয়। হেয়ার কালারে থাকে ক্ষতিকর রাসায়নিক পিপিডি, যা ত্বকের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

অনেকের ত্বক সেনসিটিভ। হেয়ার কালারে রাসায়নিক স্ক্যাল্পে র‌্যাশ, ত্বকে জ¦ালা, ফুলে যাওয়া ও খুশকির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। এ ছাড়াও অ্যালার্জি যদি মারাত্মক পর্যায়ে চলে যায় তাহলে এর প্রভাব চোখে পরে। চুলের পাশাপাশি ত্বকের জন্যও ক্ষতিকর। চুলের ক্রিটিক্যালস সহজেই নষ্ট করতে পারে। চুল রুক্ষ হয়ে ঝরে পরারও একটা কারণ হয় চুলে রঙ করলে। এর কারণ এই  রঙে থাকা অ্যামোনিয়া।

চুলে বারবার রঙ করলে স্কাল্পের স্বাভাবিক লিপিড লেয়ার নষ্ট হয়ে যায়। চুলের গোড়া থেকে ময়েশ্চার বেরিয়ে যায়, ফলে চুল একেবারে রুক্ষ্ম হয়ে ওঠে। আর তারপরই চুল পড়তে শুরু করে। রঙে থাকা পিপিডি, লেডের মতো ক্ষতিকারক উপাদানগুলো চুলের গোড়ায় জমা হতে থাকে। এখান থেকে তা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং সেখান থেকে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। রঙে থাকা বিভিন্ন উপাদান থেকে শরীরে অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। তা থেকে শ^াসকষ্ট, হাঁপানি, অ্যাজমার মতো অসুখ হওয়ার প্রভূত সম্ভাবনা তৈরি হয়। গর্ভবতীদের গর্ভপাত পর্যন্ত হতে পারে।

কোন রঙে কী ক্ষতি

হেয়ার কালার মূলত চুলের তিন ধরনের ক্ষতি করে। বিশেষ করে

 অস্থায়ী রঙ

এ ধরনের রঙগুলো অত্যন্ত ক্ষণস্থায়ী হয়। চুলের এই রঙ একবার শ্যাম্পু করলেই উঠে যায়। খুব একটা ক্ষতি করতে পারে না। কারণ তা চুলের গোড়ায় প্রবেশ করে না। কেবলমাত্র ওপর দিয়ে সাময়িক চুলের রঙটা বদলে দেয়। তবে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহার করলে এ ধরনের অস্থায়ী রঙ থেকেও ক্ষতি হতে পারে।

 আধা স্থায়ী রঙ

চুলের এ ধরনের রঙ থেকে দীর্ঘস্থায়ী ভিত্তিতে ক্ষতি হয়। এই রঙ ৮-১২ বার শ্যাম্পু করলে চুল থেকে ওঠে। এগুলো মোটেও ভালো নয়। দু-একবার মাথায় দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু বেশিবার করলে চুল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

 স্থায়ী রঙ

স্থায়ীভাবে চুলের ক্ষতি করে দেয়। দীর্ঘদিন এই রঙ ব্যবহার করলে এর মধ্যে থাকা অ্যামোনিয়া, হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড, পিপিডি, লেডের মতো ভয়ংকর ক্ষতিকারক উপাদানগুলো চুলের গোড়ায় জমা হতে থাকে। সেখান থেকেই অ্যালার্জি, এমনকি ত্বকের ক্যানসার পর্যন্ত হতে হয়। রঙ চুলে দেড় থেকে দু’মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

এ ছাড়াও উপাদানের দিক থেকে চুলের রঙ বা হেয়ার ডাইকে আরও তিন ভাগে ভাগ করা যেতে পারে।

 মেহেদি

হেনা জাতীয় জিনিস এই শ্রেণির মধ্যে পড়ে। অনেকের ধারণা, এগুলো চুলের ক্ষতি করে না। কিন্তু এই ধারণার কোনো বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তি নেই বলে জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। বরং, নিয়মিত হেনা ব্যবহার করলে সেটাও একইভাবে চুলকে নষ্ট করে দিতে পারে।

 কেমিক্যাল রঙ

এ ধরনের চুলের রঙ দীর্ঘকালীন ব্যবহার করলে চুল এবং বাকি স্বাস্থ্যের ভয়াবহ ক্ষতি হতে পারে। বাজারে এ ধরনের হেয়ার ডাইয়ের দাম কিছুটা বেশি।

 সিন্থেটিক রঙ

সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যে চুলের রঙ, কলপ বা হেয়ার ডাইগুলো দেখা যায় সেগুলো মূলত এই শ্রেণির হয়ে থাকে। এগুলো ভয়াবহভাবে চুল এবং বাকি স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

চুলে রঙ করা যাবে না

চুলে রঙ না করারই পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। এর চেয়ে বরং চুলে খাঁটি নারকোল তেল, শ্যাম্পু, কন্ডিশনারের মতো জিনিস ব্যবহার করা ভালো। তারপরও অনেকের চুলের রঙ করতে ইচ্ছে হয় বিশেষ করে যাদের চুল পেকে যাচ্ছে বা সাদা হয়ে যাচ্ছে, তাদের এই ইচ্ছে হওয়াটা খুব স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে কয়েকটি জিনিস মাথায় রেখে চুলের রঙ করলে সমস্যা কম হবে।

 ৬%-এর কম পিপিডি আছে এমন হেয়ার কালার ব্যবহার করুন। তাহলে চুলের কম ক্ষতি হবে।

  চুলে কলপ বা হেয়ার ডাই করার আগে ভালো করে কন্ডিশনার লাগিয়ে নিন। সেই সঙ্গে ভিটামিন-সি ক্যাপসুল খান।

 ভুলেও দীর্ঘ সময় রঙ ধরে রাখবে এমন স্থায়ী হেয়ার কালার লাগাবেন না। একবার শ্যাম্পু করলেই উঠে যাবে, এমন রঙের দিকে নজর দেওয়া ভালো।

 অ্যালার্জি থাকলে চুলে রঙ করার আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

 কালার চুলের জন্য শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার পাওয়া যায় সেগুলো ব্যবহার করুন। তাহলে চুলের ক্ষতি কিছুটা কম হবে।