রোনালদোর অভিজ্ঞতা নাকি ইয়ামালের গতি

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যখন তার ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ খেলছেন, লামিন ইয়ামাল তখনো পৃথিবীর আলো দেখেননি। সময়ের চাকা ঘুরে সেই নবজাতক আজ ১৮ বছরের এক টগবগে তরুণ, যিনি ফুটবল বিশ্বকে নিজের ড্রিবলিং জাদুতে বিমোহিত করছেন। আর অন্য প্রান্তে ৪১ বছরেও ক্ষীপ্র, ক্ষুধার্ত এক চিরসবুজ মহানায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো।

সোমবার (আজ) ডালাসের মাঠে যখন ইবেরিয়ান ক্লাসিকো অর্থাৎ স্পেন ও পর্তুগাল শেষ ১৬-র মহারণ মুখোমুখি হবে, তখন ফুটবলবিশ্ব দেখবে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। একদিকে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলারের দীর্ঘায়ুর মহাকাব্য, অন্যদিকে ফুটবলের নতুন রাজপুত্রের বিস্ময়কর উত্থান। চলতি বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে শেষ ১৬ নিশ্চিত করার পর তরুণ ইয়ামালকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল রোনালদোর মুখোমুখি হওয়া নিয়ে। বিন্দুমাত্র রোমাঞ্চ না লুকিয়ে এই স্প্যানিশ উইঙ্গার বলেন, ‘শেষ ১৬-তে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মুখোমুখি হওয়া? প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া নাকি পর্তুগাল, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। তবে প্রতিপক্ষ যদি তিনি হন, তবে সেটি হবে এক বিরাট সম্মান। আমাদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ম্যাচটা জেতা।’ বয়সের ব্যাপক ব্যবধানের কারণে বিশ্ব ফুটবলের এই দুই প্রজন্মের তারকার মাঠে দেখা হয়েছে মাত্র একবার। আর সেই স্মৃতি ইয়ামালের জন্য মোটেও সুখকর ছিল না। আজ থেকে প্রায় এক বছর আগে, ২০২৫ সালের ৮ জুন। উয়েফা নেশনস লিগের ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন ও পর্তুগাল। নির্ধারিত সময়ে স্পেন দুবার এগিয়ে গেলেও রোনালদোর একক লড়াইয়ে পর্তুগাল ২-২ সমতায় ফেরে। অতিরিক্ত সময়ে ইয়ামাল মাঠ ছাড়ার পর টাইব্রেকারে ৫-৩ ব্যবধানে শিরোপা জিতে নেয় পর্তুগাল। ম্যাচ শেষে সিআরসেভেন বরাবরের মতোই উদযাপন করেছিলেন ‘নাম্বার ওয়ান’ ভঙ্গিমায়। এবার ডালাসের মঞ্চে ইয়ামালের সামনে সেই হারের প্রতিশোধ নেওয়ার মোক্ষম সুযোগ। পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো যেখানে গোল আর দীর্ঘায়ুর প্রতিশব্দ, ইয়ামাল সেখানে অপরিণত বয়সের পরিপক্বতা আর চোখ ধাঁধানো ড্রিবলিংয়ের বিজ্ঞাপন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (৪১ বছর) : ইতিহাসের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন তিনি। এই ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে তার মোট বিশ্বকাপ গোলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১-তে, যা ২০০৬ সাল থেকে শুরু হওয়া এক অবিস্মরণীয় যাত্রার ফসল। লামিন ইয়ামাল (১৮ বছর) : অন্যদিকে ইয়ামাল চলতি বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে সৌদি আরবের বিপক্ষে নিজের প্রথম বিশ্বকাপ গোল পান। তবে গোল ছাপিয়ে তার ড্রিবলিং দক্ষতা পরিসংখ্যানবিদদেরও তাক লাগিয়ে দিয়েছে। প্রখ্যাত পরিসংখ্যান সংস্থা ‘অপটা’র মতে, প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ১২টি সফল ড্রিবলিং করছেন ইয়ামাল। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার জে-জে ওকোচার পর আর কোনো ফুটবলার বিশ্বকাপে এমন ড্রিবলিংয়ের প্রদর্শনী দেখাতে পারেননি। শুধু তা-ই নয়, ১৮ বছর ৩৫৪ দিন বয়সে বড় টুর্নামেন্টে (বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে) ১০টি ম্যাচ জেতার রেকর্ড গড়েছেন ইয়ামাল। তিনি ভেঙে দিয়েছেন ফরাসি তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পের রেকর্ড, যিনি ২৩ বছর ৩৫৫ দিন বয়সে এই কীর্তি গড়েছিলেন। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো কিংবদন্তিদের সাথে ইয়ামালের তুলনা করা হচ্ছে। তবে বয়স কম হলেও এই স্প্যানিশ তরুণ নিজের মানসিকতায় প্রচণ্ড পরিপক্ব। ২০২৪ সালের ইউরো কাপে খেলার আগে মাত্র ১৬ বছর বয়সেই ইয়ামাল বলেছিলেন, দিনের শেষে, আমার মনে হয় কারও সাথে নিজের তুলনা না করাই শ্রেয়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো খেলোয়াড়রা যা অর্জন করেছেন, তা সম্ভব হয়েছে কারণ তারা অন্য কারও মতো হতে চাননি, নিজেদের মতো হতে চেয়েছেন। আমি কেবল আমার নিজের পথটা তৈরি করতে চাই।’ ২০২৫ সালে নেশনস লিগ জেতার পর পর্তুগিজ কোচও ইয়ামালকে আগলে রাখার অনুরোধ করেছিলেন বিশ্ববাসীর কাছে, ‘সে মাত্র ১৭ বছরের একটা ছেলে, ওর এখনো অনেক উন্নতি করার বাকি আছে। ও একটা বিস্ময় বালক, কিন্তু ওকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত। কিন্তু ফুটবল দেবতা যেন শান্তি চান না, চান রোমাঞ্চ। আর তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের শুরুতেই মঞ্চ প্রস্তুত দুই ভিন্ন মেরুর, দুই ভিন্ন প্রজন্মের রাজপুত্রের লড়াইয়ের।