হিউস্টনের গ্যালারিতে তখন লাল সমুদ্রের ঢেউ। মাঠের সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে এক তরুণ, কিছুক্ষণ আগে যার পায়ের জাদুতে ঘরের মাঠের সমর্থকদের সামনে কানাডার স্বপ্ন চুরমার হয়ে গেছে। ৩-০ গোলের ব্যবধানে মরক্কো তখন বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করেছে। এই জয়ের নায়ক আজেদ্দিন উনাহি, যিনি একাই জোড়া গোল করেন।
তার গল্পের শুরুটা মোটেও এমন ঝলমলে ছিল না। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে স্পেনের মুখোমুখি হয় মরক্কো। ম্যাচ শেষে হারের ধাক্কায় বিহ্বল স্পেনের কোচ লুইস এনরিকে বিস্ময় চেপে রাখতে পারেননি, ‘কে এই ৮ নম্বর জার্সিধারী ছেলেটি, যে এমন খেলে গেল!’ সেই প্রশ্নটাই তখন গোটা ইউরোপের ফুটবল মহলে ঘুরপাক খায়। ক্লাব স্কাউটদের নোটবুকে জ্বলজ্বল করতে থাকে উনাহির নাম। বিশ্বকাপের আরেকটি আসরে একই নাম আবার আলোচনার কেন্দ্রে। তবে পার্থক্য একটাই, এবার তিনি শুধু বিস্ময় নন, নির্ভরতার প্রতীকও।
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে যখন সবাই তার জোড়া গোলের প্রশংসায় ব্যস্ত, তখন উনাহি নিজের কৃতিত্ব নিয়ে একটি বাক্যও খরচ করলেন না। বরং তার কণ্ঠে ফুটে উঠল দলের প্রতি নিখাদ ভালোবাসা, ‘আমি সবাইকে নিয়ে গর্বিত, পুরো দলকে নিয়ে গর্বিত। আমরা একটি দল, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ এবং আমাদের সবার লক্ষ্য এক। আজ আমি এখানে কথা বলছি কারণ আমি গোল করেছি। কিন্তু যদি অন্য কোনো সতীর্থ গোল করত, তাহলেও পরিস্থিতি বদলাত না। আমরা সবাই সমানভাবে আনন্দিত হতাম। আমি সত্যিই এই প্রজন্ম এবং এই দলকে নিয়ে গর্বিত।’
অথচ ম্যাচের প্রথমার্ধটা মোটেও সহজ ছিল না মরক্কোর জন্য। কানাডা তখন পাল্টা আক্রমণে চাপে রেখেছিল আফ্রিকার সিংহদের। কিন্তু বিরতির পর ঘুরে দাঁড়ায় মরক্কো, একের পর এক গোলে ভেঙে দেয় প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ। সেই লড়াইয়ের রহস্য জানাতে গিয়ে উনাহি বলেন, ‘আমরা অনেক সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, মাঠের বাইরেও নানা চ্যালেঞ্জ ছিল। আমাদের পথে বাধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু আমরা মনোযোগ ধরে রেখেছিলাম। বিরতির সময় আমরা কয়েকটি বিষয় ঠিক করার চেষ্টা করেছি এবং সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সেগুলো সমাধান করতে পেরেছি। আমাদের দলে এমন খেলোয়াড় আছে, যারা কী করতে হবে তা জানে। সবাই মাঠে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছে। সবাই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করেছে।’
এই লড়াইয়ের সামনের সারির যোদ্ধা উনাহি। কিন্তু তাকে বিশ্বমঞ্চের আলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয়েছে এক দীর্ঘ পথ। ২০০০ সালে কাসাব্লাঙ্কার এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নেওয়া ছেলেটির শৈশব কেটেছে ধুলোমাখা রাস্তায় বন্ধুদের সঙ্গে বল নিয়ে ছোটাছুটি করে। এরপর একটি যুব একাডেমিতে ভর্তি হন তিনি। কিন্তু একাডেমির প্রতিভা মানেই পেশাদার মঞ্চে সাফল্যের নিশ্চয়তা ছাড়পত্র নয়। নিজেকে প্রমাণ করতে ২০১৮ সালে ফ্রান্সে পাড়ি জমান, স্ট্রাসবুর্গের রিজার্ভ দলে যোগ দেন তিনি। কিন্তু সিনিয়র দলে কোথাও সুযোগ পাচ্ছিলেন না। ভেঙে পড়ার বদলে তিনি বেছে নেন একটি কঠিন পথ। ফ্রান্সের তৃতীয় বিভাগের ক্লাব আভরঁশে নাম লেখান। সেখান পরিশ্রমের ফল পান, ২০২১ সালে ফরাসি লিগ ওয়ানদের ক্লাব আঁজেতে সুযোগ পান উনাহি। মাঝমাঠে তার দক্ষতা নজর কাড়ে সবার, মরক্কো জাতীয় দলের দরজাও খুলে যায়।
কানাডার বিপক্ষে জোড়া গোল করে শুধু ম্যাচের ভাগ্যই গড়ে দেননি ত্যাগ, অপেক্ষা এবং অবিচল বিশ্বাসের প্রতিদানও পেয়েছেন। এখন আজেদ্দিন উনাহি মরক্কোর কোটি মানুষের স্বপ্ন সারথি।