প্রকৃত জনগণের চাহিদা ও স্থানীয় জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করে পানি নিষ্কাশন সংকটে থাকা এলাকাগুলোকে অগ্রাধিকার না দিয়ে এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয়ের নীতি অনুসরণ না করেই নাটোরের বাগাতিপাড়া পৌরসভার একটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, পৌরসভার সবচেয়ে পুরোনো মালঞ্চি বাজারে বাজার কমিটি, ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো ধরনের পরামর্শ ছাড়াই এমন একটি ড্রেন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, যা জনস্বার্থের চেয়ে সরকারি অর্থ ব্যয়ের প্রবণতাকেই বেশি প্রতিফলিত করছে। এতে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন সমস্যার কার্যকর সমাধান না হয়ে বরং জনকল্যাণের নামে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, প্রকৃত প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি অর্থের অপচয় করা হচ্ছে, যার সুফল সাধারণ মানুষ পাবে না।
স্থানীয়দের দাবি, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রকৃত চাহিদা, জনমত এবং সরকারি অর্থের সর্বোচ্চ সাশ্রয় নিশ্চিত করা জরুরি। তাদের মতে, যে সমস্যার সমাধান অল্প ব্যয়ে সম্ভব, সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের আগে প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা ও জনস্বার্থ পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় এখনো পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই, সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা গ্রহণ করলে সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং সাধারণ মানুষও প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে।
বাগাতিপাড়া পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, এডিপি প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার উন্নয়ন প্রকল্পে একটি ড্রেন নিমার্ণে চুক্তিমূল্য ধরা হয়েছে ২৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।আর এই ড্রেন নিমার্ণ প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে চাপা ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে বাজারের একটি পুরোনো ড্রেন ময়লা-আবর্জনায় ভরাট হয়ে পানি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সামান্য সংস্কার করলেই ড্রেনটি আবারও কার্যকর করা সম্ভব। কিন্তু সেই উদ্যোগ না নিয়ে নতুন আলাদা স্থানে নতুন ড্রেন নির্মাণে বিপুল অর্থ ব্যয়ের সিদ্ধান্তকে তারা অপ্রয়োজনীয় ও জনস্বার্থবিরোধী বলে মনে করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, নতুন ড্রেন নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে, তার এক-তৃতীয়াংশ ব্যয়েই পুরোনো ড্রেনটি সচল করা সম্ভব ছিল। বাকি অর্থ দিয়ে একই মহল্লার যেসব এলাকায় এখনো পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেই, সেখানে ড্রেন নির্মাণ করলে অধিক সংখ্যক মানুষ উপকৃত হতেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে মহল্লার বিভিন্ন অংশে জলাবদ্ধতা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়ালেও সেসব এলাকাকে অগ্রাধিকার না দিয়ে বাজারে নতুন ড্রেন নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এতে উন্নয়ন পরিকল্পনার অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং প্রকল্পের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আরও অভিযোগ, প্রকল্পটি গ্রহণের আগে বাজার কমিটি, দোকান মালিক কিংবা স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কোনো ধরনের মতবিনিময় বা গণশুনানি করা হয়নি। যাদের ওপর প্রকল্পটির সরাসরি প্রভাব পড়বে, তাদের মতামত না নিয়েই পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। ফলে প্রকল্পটি প্রকৃত জনচাহিদার প্রতিফলন, নাকি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
স্থানীয়দের দাবি, যেখানে আগে থেকেই থাকা ড্রেন অল্প খরচে সংস্কার করে সচল করা সম্ভব, সেখানে প্রায় সাড়ে ২২ লাখ টাকা ব্যয়ে বাজারের মাঝখান দিয়ে নতুন ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত পৌরসভার খাম খেয়ালিপনার পরিচয় বহন করে। এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয়ী ব্যবহার, প্রকল্পের যৌক্তিকতা এবং জনমতকে উপেক্ষা করার অভিযোগ সামনে এসেছে।
স্থানীয় সমাজসেবী সংগঠক ও মালঞ্চি বাজারে বিশিষ্ট ব্যবসায়ী হাসান জাহিদ বাবু সরকার (৫৫) বলেন, মালঞ্চি বাজারে আমরা দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা করে আসছি। অথচ নতুন ড্রেন নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বাজারের ব্যবসায়ী বা সংশ্লিষ্ট কারও সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা করা হয়নি। এটি মোটেই যৌক্তিক নয়। নতুন ড্রেন নির্মাণে যে সরকারি অর্থ ব্যয় করা হবে, তার তিন ভাগের এক ভাগ অর্থ ব্যয় করলেই পুরোনো ড্রেনটি সংস্কার করে সচল করা সম্ভব ছিল। এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয় হতো এবং অবশিষ্ট অর্থ বাজার বা এলাকার অন্যান্য জরুরি উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা যেত। আগের যিনি নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকের দায়িত্বে ছিলেন তিনি আমাদের সঙ্গে পরামর্শ করে পূর্বের ড্রেনটি সংস্কারের বিষয়ে একমত হয়েছিলেন। তিনি যাওয়ার পর কোথায় থেকে কি ভাবে যে এ প্রকল্প হল তা নিয়ে আমরা সন্ধিহীন।
মালঞ্চি বাজারের আরেক ব্যবসায়ী আবুল হাসনাত মিঠু বলেন, আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নিচ দিয়ে একটি পুরোনো ড্রেন রয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে সেটি এখন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। অথচ ওই ড্রেনটি সংস্কার করলেই পানি নিষ্কাশন স্বাভাবিক করা সম্ভব। বাজারে পানি চলাচলের জন্য আগে থেকেই কয়েকটি কালভার্ট রয়েছে। কিন্তু নতুন ড্রেন নির্মাণ করতে গেলে আরও দুটি নতুন কালভার্ট নির্মাণ করতে হবে, যা অতিরিক্ত সরকারি অর্থ ব্যয়ের কারণ হবে। অন্যদিকে পুরোনো ড্রেন সংস্কার করলে নতুন করে কালভার্ট বা সেতু নির্মাণেরও প্রয়োজন হবে না। তাই অযৌক্তিকভাবে নতুন ড্রেন নির্মাণের কোনো প্রয়োজন বাজারে নেই।
সোনাপাতি মহল্লাার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমাদের মহল্লায় দীর্ঘদিন ধরে ড্রেন না থাকায় বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সেদিকে গুরুত্ব না দিয়ে যে পুরোনো ড্রেনটি সামান্য সংস্কার করলেই সচল করা সম্ভব, সেটি সংস্কার না করে নতুন ড্রেন নির্মাণের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। আগের ড্রেনটি সংস্কার করে অবশিষ্ট অর্থ কোথায় ব্যয় করা হবে, সে বিষয়ে এলাকার মানুষের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। সরকারি অর্থ মানেই অপচয় করা নয়, জনস্বার্থ ও প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনায় রেখেই তা ব্যয় করা উচিত।
মালঞ্চি বাজার কমিটির সভাপতি হাবিবুর রহমান হবি বলেন, পৌরসভা বাজারের উন্নয়নে কাজ করবে, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে বাজার কমিটির সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা বা মতামত না নিয়েই এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা যারা প্রতিদিন এই বাজারের বাস্তব সমস্যা দেখছি, তাদের মতামত নেওয়া হলে প্রকৃত চাহিদার বিষয়গুলো আরও ভালোভাবে উঠে আসত। আমার মতে, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নতুন ড্রেন নির্মাণের এই সিদ্ধান্ত জনস্বার্থের তুলনায় সরকারি অর্থের অপচয়ই বেশি। উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রকৃত প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগাতিপাড়া পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলী এ. এস. এম. শহিদুল ইসলাম বলেন, এ বিষয়ে আমি ব্যাখ্যা দিতে পারব না। আমর পৌর সভার বডি আছে তারা যে সিদ্ধান্ত দিবে তার বাইরে আমি নই। তারা যেভাবে বলছে সেই ভাবেই কাজ হচ্ছে।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসক দেবাশীষ বসাক বলেন, তিনি আসার ইতিপূর্বেই এ প্রজেক্ট পাস হয়েছে। আর পুরো বাজারে যে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বাজারের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আর এটি বাজারের অধিকাংশ জায়গার উপর দিয়ে যাওয়ায় বাজারের জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।