যেখানে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ, মা ও শিশুস্বাস্থ্য এবং জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা, সেই ভবনের নিচেই গড়ে উঠেছে মশার প্রজনন কেন্দ্র। সামান্য বৃষ্টিপাত হলেই পানি জমে থাকে, আর বর্ষাজুড়েই সেই পানি স্থায়ী জলাবদ্ধতায় পরিণত হয়।
নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবনের নিচের অংশে বছরের পর বছর ধরে এমন চিত্র দেখা গেলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এতে প্রতিনিয়ত মশার বংশবিস্তার ঘটছে এবং স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগী, তাদের স্বজন ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একই সঙ্গে উপজেলা পরিষদ চত্বরে অবস্থিত আবাসিক এলাকায় বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যেও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তাই ওই ভবনের নিচের অংশ মাটি দিয়ে ভরাট করে স্থানটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার দাবি স্থানীয়দের।
সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবনের নিচের অংশে বর্ষার পানি জমে রয়েছে। জমে থাকা পানিতে অসংখ্য মশার লার্ভা ও ডিম ভাসতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, সেখান থেকেই প্রতিনিয়ত নতুন মশার জন্ম হচ্ছে। ভবনের নিচে জমে থাকা পানির সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের আবর্জনা মিশে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, যা পুরো পরিবেশকে আরও অস্বাস্থ্যকর করে তুলেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভবনের পেছনে থাকা একটি টিউবওয়েলের অতিরিক্ত পানি নিয়মিত ভবনের নিচে গিয়ে জমা হয়। এছাড়া অনেকেই ওই টিউবওয়েলের পাশে থালাবাসন ধোয়ার ফলে ময়লাযুক্ত পানিও সেখানে ফেলেন। একই সঙ্গে খাবারের উচ্ছিষ্ট, ফলের খোসা, পলিথিন, বিভিন্ন প্যাকেট এবং অনেক সময় রোগীদের ব্যবহৃত নোংরা সামগ্রীও সেখানে ফেলে রাখা হয়। ফলে পানি ও বর্জ্য মিলে স্থানটি মশার বংশবিস্তারের জন্য আদর্শ পরিবেশে পরিণত হয়েছে।
জানা যায়, ২০২২ সালের ২৭ জানুয়ারি নতুন উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় ভবনটির উদ্বোধন করা হয়।উদ্বোধনের পর থেকেই প্রায় চার বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে ভবনের নিচে বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর সারা বছরই সেখানে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা জমে ছোটখাটো ভাগাড়ে পরিণত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এমন পরিস্থিতি চললেও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। বছর খানেক আগে ভবনের পেছনে একটি টিউবওয়েল স্থাপন করায় সেখানকার ব্যবহৃত ও নোংরা পানিও ভবনের নিচে গিয়ে জমতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, সামান্য বৃষ্টি হলেই ভবনের নিচে পানি জমে যায় এবং বর্ষা মৌসুমজুড়ে তা আর সরে না। প্রতি বছর একই সমস্যার সৃষ্টি হলেও স্থায়ী পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। মাঝে মাঝে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হলেও সমস্যার মূল কারণ দূর না হওয়ায় পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর পাশ্ববর্তী ঘোরলাজ মহল্লার বাসিন্দা আল মামুন (৪২) বলেন, যে অফিস থেকে মানুষকে পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয়, সেই অফিসের নিচেই যদি মশার প্রজনন কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। পরিবার পরিকল্পনা ভবনের সামনে চায়ের দোকানদার রুবেল আলী বলেন, এই জায়গাটিতে অনেক বছর ধরেই সামান্য বর্ষাতেই পানি জমে। এছাড়াও রোগীর লোকজন ওই ভবনের নিচু স্থানে ময়লা, আবর্জনা ফেলেন। পানি জমে থাকা নোংরা জায়গাতে এমনিতেই মশা বংশ বিস্তার করে। এ সকল স্থান হতেই ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।
উপজেলার মাড়িয়া এলাকা থেকে ভর্তি রোগী সামসুল ইসলাম (৫৫) বলেন, গতকাল এসে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছি। এখানে মশার উপদ্রব অনেক বেশি। আর অনেক বড় বড় মশা এখানে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে মশার উপদ্রবে ভুগতে হচ্ছে। রোগীদের স্বার্থে দ্রুত পানি অপসারণ ও মশা নিধনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
উপজেলার যুগিপাড়া এলাকার এক রোগীর স্বজন তৌফিকুর রহমান (২৮) বলেন, দিনের বেলাতেও এখানে প্রচুর মশার দেখা যায়। স্বাস্থ্যসেবা নিতে এসে যদি রোগে আক্রান্ত হওয়ায় আশঙ্কা থাকে, তাহলে সেটি খুবই উদ্বেগজনক।হাসপাতাল এলাকার মধ্যে ওই স্থানটিই সবচেয়ে নোংরা এবং পরিবার পরিকল্পনা ভবনের ওই স্থানেই দেখি সবসময় পানি জমে থাকে। দ্রুত জমে থাকা পানি অপসারণ এবং স্থায়ীভাবে ঝলবদ্ধতার সমাধানে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
উপজেলা পরিষদ চত্বরের আবাসিক এলাকার এক বাসিন্দা ওয়াসীম আলী (৩৭) বলেন, পরিবার নিয়ে এখানেই বসবাস করি। ভবনের নিচে দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকায় আশপাশে মশার উপদ্রব অনেক বেড়েছে। সন্ধ্যার পর ঘরের বাইরে থাকা যায় না। শিশু ও বয়স্কদের নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত স্থায়ীভাবে পানি নিষ্কাশন ও মশা নিধনের ব্যবস্থা নিলে সবাই উপকৃত হবে।
উল্লেখ্য, গত ৬ জুন একই ভবনের সামনেই ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতামূলক র্যালি অনুষ্ঠিত হয়। কর্মসূচিতে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে সবাইকে সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়। অথচ সেই ভবনের নিচেই দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে মশার বংশবিস্তার চলতে থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে যেখানে সচেতনতার বার্তা দেওয়া হয়, সেখানে নিজেদের দপ্তরের এমন অবস্থা।
এ বিষয়ে ঘটনার সত্যাতা শিকার করে উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শরীফ মোহাম্মদ জামিউর রহমান বলেন, তিনি প্রায় ২ বছর আগে এখানে যোগদান করেছেন।তবে তার যোগদানের আগ থেকেই ভবনটির নিচতলায় পানি ও ময়লা আবর্জনা জমে থাকছে। তিনি নিজ উদ্যোগে কয়েক বার পরিষ্কার করেছেন বলে জানান। আর বিষয়টি তিনি বেশ কয়েক বার উপজেলা পরষিদের মিটিং এ জানিয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তিনি আরও বলেন, এবার বিষয়টি লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে। পাশাপাশি ভবনের নিচের অংশ ভরাটের জন্য দাপ্তরিকভাবে চাহিদাপত্র (ডিমাণ্ড) পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়াও যেন কেউ সেখানে ময়লা-আবর্জনা না ফেলে, সে জন্য একটি সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হবে বলে তিনি জানান।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজুয়ানুল হক বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা নিয়মিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছি। আর ভবনের নিচে পানি অপসারণের বিষয়টি নিয়ে আগেও একাধিকবার উপজেলা পরিষদকে জানানো হয়েছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ায় জন্য। কিন্তু কোনো কাজে আসেনি। আবারও লিখিত আকারে জানানো হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেবাশীষ বসাক বলেন, আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পারলাম। এটি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তারা লিখিত আকারে জানালে, পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শ্রীপুরে ট্রাকচাপায় মোটরসাইকেল আরোহী দুই বন্ধু নিহত