অন্ধ আনুগত্য মুমিনের কাজ নয়

অন্ধভাবে নেতৃস্থানীয় লোকদের অনুসরণ করার প্রচলন রয়েছে। পরকালে এই অন্ধ অনুসরণই হবে সবচেয়ে বড় আক্ষেপের কারণ। তখন কোনো নেতাই তার অনুসারীর দায়ভার নেবে না। সবাই নিজেকে বাঁচাতে ব্যস্ত থাকবে। অনুসারীরা তখন বুঝতে পারবে, তারা কত বড় ধোঁকার মধ্যে ছিল। কিন্তু তখন আর ভুল শুধরে নেওয়ার কোনো পথই অবশিষ্ট থাকবে না।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তারা বলবে, হে আমাদের পালনকর্তা! আমরা আমাদের নেতা এবং আমাদের প্রধানদের মান্য করতাম। তারাই আমাদের গুমরাহ করেছিল। হে আমাদের পালনকর্তা! তাদের দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং তাদের মহাঅভিশাপ দিন। (সুরা আহজাব ৬৭-৬৮)

মুফাসসিররা উল্লেখ করেছেন, জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হওয়ার সময় এই অনুসারীরা বুঝতে পারবে, দুনিয়ায় যাদের তারা অন্ধভাবে মেনে চলেছিল, তারাই মূলত তাদের চিরস্থায়ী ধ্বংসের মূল কারণ। তখন তারা তীব্র ক্ষোভ, গ্লানি ও আক্ষেপ নিয়ে মহান আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করবে। তারা অনুধাবন করবে, সত্য দ্বীন প্রত্যাখ্যান করার পেছনে তাদের নেতাদের প্ররোচনা ও চাপই প্রধান ভূমিকা পালন করেছিল।

ইসলামে নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের একটি সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট সীমারেখা রয়েছে। নেতার আদেশ যদি মহান আল্লাহর কোরআন এবং নবীজি (সা.)-এর সুন্নাহর পরিপন্থী হয়, তবে সেই আদেশ মানা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বর্তমান সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে আমরা প্রতিনিয়ত দেখি, মানুষ নিজের পদবি বাঁচাতে, প্রমোশন পেতে বা নেতার সুনজর ধরে রাখতে ইসলামের মৌলিক বিধানগুলোকে অবলীলায় বিসর্জন দেয়। অন্যের মর্জিমতো চলা কখনোই একজন প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।

নেতা বা প্রধানদের খুশি করতে গিয়ে যখন কেউ নামাজ, রোজা, সততা, আমানতদারি বা ন্যায়বিচারের মতো ইসলামের অকাট্য বিধানগুলোকে পাশ কাটিয়ে যায়, তখন সে মূলত নিজের ইমান ও পরকালকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ভয়াবহতা শুধু আখেরাতেই নয়, দুনিয়াতেও এটি অত্যন্ত প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়। অন্ধ আনুগত্যের কারণে সমাজে অন্যায়, অবিচার, জুলুম ও দুর্নীতির ব্যাপক প্রসার ঘটে। মানুষের বিবেক মরে যায় এবং সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করার ক্ষমতা পুরোপুরি লোপ পায়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেছেন, স্রষ্টার অবাধ্য হয়ে কোনো সৃষ্টির আনুগত্য করা যাবে না। (মুসনাদে আহমদ) এই একটি অমূল্য বাক্যই আমাদের জীবনের চলার পথের সবচেয়ে বড় মূলনীতি হওয়া উচিত। যে নেতা বা সমাজপতি আপনাকে দিয়ে এমন কোনো কাজ করাচ্ছেন যা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম, তিনি মূলত আপনাকে জাহান্নামের আগুনের দিকেই ঠেলে দিচ্ছেন। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্য আমরা হয়তো সাময়িকভাবে সেই নির্দেশ মেনে নিই, কিন্তু আখেরাতে এর পরিণাম হবে অকল্পনীয় ও ভয়াবহ।

কেয়ামতের কঠিন ময়দানে যখন প্রত্যেক মানুষকে তার নিজ নিজ আমলের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে, তখন কোনো নেতা বা কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি কাউকে রক্ষা করতে আসবে না। দুনিয়ায় যাদের কথায় মানুষ অন্যায় করছে, আখেরাতে তারাই সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়াবে। তারা একে অপরের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করবে। নেতারা বলবে, আমরা তো তোমাদের বাধ্য করিনি, তোমরা নিজেরাই নিজেদের ইচ্ছায় ও স্বার্থে আমাদের অনুসরণ করেছ। অনুসারীরা তখন চরম হতাশা ও আর্তনাদে নিমজ্জিত হবে।

অন্ধভাবে কাউকে অনুসরণ করে পথভ্রষ্ট হলে তার দায়ভার নিজেকেই নিতে হবে। ইসলাম সর্বদা ন্যায় ও সত্যের পক্ষে অটল থাকার নির্দেশ দেয়। যদি কোনো নেতা ইসলামের পথে চলেন এবং ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকেন, তবে তার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করা সওয়াবের কাজ এবং তা সমাজকে সুন্দর ও সুশৃঙ্খল করে। কিন্তু নেতার নির্দেশ যদি আল্লাহর বিধানের সামান্যতম বিরুদ্ধেও যায়, তবে দৃঢ়তার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করাই প্রকৃত ইমানের দাবি। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে কোরআন হাদিস মেনে পরকালের জীবনকে সুন্দর করার তওফিক দান করুন। আমিন।

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও প্রবন্ধকার