বাংলায় মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত

আপডেট : ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৫০ এএম

উনিশ শতকে বাংলায় ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাবে ধর্ম ও সংস্কৃতির ওপর চলে বহুমুখী আঘাত। তখন এক মহান ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন মুনশী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। তিনি ছিলেন একাধারে সমাজসংস্কারক, সুবক্তা এবং প্রতিভাধর লেখক। নিজের মেধা ও প্রখর যুক্তিবোধকে হাতিয়ার করে তিনি রুখে দাঁড়িয়েছিলেন সেই সময়ের সুসংগঠিত অপপ্রচারের বিরুদ্ধে। অভাব ও প্রতিকূলতার মধ্যেও অদম্য এই মানুষটি কেবল সাধারণ মানুষের ইমানই রক্ষা করেননি, বরং লেখনী ও বাগ্মিতার জাদুতে বাংলার ঘুমন্ত মুসলিম জনতাকে শিখিয়েছিলেন আত্মমর্যাদার নতুন পাঠ। ক্ষণজন্মা এই মহাপুরুষের হাত ধরেই উপনিবেশিক বাংলার সাহিত্য ও সমাজে সূচিত হয়েছিল ইতিবাচক ধারার সংস্কার আন্দোলন, যা আমাদের ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

১৭৫৭ সালে পলাশীর রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পর রাষ্ট্রীয় সহায়তায় খ্রিস্টান মিশনগুলো ভারতবর্ষের প্রধান দুটি ধর্ম সনাতন ও ইসলামের বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করে। খ্রিস্টান যাজকদের প্রচেষ্টায় তৎকালে অশিক্ষা, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যে পিষ্ট বহু হিন্দু ও মুসলিম খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করে। খ্রিস্টান মিশনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মের পক্ষে যেমন রাজা রামমোহন রায় সোচ্চার হয়েছিলেন, তেমনি ইসলাম ধর্মের পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন মুনশী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ। অখণ্ড বাংলা, বিহার, আসাম ও ত্রিপুরার মুসলিমদের ইমান রক্ষায় তার অবদান অনস্বীকার্য।

অল্প বয়সে বাবা মারা যাওয়ায় তার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া খুব বেশি হয়নি। তবে তিনি যশোরের মৌলবি মোসহার উদ্দীনের কাছে ধর্মশিক্ষা এবং মৌলবি মুহাম্মদ ইসমাইলের কাছে আরবি, ফারসি, উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে শিক্ষা লাভ করেন। এ সময় তিনি কোরআন-হাদিস ও ফারসি সাহিত্যেও বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন।

১৪ বছর বয়সে যশোর জেলা বোর্ডে কর্মচারী পদে তার কর্মজীবন শুরু হয়। জনৈক ইংরেজ তাকে দার্জিলিং নিয়ে গেলে সেখানে তিনি ‘মানসুরে মুহাম্মদী’ পত্রিকা এবং ‘খ্রিস্ট ধর্মের ভ্রষ্টতা’ নামক পুস্তক পড়ার সুযোগ পান। ওই পুস্তক পাঠের পর তার ধর্মানুরাগী মন ইসলাম ধর্মের প্রতি আরও গভীরভাবে আকৃষ্ট হয়।

এ ছাড়া সুলায়মান ওয়ার্সির ‘কেন আমি আমার পৈতৃক ধর্ম ত্যাগ করেছিলাম’, ‘কেন আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী হয়েছিলাম’ ও ‘প্রকৃত সত্য কোথায়’ গ্রন্থগুলো তাকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। এরপরই তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে দর্জি পেশায় নিয়োজিত হন।

তৎকালে খ্রিস্টান যাজকরা বাংলার গ্রামগঞ্জে, হাটবাজারে ঘুরে ঘুরে খ্রিস্ট ধর্ম প্রচার করত এবং প্রচলিত সনাতনী হিন্দু ধর্ম ও ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচারও চালাত। প্রথমে তিনি পাদ্রিদের এসব কথার বিপরীতে প্রশ্ন ও প্রতিবাদ করতেন, পরবর্তী সময়ে পাদ্রিদের মতো গ্রামগঞ্জে, হাটবাজারে ঘুরে ঘুরে অপপ্রচারের উত্তর দিতেন এবং ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরতেন। কথার যুক্তি, বক্তৃতার ধার ও অতুলনীয় বাগ্মিতার কারণে অচিরেই তিনি বাঙালি মুসলমানের নয়নমণি হয়ে ওঠেন।

এ কাজে ফুরফুরার পীর আবু বকর সিদ্দিকসহ অসংখ্য মনীষী তাকে অনুপ্রেরণা দেন। ধর্মীয় আন্দোলনে মুন্সী মেহেরউল্লার কাজ অনেকটা সংস্কারধর্মী ছিল। তিনি ইসলামকে কেবল খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে চাননি, বরং প্রচলিত ধর্মজীবনের সংস্কারও তার কাম্য ছিল।

ইসলাম প্রচারে তার অন্যতম মাধ্যম ছিল লেখালেখি। খ্রিস্টবাদের অসারতা, খ্রিস্টান মিশনারির অপপ্রচারের উত্তর, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব তুলে ধরে একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন তিনি। এ ছাড়া তিনি সাপ্তাহিক ‘মিহির ও সুধাকর’, মাসিক ‘ইসলাম প্রচারক’-সহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন। ১৮৯২ সালে ‘খ্রিস্টীয় বান্ধব’ পত্রিকায় ধর্মান্তরিত খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারক জন জমিরুদ্দীন ‘আসল কোরআন কোথায়?’ শিরোনামে একটি বিভ্রান্তিকর লেখা প্রকাশ করে। তাতে তিনি কোরআনের ওপর ছয়টি প্রশ্ন উত্থাপন করেন। তার প্রশ্নের উত্তরে মুনশী মেহেরুল্লাহ সুধাকর পত্রিকায় (১৮৯২ সালের জুন মাসের ২০ ও ২৭ তারিখে) ‘খ্রিষ্টানী ধোঁকা ভঞ্জন’ ও ‘আসল কোরআন সর্বত্র’ শিরোনামে দুটি প্রবন্ধ লেখেন। উত্তরে সন্তুষ্ট হয়ে জমিরুদ্দীন ইসলাম ধর্মে ফিরে আসেন এবং মুন্সী জমিরুদ্দীন নাম ধারণ করেন।

মুনশী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহ মোট ১২টি গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলোর মধ্যে ‘রদ্দে খ্রীষ্টিয়ান ও দলিলে এছলাম’, ‘সাহেব মুসলমান (অনুবাদ)’, ‘পান্দেনামা (অনুবাদ)’, ‘খ্রীষ্টান মুসলমান তর্কযুদ্ধ’, ‘জাওয়াবোন্নাছারা’, ‘মানবজীবনের কর্তব্য’ অন্যতম।

ইসলাম প্রচারের অংশ হিসেবে বরেণ্য এ মনীষী কখনো কখনো প্রতিপক্ষের সঙ্গে ‘বাহাস’ বা বিতর্কেও লিপ্ত হয়েছেন। ১২২৮ বঙ্গাব্দে ফিরোজপুরে তার জীবনের অন্যতম আলোচিত বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। তিন দিনব্যাপী এই তর্কযুদ্ধে তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের পরাজিত করেন। ঐতিহাসিক সেই বিতর্কের বিবরণ তার ‘খ্রীষ্টান মুসলমান তর্কযুদ্ধ’ পুস্তিকায় স্থান পেয়েছে।

কর্মী, সদস্য, পৃষ্ঠপোষক ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে মুনশী মুহাম্মদ মেহেরুল্লা একাধিক সভা-সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো, কলিকাতা মোহামেডান ইউনিয়ন, বঙ্গীয় সাহিত্য মুসলমান সমিতি, আঞ্জুমানে নুরুল ইসলাম, বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলমান শিক্ষা সমিতি, নিখিল ভারত ইসলাম প্রচার সমিতি ইত্যাদি।

কর্মজীবনে মুনশী মুহাম্মদ মেহেরুল্লাহর একটি সমর্থকগোষ্ঠী তৈরি হয়েছিল। সৈয়দ আলী আহসান তাদের ‘সুধাকর দল’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এ সুধাকর দলটি বাংলায় মুসলিম জাতীয় সাহিত্য সৃষ্টির নেশায় যেমন করে মেতেছিলেন এবং অনেক সাধনা করেছিলেন, তাদের আগে তেমন আর কাউকে দেখা যায় না। এ সুধাকর দল যেভাবে মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্যের ভিত্তি রচনা করেছিলেন, সে পথেই অর্ধশতাব্দীব্যাপী সাধনায় বাঙালি মুসলমানদের জাতীয় সাহিত্য বিকশিত হয়েছে।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সদালাপি ও বিনম্র। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন করতেন। উত্তরবঙ্গে এক দিনে তিনটি সভা করে তিনি জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বর ক্রমে নিউমোনিয়ায় রূপান্তরিত হয়। এ রোগেই ১৯০৭ সালের ৭ জুন মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। (তথ্যসূত্র : মুসলিম বাংলার মনীষা, মুনশী মেহেরুল্লাহ : জীবন ও কর্ম)

লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত