পৃথিবী বিশাল আশ্রয়স্থল। এখানে আমাদের বসবাস। চারদিকে ছড়িয়ে আছে বাঁচার নানা উপকরণ। মাটি, পানি ও বাতাস আমাদের জীবন ধারণের মূল উপাদান। এসব কিছুই পরম করুণাময় আল্লাহর দান। তিনি আমাদের জন্য এই পৃথিবীকে বাসযোগ্য করেছেন। সাজিয়েছেন নিখুঁত নিপুণতায়। আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত তার করুণায় ঘেরা। অথচ আমরা প্রায়ই এই সত্য ভুলে যাই। ডুবে থাকি মোহ-মায়ায়। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এই অসংখ্য নেয়ামতের কথা? অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে ডুবে থেকেও আমরা নেয়ামতদাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যাই।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ মানুষের এই দুর্বলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এভাবে, ‘আমি তোমাদেরকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং সেখানে তোমাদের জন্য জীবিকার ব্যবস্থা করেছি। তোমরা খুব সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা আরাফ ১০)
এই আয়াতে মানুষের জীবনের দুটি মৌলিক সত্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমত, পৃথিবীতে মানুষের অবস্থান ও ক্ষমতা আল্লাহর দান। দ্বিতীয়ত, মানুষের জীবিকার প্রতিটি উপকরণও তারই অনুগ্রহ। তাই একজন মুমিনের জীবন কৃতজ্ঞতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়াই স্বাভাবিক।
মহান আল্লাহ মানুষকে পৃথিবীর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি এমন একটি পৃথিবী দিয়েছেন, যেখানে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপকরণ ছড়িয়ে রেখেছেন। উর্বর জমি, বিশুদ্ধ পানি, নির্মল বাতাস, সূর্যের আলো, ফলমূল, শস্য, খনিজ সম্পদ, পশুপাখি, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, বনভূমি, সবই মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। মানুষ নিজে এসব সৃষ্টি করেনি। বরং মহান আল্লাহ তার অসীম দয়া ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে সবকিছুকে মানুষের উপযোগী করে সৃষ্টি করেছেন।
জীবিকার বিষয়টি কেবল অর্থ উপার্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রতিটি প্রয়োজন পূরণের জন্য যা কিছু দরকার, সবই রিজিকের অন্তর্ভুক্ত। সুস্থ শরীর, নিরাপদ পরিবার, জ্ঞান, বুদ্ধি, কর্মক্ষমতা, সময়, সম্মান, বন্ধুত্ব, এমনকি ইমানও আল্লাহর অমূল্য নেয়ামত। আমরা অনেক সময় রিজিক বলতে শুধু অর্থকেই বুঝি। অথচ অর্থ থাকলেও যদি সুস্থতা না থাকে, তাহলে সেই অর্থের প্রকৃত উপকার পাওয়া যায় না। আবার সুস্থ শরীর থাকলেও যদি ইমান-আমল না থাকে, তাহলে দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। তাই মহান আল্লাহর প্রতিটি দানই কৃতজ্ঞতার দাবি রাখে।
মানুষের একটি বড় দুর্বলতা হলো, সে নেয়ামতকে খুব দ্রুত স্বাভাবিক বিষয় বলে ধরে নেয়। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, বাতাস প্রবাহিত হয়, পানি পাওয়া যায়, খাবার মেলে, পরিবার পাশে থাকে। এসব এতটাই নিয়মিত যে, মানুষ এগুলোর মূল্য উপলব্ধি করতে পারে না। কিন্তু সামান্য অসুস্থতা, একটি দুর্ঘটনা কিংবা কোনো একটি নেয়ামত বন্ধ হয়ে গেলে তখনই বোঝা যায়, আল্লাহ কত বড় অনুগ্রহ করেছিলেন। তাই কোরআন বারবার মানুষকে তার চারপাশের নেয়ামত নিয়ে চিন্তা করতে আহ্বান জানিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করতে চাও, তবে কখনো তা গণনা করে শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় মানুষ অধিক অত্যাচারী ও অকৃতজ্ঞ।’ (সুরা ইবরাহিম ৩৪) আমরা যতটুকু দেখি, আল্লাহর অনুগ্রহ তার চেয়ে অনেক বেশি। অসংখ্য নেয়ামত এমনও আছে, যার কথা আমরা কখনো ভাবিই না।
কৃতজ্ঞতা কেবল মুখে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলার নাম নয়। প্রকৃত কৃতজ্ঞতা হলো অন্তরে নেয়ামতদাতাকে স্বীকার করা, মুখে তার প্রশংসা করা এবং বাস্তব জীবনে তার দেওয়া নেয়ামত তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করা। আল্লাহ যদি সম্পদ দেন, তাহলে সেই সম্পদের হক আদায় করতে হবে। তিনি যদি জ্ঞান দেন, তাহলে তা মানুষের কল্যাণে কাজে লাগাতে হবে। যদি ক্ষমতা দেন, তাহলে তা দিয়ে অন্যায় নয়, ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যদি সুস্থতা দেন, তাহলে সেই শক্তি ইবাদত ও সৎকর্মে ব্যয় করতে হবে। এভাবেই একজন মানুষ প্রকৃত কৃতজ্ঞ বান্দায় পরিণত হয়।
তাফসিরে জাকারিয়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, মানুষের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ মহান আল্লাহ পৃথিবীতে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। তাই সর্বাবস্থায় তার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করাই মানুষের কর্তব্য। কিন্তু মানুষ প্রায়ই স্রষ্টার অনুগ্রহ ভুলে গিয়ে পার্থিব উপকরণের মধ্যেই নিজেকে হারিয়ে ফেলে। তখন সে মনে করে, তার জ্ঞান, শ্রম কিংবা যোগ্যতাই সবকিছুর মূল কারণ। অথচ বাস্তবতা হলো, মানুষ নিজেই আল্লাহর সৃষ্টি। তার মেধা, শক্তি ও সুযোগ সবই আল্লাহর দান।
আজকের পৃথিবীতে ভোগবাদ মানুষের কৃতজ্ঞতাবোধকে অনেকাংশে দুর্বল করে দিয়েছে। মানুষ যত বেশি পায়, তত বেশি চায়। একটি বাড়ি হলে আরেকটি বাড়ির চিন্তা করে। একটি গাড়ি হলে আরও উন্নত গাড়ির আকাক্সক্ষা জন্মায়। একটি পদ পেলেই আরও বড় পদের জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। ফলে যা আছে, তার জন্য কৃতজ্ঞ হওয়ার পরিবর্তে যা নেই, তার জন্য আফসোস করতে থাকে। এই মানসিকতা মানুষের অন্তর থেকে প্রশান্তি কেড়ে নেয়।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিচের স্তরের মানুষের দিকে তাকাও। ওপরের স্তরের মানুষের দিকে তাকিও না। এতে আল্লাহ তোমাদের যে নেয়ামত দিয়েছেন, তাকে তুচ্ছ মনে করবে না।’ (সহিহ মুসলিম) এই শিক্ষা মানুষকে সন্তুষ্ট থাকতে এবং কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
লেখক : ইসলামি গবেষক