রোনালদোর অসমাপ্ত গল্প

স্পেনের সঙ্গে পর্তুগালের ম্যাচ শুরুর প্রায় ৪০ মিনিট বাকি তখনো। ডালাস স্টেডিয়ামের টানেলে যখন পর্তুগিজ খেলোয়াড়রা একে একে জড়ো হচ্ছিলেন, সবার সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন ৪১ বছর বয়সী অধিনায়ক। প্রতিবারের মতো এবারও গা গরমের সেশনের জন্য তিনিই দলকে নেতৃত্ব দিয়ে মাঠে নিয়ে গেলেন।

স্টেডিয়ামের বিশাল জায়ান্ট স্ক্রিনটি তখন টানা কয়েক মিনিট ধরে স্থির হয়ে রইল সেই চেনা ‘নম্বর ৭’ জার্সির ওপর। গ্যালারিতে বসা প্রতিটি মানুষ, এমনকি অতি কট্টর প্রতিপক্ষও মনে মনে জানতÑ হয়তো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা নায়কের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচটি দেখার সাক্ষী হতে যাচ্ছেন তারা। রোনালদো নিজেও চেয়েছিলেন এই যাত্রায় অন্তত আরও তিনটি ম্যাচ দীর্ঘ হোক।

কিন্তু ফুটবল বিধাতা সোমবার ডালাসে অন্য এক চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিলেন। ম্যাচের ৯১ মিনিটে স্পেনের মিকেল মেরিনোর সেই নির্মম গোলটি পর্তুগালকে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে দিল, আর সেই সঙ্গে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল ছয়টি বিশ্বকাপ ধরে তাড়া করা রোনালদোর সেই আজন্ম লালিত সোনালি ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্ন।

রেফারি যখন ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজালেন, জায়ান্ট স্ক্রিনের ক্যামেরাটি আবারও জুম করল পর্তুগিজ মহাতারকার ওপর। তবে এবার আর কোনো আগ্রাসী উদযাপনের ছবি নয়; ক্যামেরায় ধরা পড়ল ৪১ বছর বয়সী এক কিংবদন্তির অশ্রুসিক্ত চোখ। ঠিক সেই মুহূর্তে ডালাসের গ্যালারি থেকে ভেসে এল তুমুল করতালি। স্প্যানিশ সমর্থকরাও যেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে চিরবিদায়ের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে কার্পণ্য করেননি। প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা এসে হাত মেলালেন। নতুন প্রজন্মের লামিন ইয়ামাল বয়সে দ্বিগুণের বেশি প্রতিদ্বন্দ্বীকে কাঁধে হাত দিয়ে সান্ত¡না দিলেন। কিছুক্ষণ পর অধিনায়কত্বের আর্মব্যান্ডটি হাতে মুঠো করে ধরে অশ্রুভেজা চোখে গ্যালারির দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো মাঠ ছাড়লেন সিআর সেভেন।

ম্যাচের আগের দিনই বলে রেখেছিলেন, এটাই তার শেষ বিশ্বকাপ। ম্যাচ শেষে আবারও কথাটা বললেন রোনালদো অত্যন্ত শান্ত ও সংযত কণ্ঠে। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে এখনই অবসর নিচ্ছেন কি না, তা পরিবারের সঙ্গে ঠা-া মাথায় আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান। ‘প্রধান কোনো টুর্নামেন্ট থেকে এভাবে ছিটকে যাওয়া সবসময়ই হতাশার। তবে আমরা মাথা উঁচু রেখেই বিদায় নিতে পারি। বাইরে কী আলোচনা বা সমালোচনা হচ্ছে তা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। আমরা যখন ভালো খেলি না বা হারি, তখন আমাদের আক্রমণ করা হয়Ñ বিশেষ করে আমাকে। তবে আমি এসবে অভ্যস্ত এবং আমি আমার কাজ করে যাব।’

বিশ্বকাপ ট্রফিটি এই প্রজন্মকে নেতৃত্ব দেওয়া অ্যাথলেটের ক্যারিয়ারের একমাত্র অধরা স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল। বিশ্বকাপে ২৭ ম্যাচে ১১টি গোল করলেও নকআউট পর্বে তিনি কখনোই পুরোপুরি মেলাতে পারেননি। ২০০৬ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপে সেমিফাইনাল খেলেছিলেন, কিন্তু এরপর আর কখনই ফাইনালের মঞ্চে যাওয়া হয়নি। এবারের আসরে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করে ৪১ বছর ১৪৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপের নকআউট ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতার রেকর্ড গড়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

দীর্ঘ ২৩ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে রোনালদোকে যতখানি ভালোবাসা দেওয়া হয়েছে, ঠিক ততখানিই সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে হয়েছে। এবারের বিশ্বকাপেও তার শুরুর একাদশে থাকা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। তবে বিশ্বকাপ না জিতলেও জাতীয় দলের হয়ে নিজের অবদান নিয়ে রোনালদো তীব্র গর্ব প্রকাশ করেন, ‘আমি পর্তুগালের হয়ে ৩টি আন্তর্জাতিক শিরোপা জিতেছি এবং জাতীয় দলের জন্য যা করতে পেরেছি তাতে আমি ভীষণ খুশি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর যুগের আগে পর্তুগাল কখনো কোনো বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট জেতেনি। জাতীয় দলের হয়ে আমার জেতা সবচেয়ে বড় ট্রফিটি ছিল ২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। সত্যি বলতে, আমার কাছে ইউরো ২০১৬ জেতার মূল্য একটি বিশ্বকাপ জেতার মতোই সমান। আমি পর্তুগালের হয়ে আমার সবকিছু উজাড় করে দিয়েছি। আমি একদম পরিষ্কার বিবেক নিয়ে বিদায় নিচ্ছি। কাল একটি নতুন দিন এবং জীবন তার নিজস্ব নিয়মে চলবে।’

ডালাসের গ্যালারিতে রোনালদোর বিশাল সব মুখোশ আর তার নামে তৈরি হওয়া চ্যান্টগুলো বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছিল। আল-নাসরের হয়ে ক্লাব ফুটবলে হয়তো তাকে আরও কিছুদিন দেখা যাবে, কিন্তু বিশ্বকাপের রঙিন মঞ্চে আর কখনোই দেখা যাবে না লাল-সবুজ জার্সির সেই অতিমানবীয় ৭ নম্বরকে। ফুটবল বিশ্ব ট্রফি ছাড়া এক রাজার মহাপ্রস্থান দেখল।