জুলাইয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টি পেল চট্টগ্রাম। ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের পর গতকাল বিকাল ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে চট্টগ্রামে। পরিসংখ্যানের হিসাবে চট্টগ্রামের ইতিহাসে জুলাই মাসে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। যদিও জুন কিংবা আগস্ট মাসে এর চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড রয়েছে। ২০১২ সালের ২৬ জুন ৪৬৩ মিলিমিটার এবং ১৯৮৩ সালের ৪ আগস্ট ৫১১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ডও আছে চট্টগ্রামে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জুলাই মাসে চট্টগ্রামের বৃষ্টিপাতের উপাত্তে দেখা যায়, জুলাই মাসে সাধারণত ৪০০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাতের রেকর্ড নেই। ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের আগে ১৯৫৫ সালে ১৪ জুলাই ৪১৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছিল। এ ছাড়া জুলাই মাসে গত তিন দশকে ৪০০ মিলিমিটারের নিচে বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৮৫ সালের ৯ জুলাই ৩৭৪ মিলিমিটার, ১৯৬৮ সালের ৮ জুলাই ৩৬৬, ২০১৫ সালের ২৫ জুলাই ২৯৯ এবং ২০১৭ সালের ১২ জুলাই ২২২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। তাহলে এখন প্রশ্ন হলো জুলাই মাসের ইতিহাসে চট্টগ্রামে এবার কেন এত বেশি বৃষ্টি হলো?
চট্টগ্রামের বৃষ্টিপাতের উপাত্ত নিয়ে গত ২৬ বছর ধরে কাজ করছেন আবহাওয়া অধিদপ্তর পতেঙ্গা কার্যালয়ের বিশ্বজিৎ চৌধুরী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, জুলাই মাসের কোনো এক দিনের ২৪ ঘণ্টার হিসাবে হয়তো গতকালের বৃষ্টিপাত রেকর্ড। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তর তথা বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার হিসাবে তা রেকর্ডযোগ্য নয়।
কেন রেকর্ডযোগ্য নয় এমন প্রশ্ন করা হলে বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের রেকর্ড নেওয়া হয় সকাল ৬টা থেকে পরবর্তী দিন সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার হিসাবে। সে হিসাবে আগামীকাল (বুধবার) সকাল ৬টা পর্যন্ত বিগত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের রেকর্ড যত হবে, তত বিবেচনায় আনা হবে।
একই মন্তব্য করেন আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঢাকা অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক। তিনি বলেন, ‘খ- খ- ২৪ ঘণ্টার হিসাবে আবহাওয়া অধিদপ্তরের উপাত্ত তুলনা করা যায় না। আবহাওয়ার উপাত্ত একটি স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলে।’
কিন্তু আবহাওয়ার স্ট্যান্ডার্ড যাই বলা হোক না কেন? বৃষ্টিপাত ঝরেছে এবং চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা হয়েছে এবং দেওয়াল ও পাহাড়ধসে দুজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এখন প্রশ্ন হলো হঠাৎ এত বৃষ্টি কেন? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় আবহাওয়ার গত ৪৪ বছরের উপাত্ত নিয়ে গবেষণা করা ড. বজলুর রশিদের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘এই বৃষ্টি যে হবে তা আমরা আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিলাম। এমনকি ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিও পূর্ব ঘোষণায় ছিল।’
কিন্তু কেন এই বৃষ্টি? এর উত্তরে তিনি বলেন, সাগরে সৃষ্টি হওয়া নিম্নচাপটি স্থল নিম্নচাপ আকারে উড়িশ্যার ওপর দিয়ে অতিক্রম করে ভারতের দক্ষিণ ঝাড়খ- এলাকায় দুদিন অবস্থান করে। এই সময়ের মধ্যে সাগর থেকে প্রচুর জলীয় বাষ্প নিয়ে আসে। কিন্তু বায়ুচাপের তারতম্যের কারণে এবং এই নিম্নচাপ বলয়ের প্রান্তভাগে (ডানদিকে) জলীয় বাষ্পের প্রবাহ বেশি ছিল বলে প্রথম দিন কক্সবাজারে এবং দ্বিতীয় দিন চট্টগ্রামে অতিভারী বৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে গুগল স্যাটেলাইট ম্যাপের সাহায্যে দেখা যায়, ভারতের দক্ষিণ ঝাড়খ- থেকে চট্টগ্রামের দূরত্ব প্রায় ৭০০ কিলোমিটার। এত দূরত্বে কীভাবে বৃষ্টিপাত হলো? এই প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ বিশ্বজিৎ চৌধুরী বলেন, নিম্নচাপটির ব্যাস ছিল ৭০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটারের। আর চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে পাহাড়ের অবস্থান থাকার কারণে সাগর থেকে আসা জলীয়বাষ্পগুলো এসব পাহাড়ে বাধাগ্রস্ত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটিয়েছে।
অন্যদিকে ভূগোলবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাতাস বা পানির গতি উত্তর গোলার্ধে ডান দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে বাম দিকে বেঁকে চলে। আর এ কারণে ঘূর্ণায়মান বাতাস সর্বপ্রথম ডান দিকে আঘাত করে। এ কারণেই নিম্নচাপের প্রভাবে ডান দিক চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকা হওয়ায় এ অঞ্চলে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে।
উল্লেখ্য, বছরের জুন মাসে মৌসুমি বায়ু প্রবেশের পর থেকে সারা দেশে বর্ষাকাল শুরু হয় এবং তা আগস্ট পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর এ কারণে বছরের এ সময় স্বাভাবিকভাবেই বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। গতকাল যদিও বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে, কিন্তু সন্ধ্যা ৬টায় বিগত ২৪ ঘণ্টায় তা ৩৯৪ মিলিমিটারে নেমে আসে।