তানজীর আহম্মেদ তুষার
সহকারী অধ্যাপক, মনোবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
‘বাবা হাত ধুয়ে খাও পেটে অসুখ করবে’, ‘বৃষ্টিতে বেশি ভিজো না ঠান্ডা লাগবে’, ‘ঠিকমতো খাও না হলে শক্তি পাবে না’ শারীরিক স্বাস্থ্য কীভাবে ভালো রাখতে হবে সে বিষয়ে আমরা অনেক সচেতন। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে আমরা ততটা সচেতন হতে পারিনি। অথচ শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দিতে হয়। কেননা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকলে পরিষ্কার করে চিন্তা করতে পারে, সামাজিক দক্ষতাসহ অন্যান্য দক্ষতা অর্জন করতে পারে, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ হতে পারে। সর্বোপরি একজন সফল সুনাগরিক হতে গেলে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকতে হবে। তাই আসুন, আজ জেনে নিই একটি শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখার জন্য বেশ কিছু কৌশল।
শিশুকে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিন
শিশুকে ভালোবাসা, নিরাপত্তা, স্বীকৃতি ও সমর্থন দিতে হবে। শিশু যেন মনে না করে যে, সে ঠিকমতো দক্ষতা দেখাতে না পারলে কেউ তাকে ভালোবাসবে না। তাকে বুঝতে দিতে হবে যে, পরিবার তাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসে কোনো কিছুর বিনিময়ে নয়। কারণ অনেক সময় শিশু পড়াশোনাকে ভালোবাসা পাওয়ার বিনিময় হিসেবে দেখে, ফলে কোনো কারণে পড়াশোনা একটু খারাপ হলে সে প্রচন্ড বিষন্নতায় পড়ে যায়। ফলে পড়াশোনায় আরও ক্ষতি হয়ে যায়। তাই শিশু ভুল করলে তাকে ভালোবাসা দেওয়া হবে না, এমন বার্তা একদম দেওয়া যাবে না। বরং শিশু ভুল করতেই পারে, ভুল সংশোধনের মাধ্যমে শিশু শিখে থাকে। তাই তার ভুলকে সহজভাবে দেখতে হবে।
শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ করে তুলুন
শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাপূর্ণ করে তোলার জন্য তার সফলতাকে প্রশংসা করুন। তার ছোট ছোট কাজ বা খেলায় ভালো করলে তাকে প্রশংসা করুন। প্রশংসা করলে তার কাজের স্বীকৃতি সে পাবে এবং আত্মবিশ্বাসও বাড়বে। ছোট ছোট কাজে ধাপে ধাপে লক্ষ্য বাড়াতে শেখান। অর্থাৎ একটি লক্ষ্য পূরণ হলে আরেকটি লক্ষ্য পূরণ করার দিকে এগিয়ে যেতে হবে। শিশুকে কোনোভাবেই ব্যঙ্গাত্মক কথা বলা যাবে না। একটি শিশু যদি কোনো কিছু করতে ব্যর্থ হয়, তবে তাকে ব্যঙ্গ না করে তার অনুভূতিকে বোঝার চেষ্টা করুন। তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে তাকে সহযোগিতা করুন। শিশুকে কোনো কিছু করানোর জন্য না দৌড়িয়ে তাকে ওই কাজটির মধ্যে আনন্দ খুঁজে পেতে সাহায্য করুন।
অন্যদের সঙ্গে খেলার সুযোগ
খেলা শিশুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক চাহিদা। খেলার মাধ্যমে শিশুর সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা বৃদ্ধি, সামাজিকতা, সুস্থ প্রতিযোগিতা, স্বাস্থ্যসম্মতভাবে পরাজয় মেনে নেওয়ার ক্ষমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। তাই শিশুকে যথেষ্ট খেলার সুযোগ দিন দৌড়াদৌড়ি, চিৎকার করা এগুলো শুধু খেলাই নয়, এগুলো শিশুকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বেড়ে উঠতে সাহায্য করে। শিশুর খেলার জন্য খেলার সঙ্গী প্রয়োজন। সঙ্গীদের কাছ থেকে সে তার শক্তিশালী ও দুর্বল দিকগুলো চিহ্নিত করে, একত্মতা বোধ করতে শিখে, অন্যের সঙ্গে কীভাবে চলে তা শিখতে পারে, কোনো কথার অন্তর্নিহিত অর্থ কী বুঝতে পারে। তাই শিশুকে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলার ব্যবস্থা করে দিন। পাশাপাশি বাবা-মাকেও শিশুর সঙ্গে খেলতে হয়। খেলা খুব বেশি প্রতিযোগিতামূলকভাবে না দেখে এতে অংশ নেওয়ার আনন্দ উপভোগ করতে সাহায্য করুন।
টিভি
টিভি দেখিয়ে শিশুকে বসিয়ে রাখার জন্য শিশুকে যদি বেশি বেশি টিভি দেখানো হয় এবং সেই টিভি দেখানো যদি দায়িত্ববান কারও নির্দেশনা ছাড়াই হয়, তবে শিশুটির শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তাই টিভি দেখার পরিমাণ যেন বেশি না হয়ে যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
স্কুল যেন হয় আনন্দময়
শিশুর স্কুলের শুরুটা যতটা সম্ভব আনন্দঘন হতে হবে। অনেক সময়ে বাবা-মায়ের কোমলমতি শিশুদের এই বলে ভয় দেখান যে, স্কুলে দুষ্টামি করলে শিক্ষক বকা বা মার দেবে। তাই শিশুর স্কুলের শুরুটা হতে হবে আনন্দঘনভাবে এবং প্রি-স্কুলে পড়াশোনার চেয়ে মজা করাটা মুখ্য হতে হবে। স্কুলের শিক্ষকের কাছ থেকে উৎসাহ ও সঠিক জীবন দর্শন পেলে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য উন্নত হয় ও চিন্তাচেতনায় উন্নত হতে পারে।
শান্তিপূর্ণ পারিবারিক আবহ
সুস্থ মানুষ হিসেবে শিশুকে গড়ে তুলতে হলে পারিবারিক পরিবেশ সুন্দর, সহযোগিতাপূর্ণ ও গণতান্ত্রিকতার ছোঁয়া থাকতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত সুন্দর মিথস্ক্রিয়া থাকতে হয়। তাহলে শুধু শিশুরই নয়, পরিবারের সবারই মানসিক স্বাস্থ্য ভালো থাকবে। পরিবারের মানুষদের যোগ্যতার বিচার না করে সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে সবাইকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবার হতে হবে সদস্যদের নির্ভরতার ও নিরাপত্তার আশ্রয়স্থল। যেখানে যেকোনো বিষয় আলোচনা করা যাবে। কোনো বিষয় অবতারণা করার জন্য কোনো বকাঝকা বা ব্যঙ্গাত্মক কথা শুনতে হবে না এবং পরেও এটা নিয়ে কেউ কথা তুলবে না।
যথাযথ লালন-পালন
শিশুকে সঠিক পদ্ধতিতে লালন-পালন করলে শিশুদের বেশিরভাগ আচরণগত ও মানসিক সমস্যাকে মোকাবেলা করা যায়। কোনো পিতা-মাতাই সম্পূর্ণ সঠিক বা সম্পূর্ণ ভুলভাবে লালন-পালন করেন না। অনেকগুলো সঠিক থাকে আবার কিছু কিছু ভুল থাকে। আবার কোনো কোনো পদ্ধতি পূর্বে সঠিক বলে মনে করা হতো, কিন্তু পারিপাশির্^ক পরিবেশ ও সংস্কৃতিগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেটি আর সঠিক হিসেবে প্রতীয়মান হয় না। তাই সঠিক নিয়ম জেনে এবং লালন-পালনের পদ্ধতির মধ্যেও পরিবর্তন করে শিশুকে সঠিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে হবে। জানার জন্য বিভিন্ন পত্রিকা ও বই পড়া যেতে পারে।