শাড়িতে পলকা

ডটের প্রত্যাবর্তন ফ্যাশনের ধারা কখনো হারিয়ে যায় না, শুধু সময় নিয়ে ফিরে আসে। একসময় আলমারিতে যতœ করে তুলে রাখা নকশাগুলোই হঠাৎ একদিন সময়ের কাক্সিক্ষত ট্রেন্ড হয়ে ওঠে। সেভাবেই ফিরে এসেছে পলকা ডট। আশির দশকের জনপ্রিয় এই গোল বিন্দুর নকশা এখন আবার জায়গা করে নিয়েছে শাড়ির ক্যানভাসে। নানা রঙের সমন্বয় আর আরামদায়ক কাপড়ের সঙ্গে মিলে পলকা ডট নতুন পরিচয়ে হাজির হয়েছে। লিখেছেন মোহসীনা লাইজু

ফ্যাশনের চিরসবুজ নকশা পলকা ডট। একদিকে বহন করে নস্টালজিয়ার আবহ, অন্যদিকে আধুনিক ফ্যাশনের সঙ্গে সহজেই মিশে যায়। তাই অফিস, উৎসব, আড্ডা কিংবা বিকেলের কফি ডেট যেখানেই হোক, একটি সুন্দর পলকা ডট শাড়ি সাজে এনে দিতে পারে আভিজাত্য আর ব্যতিক্রমী সৌন্দর্যের ছোঁয়া।

পোলকা ডট নামটা এসেছে ১৯ শতকের ইউরোপে জনপ্রিয় ‘পোলকা’ নাচ থেকে। ১৮৩০-৪০-এর দশকে যখন পোলকা নাচ ইউরোপ ও আমেরিকায় খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন ব্যবসায়ীরা সেই সময়ের ট্রেন্ডি জিনিসের সঙ্গে  ‘পোলকা’ শব্দটা জুড়ে দিতেন বিক্রি বাড়ানোর জন্য। যেমন পোলকা হ্যাট, পোলকা পুডিং। ঠিক সেভাবেই ডট প্যাটার্নের কাপড়ও ‘পোলকা ডট’ নামে পরিচিত হয়ে যায়, যদিও নাচের সঙ্গে ডিজাইনটার কোনো সরাসরি সম্পর্ক ছিল না।

তবে ডট বা ফোঁটার নকশা কিন্তু এই নামকরণের অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতিতে ছিল। জাপানের ঐতিহ্যবাহী ‘কানোকো শিবোরি’ টাই-ডাই কৌশলে, আফ্রিকান টেক্সটাইলে এবং ইউরোপীয় লোকজ পোশাকেও এ ধরনের নকশা দেখা গেছে।

 পোলকা ডট কোনো একজন ব্যক্তি এই ডিজাইন আবিষ্কার করেননি। তবে ফ্যাশনে জনপ্রিয়তা পায় ২০ শতকের শুরুতে, যখন টেক্সটাইল প্রিন্টিং প্রযুক্তির উন্নতির ফলে সমান আকার ও দূরত্বের ডট নিয়মিতভাবে ছাপানো সহজ হয়ে যায়। ১৯২০-৩০-এর দশকে নারীদের ফ্যাশনে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, আর ১৯৫০-এর দশকে মেরিলিন মনরোর মতো তারকাদের পোলকা ডট পোশাক পরা এই প্যাটার্নকে আইকনিক করে তোলে।

জনপ্রিয়তার আদি-অন্ত

কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে ‘ভিনটেজ’ ও ‘রেট্রো’ ফ্যাশনের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বেড়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় পলকা ডটও আবার ট্রেন্ডে এসেছে। এই নকশার সৌন্দর্য হলো এর সরলতা। ছোট কিংবা বড় গোলাকার বিন্দুর পুনরাবৃত্তি শাড়ির জমিনকে পরিপাটি করেছে। একই সঙ্গে আটপৌরে ভাবও জুড়ে দিয়েছে।

কী ধরনের শাড়িতে পলকা ডট

এখন বাজারে প্রায় সব ধরনের শাড়িতেই পলকা ডট দেখা যাচ্ছে। দৈনন্দিন ব্যবহার কিংবা অফিসে ব্যবহারের সুতি শাড়ি, যা গরমের দিনের জন্য আরামদায়ক ও ফ্যাশনেবল। ছোট ডটের নকশা এসব শাড়িকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

তবে পলকা ডটের লিনেন শাড়িও কর্মজীবী নারীদের পছন্দের শীর্ষে। লাল, সাদা-কালো, নেভি-সাদা বা বেইজ রঙের পলকা ডট লিনেন শাড়ি ক্রেতারা বেশি কিনছেন।

পলকা ডটের মসলিন ও অর্গানজা শাড়ি উৎসব বা সন্ধ্যার অনুষ্ঠানের জন্য দারুণ। বড় ডটের সঙ্গে সূক্ষ্ম এমব্রয়ডারি বা সিকুইনের কাজ শাড়িকে দেয় আধুনিক আবেদন। সিল্ক ও সফট সিল্ক শাড়িতে পলকা ডটে ফুটে ওঠে আভিজাত্য। বিশেষ করে কালো, লাল, পান্না সবুজ কিংবা রয়্যাল ব্লু রঙের ওপর সাদা বা সোনালি ডট এখন বেশ জনপ্রিয়। এর সঙ্গে আছে হ্যান্ডপেইন্টে পলকা ডটের নকশায় শাড়ি। অনেক ডিজাইনারের সিকনেচার কালেকশনে এই ধরনের শাড়ি পাওয়া যাবে।

ডিজাইনাররা কী বলছেন

আজুবার ফ্যাশন ডিজাইনার শান্তা কবিরের মতে, পলকা ডট এমন একটি মোটিফ, যা সময়ের গ-ি পেরিয়ে বারবার ফিরে আসে। কারণ এটি একই সঙ্গে ক্লাসিক ও আধুনিক। বর্তমানে শুধু একরঙা ডট নয়, ছোট বড় আকারের ডট, হাতে আঁকা ডট কিংবা ফুলের নকশার সঙ্গে ডটের মিশ্রণও দেখা যাচ্ছে। ফলে পুরনো ডিজাইন নতুন রূপে আরো আধুনিক হয়ে ফিরে আসছে। যারা খুব বেশি ভারী নকশার শাড়ি পছন্দ করেন না, কিন্তু একটু আলাদা লুক চান, তাদের জন্য পলকা ডটের শাড়ি আদর্শ।

কারা পরতে পারেন

পলকা ডটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো বয়সের কোনো বাধা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া তরুণী থেকে শুরু করে কর্মজীবী নারী কিংবা মধ্যবয়সীরাও স্বাচ্ছন্দ্যে পরতে পারেন এই ডিজাইনের শাড়ি। তবে বয়সের ক্ষেত্রে ডটের আকার বেছে নেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চতা কম এমন নারীদের জন্য ছোট বা মাঝারি আকারের পলকা ডট বেশি মানানসই। যাদের উচ্চতা বেশি তারা ছোট-বড় দুই ধরনের শাড়িই পরতে পারেন। ওজন বেশি তারা মাঝারি বা ছোট ডটের শাড়ি বেছে নিতে পারেন। এর ফলে দেখতে তুলনামূলক সিøম লাগবে। সিøম ফিগারের জন্য বড় পলকা ডট সহজেই মানিয়ে যাবে। আর একটা বিষয় পলকা ডটের শাড়ির সঙ্গে ব্লাউজটা কিন্তু এক রংয়ের হতে হবে।

সাজগোজ কেমন হবে

পলকা ডট শাড়ির সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে সাজ হওয়া উচিত ক্লাসিক। মেকআপে হালকা বেস, সরু আইলাইনার, মাশকারা ও লাল কিংবা নুড লিপস্টিক সুন্দর মানায়। খুব ভারী গ্লিটার বা অতিরিক্ত কনট্যুর পুরোপুরি বাদ দিতে হবে। চুলে খোঁপা, নরম কার্ল কিংবা খোলা চুল সবই মানায়। খোঁপায় সাদা জুঁই বা লাল গোলাপ পুরো লুকে যোগ করতে পারে ভিনটেজ আবহ।

অনুষঙ্গে থাকুক সামঞ্জস্য

শাড়ির সঙ্গে বড় আকারের গয়না নয়, বরং মিনিমাল গয়না বেশি মানানসই। মুক্তার দুল, সিলভার রিং, ছোট স্টাড, অক্সিডাইজড সিলভারের গয়না, চিকন চেইন বা ছোট পেনডেন্ট সুন্দর লাগে। কালো-সাদা পলকা ডট শাড়ির সঙ্গে লাল পুঁতির মালা বা লাল কাচের চুড়িও দারুণ মানিয়ে যায়। অন্যান্য অনুষঙ্গের মধ্যে ছোট সিøং ব্যাগ বা ক্লাচ। পায়ে ব্লক হিল বা কিটেন হিল এবং সাদা বা কালো স্যান্ডেলও পরতে পারেন। হাতে সরু ঘড়ি।