জিকোর গোল বাতিল ও ভিএআর বিতর্ক

বিশ্বকাপ যত বড় টুর্নামেন্ট, রেফারির একটি সিদ্ধান্তও তত বড় আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। আর্জেন্টিনা ও মিসরের কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার ম্যাচটিও তার ব্যতিক্রম নয়। ম্যাচে মিসরের জিকোর একটি গোল ভিএআরের সহায়তায় বাতিল হওয়ার পর থেকেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষকদের আলোচনায় এখন একটাই প্রশ্ন সিদ্ধান্তটি কি সঠিক ছিল?

আমি দীর্ঘদিন ফিফার অধীনে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনা করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বলব কোনো একটি সিদ্ধান্তকে শুধু আবেগ দিয়ে বিচার করলে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। রেফারির প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে থাকে নির্দিষ্ট আইন, অবস্থান, পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে ভিডিও সহকারী রেফারির (ভিএআর) সহায়তা।

প্রথমেই ভিএআর নিয়ে একটি ভুল ধারণা দূর করা দরকার। অনেকেই মনে করেন, ভিএআর মাঠের রেফারির বিকল্প। বাস্তবে তা নয়। ভিএআর কখনোই রেফারির জায়গা নেয় না। বরং মাঠের রেফারি যদি কোনো স্পষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ ভুল করেন কিংবা কোনো ঘটনা দেখতে না পান, তখনই ভিএআর তাকে পুনর্বিবেচনার সুযোগ দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কিন্তু মাঠের রেফারিরই।

জিকোর গোলের ঘটনাটি যদি আইনগত দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়, তাহলে প্রথমে বুঝতে হবে গোল বাতিলের কারণ কী ছিল। অফসাইড, আক্রমণকারী খেলোয়াড়ের ফাউল, হ্যান্ডবল অথবা বল খেলার আগে অন্য কোনো লঙ্ঘন, এসব কারণেই সাধারণত ভিএআরের মাধ্যমে গোল বাতিল হয়। যদি ভিডিওতে পরিষ্কারভাবে এমন কোনো লঙ্ঘন ধরা পড়ে, তাহলে গোল বাতিল করাই আইনসম্মত সিদ্ধান্ত। কিন্তু যদি প্রমাণ অস্পষ্ট হয়, তাহলে মাঠের সিদ্ধান্ত বহাল থাকাই আন্তর্জাতিক রেফারিংয়ের মূল নীতি। তবে ফুটবল আইনের দৃষ্টিতে জিকোর গোল বাতিলের বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এমন সিদ্ধান্ত রেফারির জন্য সহজ ছিল না। যদি ভিএআরের পর্যালোচনায় দেখা যায় যে আক্রমণ শুরুর আগে মিসরের কোনো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষকে ধাক্কা দিয়েছেন, জার্সি টেনেছেন, অবৈধভাবে জায়গা তৈরি করেছেন বা অন্য কোনো ফাউল করেছেন, তাহলে গোল বাতিল করাই সঠিক সিদ্ধান্ত।

এ ধরনের মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো চাপ সামলানো। স্টেডিয়ামে হাজার হাজার দর্শক, টেলিভিশনের সামনে কোটি কোটি মানুষ এবং দুই দলের খেলোয়াড়দের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মধ্যে কয়েক সেকেন্ডে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অনেকেই মনে করেন, রেফারি সহজেই সিদ্ধান্ত দেন। বাস্তবে এটি অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা।

এই ম্যাচে রেফারির সামগ্রিক পারফরম্যান্সও আলোচনার দাবি রাখে। আমার পর্যবেক্ষণে তিনি শুরু থেকেই ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছেন। অপ্রয়োজনীয় শারীরিক সংঘর্ষ ঠেকাতে দ্রুত বাঁশি বাজিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সময়ে সতর্কবার্তা দিয়েছেন এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। এগুলো একজন অভিজ্ঞ রেফারির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

তবে একটি বিষয় সব সময় মনে রাখতে হবে, রেফারি যদি একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত দেন, তার মানে এই নয় যে পুরো ম্যাচ খারাপ পরিচালিত হয়েছে। ৯০ মিনিটে তিনি শতাধিক সিদ্ধান্ত নেন। দর্শক সাধারণত শুধু একটি বা দুটি বিতর্কিত মুহূর্তই মনে রাখেন। ভিএআরের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি মানবিক ভুল কমিয়ে আনে। কিন্তু প্রযুক্তিও শতভাগ বিতর্কমুক্ত নয়। ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল, ফ্রেম নির্বাচন কিংবা ঘটনার ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্ন মত থাকতেই পারে। তাই ভিএআর ফুটবল থেকে বিতর্ক দূর করেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কের ধরন বদলে দিয়েছে।

আমি সব সময় বলি, একজন ভালো রেফারির সবচেয়ে বড় গুণ হলো ধারাবাহিকতা। একই ধরনের অপরাধের জন্য যদি একই মানদ- প্রয়োগ করা হয়, তাহলে খেলোয়াড়রাও সিদ্ধান্ত সহজে মেনে নেয়। কিন্তু এক ঘটনায় এক রকম, অন্য ঘটনায় ভিন্ন সিদ্ধান্ত এলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

মিসরের খেলোয়াড়দের হতাশা আমি বুঝতে পারি। নকআউট পর্বে একটি গোল বাতিল হওয়া মানেই পুরো ম্যাচের গতিপথ বদলে যেতে পারে। আবার আর্জেন্টিনাও বলবে, আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হলে সেটি মেনে নেওয়াই উচিত। ফুটবলে এমন দ্বৈত অনুভূতি সব সময়ই থাকবে।

একজন সাবেক ফিফা রেফারি হিসেবে আমার বিশ্বাস, রেফারির ভুল হতে পারে, যেমন খেলোয়াড়ের পাশ দেওয়া ভুল হতে পারে, স্ট্রাইকার গোল মিস করতে পারেন কিংবা গোলরক্ষক বল ফসকাতে পারেন। পার্থক্য হলো, রেফারির ভুলটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।

সবশেষে একটি কথাই বলব, যদি জিকোর গোল বাতিলের সিদ্ধান্ত ফুটবলের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে সেটি যতই কষ্টের হোক, মেনে নেওয়াই খেলাটির সৌন্দর্য। আর যদি পর্যালোচনায় দেখা যায় সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল, তাহলে সেটিও মানবিক ভুলের অংশ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রেফারিংয়ের প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং প্রযুক্তিকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে ফুটবলকে আরও ন্যায়সঙ্গত করা। কারণ, বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে একটি সিদ্ধান্ত শুধু একটি ম্যাচ নয়, কখনো কখনো একটি জাতির স্বপ্নও বদলে দিতে পারে।