বিতর্কিত সিদ্ধান্ত মানেই ষড়যন্ত্র নয়

বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন কিছু ম্যাচ থাকে, যেগুলো শুধু ফলাফলের জন্য নয়, মানসিক শক্তির জন্যও বহু বছর মনে রাখা হয়। মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার জয় আমার কাছে ঠিক তেমনই একটি ম্যাচ। অবিশ্বাস্য, দুর্দান্ত, সফল প্রত্যাবর্তন কিংবা অকল্পনীয় এসব বিশেষণও যেন ম্যাচটির নাটকীয়তাকে পুরোপুরি প্রকাশ করতে পারে না। দুই গোলে পিছিয়ে থেকেও যেভাবে আর্জেন্টিনা ম্যাচে ফিরেছে, তা একজন চ্যাম্পিয়নের চরিত্রই তুলে ধরেছে।

ফুটবল খেলতে গিয়ে আমি একটি বিষয় শিখেছি, দুই গোলে পিছিয়ে পড়া যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন হলো বিশ্বাস ধরে রাখা। অনেক দলই এমন পরিস্থিতিতে ভেঙে পড়ে। খেলোয়াড়দের শরীরে আগে মন হেরে যায়। কিন্তু বড় দলগুলোর সঙ্গে সাধারণ দলের পার্থক্য এখানেই। তারা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস হারায় না।

আর্জেন্টিনা সেটিই করেছে। দুই গোল হজম করার পরও তাদের খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় হতাশা দেখিনি। তারা আতঙ্কিত হয়নি, তাড়াহুড়ো করেনি। বরং নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার চেষ্টা করেছে। ধীরে ধীরে বলের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, আক্রমণের গতি বাড়িয়েছে এবং প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করেছে। এটাই বড় দলের পরিচয়।

অধিনায়ক লিওনেল মেসির অভিজ্ঞতা এমন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কাজে এসেছে। তিনি শুধু একজন গোলদাতা নন, মাঠের ভেতরে একজন নেতা। যখন পুরো দল চাপে থাকে, তখন একজন নেতার শান্ত থাকা বাকিদেরও সাহস জোগায়। মেসি সেটাই করেছেন। নিজের ফুটবলীয় মেধা দিয়ে যেমন সুযোগ তৈরি করেছেন, তেমনি সতীর্থদের আত্মবিশ্বাসও ফিরিয়ে এনেছেন।

তবে এই জয় শুধু মেসির নয়। এটি পুরো দলের জয়। রক্ষণভাগ থেকে শুরু করে মাঝমাঠ, উইং এবং বদলি বেঞ্চ সবাই নিজেদের দায়িত্ব পালন করেছে। আধুনিক ফুটবলে একা কেউ ম্যাচ জেতাতে পারে না। দল হিসেবেই জিততে হয়, আর আর্জেন্টিনা সেটিরই প্রমাণ দিয়েছে।

অন্যদিকে মিসরের কথাও বলতে হবে। তারা হেরে গেলেও অসাধারণ একটি ম্যাচ খেলেছে। শুরুতে যেভাবে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছে, তাতে আর্জেন্টিনার মতো দলও চাপে পড়ে যায়। কিন্তু ফুটবলে সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো লিড ধরে রাখা। বিশেষ করে প্রতিপক্ষ যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন মানসিকতা নিয়ে ফিরে আসে।

তবে এই বিশ্বকাপ শুধু দুর্দান্ত ফুটবলের জন্য নয়, বিতর্কের জন্যও আলোচনায় রয়েছে। ভিএআরের সিদ্ধান্ত, গোল বাতিল, পেনাল্টির ব্যাখ্যা, অতিরিক্ত সময়ের দৈর্ঘ্য এসব নিয়ে প্রতিদিনই নতুন বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। প্রযুক্তি এসেছে ভুল কমানোর জন্য, কিন্তু বিতর্ক পুরোপুরি শেষ হয়নি। বরং এখন বিতর্কের ধরন বদলে গেছে।

ভিএআর ফুটবলে অনেক স্পষ্ট ভুল কমিয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তি ব্যবহার করবেন মানুষই। তাই ব্যাখ্যার জায়গায় মতভেদ থাকবেই। একই ঘটনা একজন রেফারি যেভাবে দেখবেন, অন্যজন হয়তো একটু ভিন্নভাবে দেখবেন। সেটিই ফুটবলের বাস্তবতা।

এই বিশ্বকাপে আরেকটি বিষয় চোখে পড়েছে, রেফারিরা এখন আইন প্রয়োগে অনেক বেশি কঠোর। আগে যেসব শারীরিক সংঘর্ষ খেলার অংশ হিসেবে ধরা হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেগুলো ফাউল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অফসাইডের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তির ব্যবহার সিদ্ধান্তকে আরও সূক্ষ্ম করেছে। ফলে খেলোয়াড়দেরও নিজেদের মানিয়ে নিতে হচ্ছে।

সমর্থকদেরও একটি বিষয় মনে রাখা উচিত। প্রতিটি বিতর্কিত সিদ্ধান্তই কোনো ষড়যন্ত্রের ফল নয়। অনেক সময় এটি আইনের ব্যাখ্যার বিষয়। আবেগ দিয়ে বিচার করলে একটি সিদ্ধান্ত ভুল মনে হতে পারে, কিন্তু আইন অনুযায়ী সেটি সঠিকও হতে পারে। তাই সমালোচনা অবশ্যই হবে, তবে সেটি যেন তথ্যভিত্তিক হয়। আমার কাছে এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় শিক্ষা একটাই চ্যাম্পিয়ন দল কখনো খুব সহজে হার মানে না। স্কোরবোর্ডে দুই গোল পিছিয়ে থাকলেও যদি বিশ্বাস অটুট থাকে, তাহলে ম্যাচে ফেরা সম্ভব। আর্জেন্টিনা সেটি দেখিয়েছে।

মিসরের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার এই জয় হয়তো অনেক দিন মনে রাখা হবে। শুধু নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের জন্য নয়, বরং এটি আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে শেষ বাঁশি বাজার আগে কোনো গল্পের শেষ লেখা যায় না। আর সেই কারণেই বিশ্বকাপ এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর ক্রীড়া আসর।