চট্টগ্রাম ও আশপাশের জেলার বিভিন্ন পুকুর ও দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতা কিংবা মৎস্য শিকারের নামে জুয়ার আসর পরিচালনার শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে চক্রটি সক্রিয় হয়ে উঠে। সৌখিন মৎস্য শিকারীদের ফাঁদে ফেলে প্রতিনিয়ত হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। আইনজ্ঞদের মতে, ১৮৬৭ সালের প্রকাশ্য জুয়া আইনের ৩ ও ৪ ধারা এবং দন্ডবিধির ২৯৪ ক ধারা মোতাবেক দন্ডনীয় অপরাধ হলেও চক্রটি অবলীলায় চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর পরিচালনা করে আসছে। ওই চক্রের প্রধান আবু তালেব। তার সিন্ডিকেটে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সদস্য রয়েছে অন্তত ১৮ থেকে ২০জন।
চট্টগ্রামের সিনিয়র মানবাধিকার আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান দেশ রুপান্তরকে বলেন, বড়শি প্রতিযোগিতার নামে লাখ লাখ টাকার টিকেট বিক্রি হয়। সংশ্লিষ্ট পুকুর বা দিঘিতে সর্বোচ্চ কত কেজি ওজনের মাছ আছে তা জানা যায় না। অথচ আগাম ফেসবুকে ৪০ কেজি ওজনের মাছ আছে বলেও প্রচার করা হচ্ছে। এটা স্পষ্ট প্রতারণা। দন্ডবিধি ৪২০ ধারার অপরাধ। তাছাড়া জুয়া হিসেবে পরিচালিত এসব কর্মকান্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এদিকে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে গড়ে উঠা চক্রের বিরুদ্ধে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন চন্দনাইশ উপজেলার মো. সাহিদ নামে এক ব্যক্তি। তার অভিযোগ, চক্রের প্রধান আবু তালেব চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী ডিটি রোডে ‘খালেক-মালেক বর্ষির দোকান’ নামে প্রতিষ্ঠানের আড়ালে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে দেশ জুড়ে ভয়ঙ্কর জুয়া আসর পরিচালনা করছে। মৎস্য শিকারের নামে মানুষদের লাখ লাখ টাকা পুরস্কারের ফাঁদে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
সাহিদের দাবি, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে ওই চক্রের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। জুয়ার আসর পরিচালনার চলমান অপতৎপরতার মধ্যে আগামীকাল শুক্রবার (১০ জুলাই) ২৪ ঘণ্টা ব্যাপী টাঙ্গাইল জেলা সদর লেক এ বিশাল এক বড়শি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে সৌখিন মৎস্য শিকারী সমিতি, টাঙ্গাইল। প্রতিযোগিতার প্রতি টিকিট বিক্রি করা হচ্ছে ১ লাখ পাঁচ হাজার টাকায়। ওই লেকে আসন রাখা হয়েছে ১০১টি। এই হিসেবে টিকেট বিক্রি করে চক্রটি আয় করেছে কোটি টাকার বেশি।
গত কিছুদিন ‘চট্টলা ফিশিং’ নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে ওই বড়শি প্রতিযোগিতার একটি লিফলেট প্রচার করা হচ্ছে। লিফলেটে দেখা যায়, অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকছেন মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।
এতে সভাপতিত্ব করবেন টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শরীফা হক। এটি উদ্বোধন করবেন টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার। সৌখিন মৎস্য শিকারী সমিতি, টাঙ্গাইল এর সাধারন সম্পাদক জনৈক আজগর আলী চেয়ারম্যান। বড়শি প্রতিযোগিতার প্রথম পুরস্কার ২৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড। মোট পুরস্কার ৮টি। সর্বনিম্ন অষ্টম পুরস্কার ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকার প্রাইজবন্ড।
চট্টগ্রাম, গাজীপুর, টঙ্গীর কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বড়শি প্রতিযোগিতার টিকেট বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ আছে, লাখ লাখ টাকার লোভের ফাঁদে ফেলে সৌখিন মৎস্য শিকারীদের নিঃস্ব করে ছাড়ছেন আলোচ্য আবু তালেব সিন্ডিকেট। টাঙ্গাইল সদর লেকে সর্বোচ্চ ৪০ কেজি ওজনের মাছ রয়েছে বলে একটি লিফলেট ফেসবুকে প্রচার করছে আবু তালেবের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘চট্টলা ফিশিং’। টাঙ্গাইল সদর লেক বড়শি প্রতিযোগিতায় লাখ লাখ টাকা পুরস্কারের অফার দিলেও অনেকেরই কাঙ্খিত মাছ না পেয়ে শুন্য হাতে ফিরে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
টাঙ্গাইল সদর লেকে আগামীকাল শুক্রবার আয়োজিত বড়শি প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে উপস্থিত থাকার বিষয়টি এই প্রতিবেদকের কাছ থেকে শুনে কিছুটা হতবাক টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকার। তিনি বৃহস্পতিবার দুপুরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সদর লেকে বড়শি প্রতিযোগতা অনুষ্ঠানে উদ্বোধক হিসেবে থাকার বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। যারা এটা করেছে তাদের জিজ্ঞেস করুন।
এছাড়া ফেসবুকে প্রচারিত লিফলেট অনুযায়ী বড়শি প্রতিযোগিতায় অনুষ্ঠানে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসক শরীফা হক সভাপতিত্ব করার কথা রয়েছে। এ বিষয়ে জানতে তার মোবাইল ফোনে বৃহস্পতিবার দুপুরে একাধিকবার কল করলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে ক্ষুদে বার্তা পাঠালেও তিনি জবাব দেননি। বক্তব্য জানতে বৃহস্পতিবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে সৌখিন মৎস্য শিকারী সমিতি, টাঙ্গাইলের সাধারণ সম্পাদক মো. আজগর আলী চেয়ারম্যানের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনিও ফোন রিসিভ করেননি।
স্থানীয় প্রশাসন সুত্রের অভিযোগ, চট্টগ্রামসহ সারা দেশে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর পরিচালনা চক্রের প্রধান আবুল তালেব। চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী ডিটি রোডে ‘খালেক-মালেক বড়শির দোকান’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী তিনি। তার সহযোগীরা হলেন, ডা. জাহাঙ্গীর, মো. রিয়াদ হোসেন, মো. জুয়েল, মো. মাসুক, শ্যামল স্বর্ণকার, মো. শহীদ, বাবু চৌধুরী, মাহাবুব আলম, মালেক কমিশনার, মানিক, শামসু সওদাগর, সোহেল, শওকত, হারেছ কোম্পানি, বদিউল আলম ও মো. করিম উদ্দিন। বড়শি প্রতিযোগীতার নামে লোকজনের সঙ্গে প্রতারণা এবং জুয়া পরিচালনা অভিযোগ অস্বীকার করে চক্রের প্রধান আবু তালেব বৃহস্পতিবার বেলা ২টার দিকে দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি কোনো বড়শি প্রতিযোগিতার আয়োজক নই। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পুকুর ও দিঘিতে অনুষ্ঠেয় বড়শি প্রতিযোগিতার টিকিট বিক্রি করি মাত্র। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা।
এদিকে আবু তালেব চক্রের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের দোহাজারী পৌরসভা এলাকায় হাজারী দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতার নামে জুয়ার আসর বন্ধে গত ১৩ জুন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমানের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছে স্থানীয়রা। অভিযোগে বলা হয় ২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি হাজারি দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলে যৌথবাহিনী তা বন্ধ করে দেয়। এরপরও চক্রটি চলতি বছরের গত ১৯ জুন একই দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতা আয়োজন করেছে। প্রতি টিকিটের মূল্য ছিল ৬৫ হাজার টাকা। আসন সংখ্যা ছিল ভিআইপিসহ ৮৬টি। টিকিট বিক্রি হয় ৬৫ হাজার টাকায়। এই হিসেবে ৮৬টি আসনে লেনদেন হয় প্রায় ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু ওই প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে বিপুল সংখ্যক মৎস্য শিকারী কাঙ্খিত মাছ পাননি বলেও রয়েছে।
বড়শি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার কথা জানিয়ে আবদুল আলী (ছদ্মনাম) নামে একজন বলেন, বড়শি দিয়ে মাছ ধরার নেশা আছে আমার। ১৫ লাখ টাকা পুরস্কারের লোভে ধার করে ৬৫ হাজার টাকায় একটি টিকেট কিনেছিলাম। মাছ পেয়েছিলাম সর্বোচ্চ দুই কেজি ওজনের কাতলা, রুই।
২০২৫ সালের ২ জানুয়ারি চন্দনাইশের হাজারি দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগিতা যৌথবাহিনী বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেন আয়োজকদের অন্যতম মো. করিম উদ্দিন। গত ১৯ জুন একই দিঘিতে বড়শি প্রতিযোগীতার আয়োজন করা সম্পর্কে তিনি বলেন, স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে আয়োজনটা করা হয়েছিল। এটা জুয়া নয়। হাজারি দিঘিতে গেল ১৯ জুন হয়ে যাওয়া বড়শি প্রতিযোগিতার অনুমতি নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুর রহমানকে বৃহস্পতিবার বিকেলে একাধিকবার মোবাইলে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
এদিকে একই চক্র আগামী ১৭ জুলাই একই জেলার (ফেনী) ট্রাঙ্ক রোড এলাকায় আয়োজন করা হয়েছে রাজাঝি’র দিঘিতে ‘আকর্ষনীয় বড়শি প্রতিযোগিতা-২০২৬’। এই প্রতিযোগিতায় ভিআইপিসহ আসন সংখ্যা ৮৭। প্রতি টিকিটের মূল্য ৭০ হাজার টাকা। প্রথম পুরস্কার ১৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ডসহ মোট ১৩টি পুরস্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরের পতেঙ্গা এলাকায় আয়োজন করা হয়েছিল বড়শি প্রতিযোগিতা। টিকিটের মূল্য ছিল ৭০ হাজার টাকা। আসন ছিল ভিআইপিসহ ৮৬টি। বড়শি প্রতিযোগিদের জন্য ছিল ১৫টি পুরস্কার। এর মধ্যে প্রথম পুরস্কার ১৫ লাখ টাকার প্রাইজবন্ড। এভাবে আলোচ্য চক্রটি বড়শি প্রতিযোগীতার নামে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে জুয়ার আসর পরিচালনা করে আসলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।