গতি আর মগজের লড়াই

ফুটবলের নতুন ‘দালি’

বিশ্বকাপে স্প্যানিশ ফুটবল আবর্তিত হচ্ছে তাদের সেই চেনা দর্শনেই। একচেটিয়া বল পজিশন আর নিখুঁত পাসিংয়ের এক ক্লান্তিকর জাল বোনা। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতিপক্ষের ডিবক্সের আশপাশে আক্রমণের দিক থেকে স্পেন বাকি দলগুলোর চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে। কিন্তু এই চিরন্তন টিকিটাকা ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো মাঠের দখল শতভাগ থাকলেও গোলমুখে এসে তারা প্রায়শই দিক হারিয়ে ফেলে। স্পেনের এই নিখুঁত কিন্তু কখনো কখনো একঘেয়ে ফুটবলে যে তরুণটি প্রথম বৈপ্লবিক ও ক্ষিপ্র পরিবর্তন এনেছেন, তিনি লামিন ইয়ামাল। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই বার্সেলোনা ফরোয়ার্ডের উপস্থিতি স্পেনের প্রথাগত আক্রমণে যোগ করেছে এক অভাবনীয় সতেজতা ও অননুমেয়তার রোমাঞ্চ।

স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তাকে লিওনেল মেসি বা ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে তুলনা করতে না চাইলেও, মাইকেলেঞ্জেলো বা সালভাদর দালির মতো বিশ্বখ্যাত শিল্পীদের কাতারে ফেলেছেন। কারণ, সাধারণের চোখে যা অবিশ্বাস্য, ইয়ামালের কাছে সেটাই স্বাভাবিক ফুটবলীয় পরিপক্বতা। লা মাসিয়ার এই গ্র্যাজুয়েট উইংয়ে বল পেলেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে দাঁড়ান। প্রতিপক্ষের ডিফেন্স লাইন ভেঙে ভেতরে ঢোকার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য। তবে এবারের আসরে চোট কাটিয়ে ফেরার পর তার ড্রিবলিংয়ের ধার দেখা গেলেও, গোলমুখে তার গোল করা বা গোল বানানোর কার্যকারিতা নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন রয়েছে। সৌদি আরবের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক গোল করে পেলের পর দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে উদ্বোধনী গোল করার কীর্তি গড়লেও, স্পেনের এই শ্রেষ্ঠত্বকে শিরোপায় রূপ দিতে হলে কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়ামালকে তার চেনা ছন্দে ফিরতেই হবে।

তবে মাঠের এই নিখুঁত ও হিসাবি ফুটবলার হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে তার শেকড় ও লড়াকু সংস্কৃতির এক অনন্য গল্প। তিনি উঠে এসেছেন কাতালুনিয়ার মাত্র ১২ হাজার জনসংখ্যার এক দরিদ্র এলাকা রোকোফান্দা থেকে, যেখানে প্রায় অর্ধেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। মরক্কো ও নিরক্ষীয় গিনি থেকে আসা অভিবাসী পিতা-মাতার এই সন্তান প্রতিবার গোল করার পর আঙুল দিয়ে ‘৩০৪’ চিহ্ন প্রদর্শন করেন, যা মূলত তার সেই অবহেলিত এলাকার পোস্টাল কোড। আরেকটি সংযোগ যেন নিয়তি; ২০০৭ সালে এই শিশু ইয়ামালকেই গোসল করিয়েছিলেন মেসি। আজ মেসির সেই ১৯ নম্বর জার্সিতেই বিশ্ব কাঁপানো এই তরুণ লা লিগা, এল ক্লাসিকো ও ইউরোর সর্বকনিষ্ঠ সব রেকর্ড নিজের পায়ে লুটিয়েছেন।

শৈশবের সেই প্লাজা হুয়ান স্কয়ারে বড়দের করা কঠিন সব ফাউল ও ট্যাকল সামলে বড় হওয়া এই কিশোর আজ পুরো স্পেনকে এক সুতোয় বেঁধেছেন। লা লিগার ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা, এল ক্লাসিকোর সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় কিংবা ইউরো ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ স্কোরার; সব রেকর্ডই ইতিমধ্যে তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে। তবে এবারের বিশ্বকাপে তার সামনে এখন বেলজিয়ামের এক কঠিন প্রাচীর। শেষ আটের এই মহা-লড়াইতে কাতালান এই ফুটবল জাদুকরের ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখছেন স্প্যানিশ সমর্থকরা। মাঝমাঠের পাসিং ফুটবলকে তিনি কীভাবে বেলজিয়ামের বক্সে গোলের রূপান্তর করেন, তার ওপরেই মূলত নির্ভর করছে স্পেনের সেমিফাইনালের টিকিট।

মাঝমাঠের দাবাড়ু

বেলজিয়ামের ফুটবল ইতিহাসের সেই সোনালি প্রজন্মের সোনালি অধ্যায় এখন অতীত। সেই এডেন হ্যাজার্ড কিংবা কেভিন ডি ব্রুইনাদের পর, রেড ডেভিলসদের মাঝমাঠের সবচেয়ে বড় ভরসা এবং নতুন কা-ারি হয়ে উঠেছেন ইউরি তিলেমানস। বয়স যখন মাত্র ১৬ বছর, তখনই অ্যান্ডারলেক্টের জার্সিতে চ্যাম্পিয়নস লিগে অভিষেক ঘটিয়ে বিশ্ব ফুটবলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন এই ‘ওয়ান্ডারকিড’। তিলেমানস হয়তো মাঠে চিতার মতো গতি কিংবা আদিম শারীরিক শক্তিতে প্রতিপক্ষকে চূর্ণ করার মতো ফুটবলার নন, কিন্তু তার মগজের ফুটবলীয় জ্যামিতি অনন্য। বল পায়ে পাওয়ার আগেই তিনি দাবাড়–র মতো ক্ষুরধার বুদ্ধিতে মাঠের পুরো ছবিটা মাথায় গেঁথে নিতে পারেন এবং সেই অনুযায়ী প্রতিপক্ষের ডিফেন্সে ফাটল ধরাতে নিখুঁত সব লাইন-ব্রেকিং পাস বাড়িয়ে দেন।

মাঠের এই ঠা-া মাথার কৌশলগত শ্রেষ্ঠত্বের কারণেই চলতি বিশ্বকাপে ফুটবল বিশ্লেষকরা বেলজিয়ামকে কোয়ার্টার ফাইনালে তোলার মূল কৃতিত্ব দিচ্ছেন এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারকে। বিশেষ করে নকআউট পর্বে সেনেগালের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা প্রদর্শন। দল যখন ২-০ ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে বিদায়ের শঙ্কায় কাঁপছিল, তখন অধিনায়ক তিলেমানস একাই পুরো দলের হাল ধরেন। মাঠের মধ্যেই সতীর্থ লিয়ান্দ্রো ট্রোসার্ডের সঙ্গে এক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল তার, কিন্তু সেই ক্ষোভ ও আবেগকে মাঠের জিঘাংসায় রূপান্তর করে ম্যাচের চিত্রই বদলে দেন এই কাপ্তান। শেষ মুহূর্তের নাটকীয় পেনাল্টিসহ চোখ ধাঁধানো জোড়া গোল করে দলকে এনে দেন এক অবিশ্বাস্য জয়। তবে তিলেমানস কেবল গোল স্কোরার নন, তিনি মাঝমাঠের এক অক্লান্ত পরিব্রাজক। সেনেগালের বিপক্ষে সেই মরণ-বাঁচন ম্যাচসহ চলতি আসরে এখন পর্যন্ত তিনি প্রায় ৬১.৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন, যা এই বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ দূরত্বের দৌড়বিদদের তালিকায় তাকে সবার ওপরে তুলে এনেছে। এই অবিশ্বাস্য ডেটা মূলত তার অনন্য ম্যাচ ফিটনেস ও দলের প্রতি শতভাগ দায়বদ্ধতারই অকাট্য প্রমাণ। মাঝমাঠের যেকোনো পজিশনে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার এই বহুমুখী ক্ষমতা বা ‘ম্যালিয়েবিলিটিই’ তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারে পরিণত করেছে। ক্লাব ফুটবলে কোচ উনাই এমেরির অধীনে যেমন তিনি ডিপ-লাইং প্লে-মেকার থেকে শুরু করে প্রগ্রেসিভ নম্বর টেন উভয় পজিশনেই সফল, ঠিক তেমনি বেলজিয়ামের ড্রেসিংরুমেও তিনি এখন তরুণ ও অভিজ্ঞদের মধ্যকার প্রধান সেতু। লেস্টার সিটির হয়ে দূরপাল্লার ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া শটে এফএ কাপ জেতানো সেই আইকনিক গোলটির মতোই, বক্সের বাইরে থেকে হুট করেই রকেট শটে বল জালে জড়ানোর এক সহজাত ক্ষমতা রয়েছে তিলেমানসের। আর এই বিশেষ অস্ত্রটিই কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের হাই-লাইন ডিফেন্সের বিরুদ্ধে বেলজিয়ামের কাউন্টার অ্যাটাকের প্রধান ভরসা হতে যাচ্ছে।