ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র ইসলাম প্রসঙ্গ

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ছিলেন একাধারে ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষক এবং ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম মনীষী। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদান তাকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে। তবে তার ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইসলামের প্রতি গভীর অনুরাগ, ধর্মচর্চায় আন্তরিকতা এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষা প্রচারে তার নিরলস প্রচেষ্টা।

পারিবারিকভাবে তিনি ছিলেন পীর গোরাচাঁদের খাদেম বংশের সন্তান। ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং সারাজীবন ইসলামের বিধান পালনে সচেষ্ট ছিলেন। ধর্মীয় অনুশাসন তার ব্যক্তিজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। কিন্তু তার ধর্মচর্চা ছিল না সংকীর্ণ বা গোঁড়ামিপূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত ইসলাম জ্ঞান, মানবতা, উদারতা ও নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মের নামে কূপমণ্ডূকতা বা বিভেদ সৃষ্টির পরিবর্তে তিনি মানুষকে জ্ঞানচর্চা ও সহনশীলতার পথে আহ্বান জানিয়েছেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি ইসলামি আলোচনায় অংশ নিতেন। অসংখ্য মানুষ তার জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে তার অনুসারী হয়েছিলেন। ইসলামের বিভিন্ন বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দিতে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেন। তার উল্লেখযোগ্য ইসলামি গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ইসলাম প্রসঙ্গ’, ‘টেইল ফ্রম দি কোরআন’ নবী করিম মুহাম্মাদ/মহানবী’, ‘মহররম শরীফ’ ইত্যাদি। এসব রচনায় তিনি ইসলামের ইতিহাস, বিশ্বাস, নবুয়ত ও ধর্মীয় মূল্যবোধকে যুক্তিনিষ্ঠ ও প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেছেন।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ তার ‘ইসলাম প্রসঙ্গ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘সৌর জগতের প্রতি লক্ষ্য কর, দেখ, গ্রহ-উপগ্রহগুলো কি সুনিয়মে কি সুশৃঙ্খলায় তাহাদের নিজ নিজ কক্ষে নিয়ত পরিভ্রমণ করিতেছে। পৃথিবীতে দেখ বৃষ্টি হইতেছে, নদী বহিতেছে, ফুল ফুটিতেছে, ফল ফলিতেছে। বৈজ্ঞানিক বলিবেন, এ সব মাধ্যাকর্ষণের ফল। জড়জগতে যেমন মাধ্যাকর্ষণ, মনোজগতেও সেইরূপ এক আকর্ষণ আছে। সেই আকর্ষণের ফলে বস্তুর প্রীতি, পতি পতœীর প্রেম, পিতামাতার বাৎসল্য, সন্তানের মাতৃপিতৃ ভক্তি, দাতার দাক্ষিণ্য, সজ্জনের দয়া। কী মধুর আকর্ষণ। একই পদার্থ পাইতেছে বিভিন্নরূপ। এই যে প্রাণের সহিত প্রাণের টান তাহার অফুরান্ত উৎস প্রেমময় আল্লাহ তা’আলার অনন্ত করুণা। আল্লাহর রসূল (স.) বলিয়াছেন যে, ‘আল্লাহ তা’আলার শত করুণার মধ্যে একটা মাত্র তিনি দানব, মানব, চতুষ্পদ ও হিংস্রজন্তুকে দান করিয়াছেন। তাহার ফলে এ সমস্ত প্রাণী পরস্পর দয়া ও অনুগ্রহ করে, তাহার ফলে বন্য পশু তাহার শাবককে ভালবাসে...।’ (হযরত আবু হুরায়রাহ্ (র.) হইতে বর্ণিত, বুখারী ও মুসলিম) আল্লাহ তা’আলার করুণা অনন্ত; তাহার দানও অনন্ত। ‘এবং যদি তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা কর, তোমরা তাহা গণিয়া শেষ করিতে পারিবে না।’ (কোরআন, সুরা ইব্রাহিম, রুকু, ৫ নহল, রুকু, ২) ধর্ম দয়াময় আল্লাহর শ্রেষ্ঠ দান। সেই ধর্মের উদ্দেশ্য, মানব আত্মাকে আল্লাহর প্রীতির জন্য বিসর্জন দিয়া সমগ্র জগতে প্রেম ও শান্তির স্বর্গরাজ্য স্থাপন করিবে।’

তিনি একই গ্রন্থের অন্য এক স্থানে লিখেছেন, ‘বর্তমান সময়ে যখন একে একে মোসলেম রাজ্যগুলো মুছিয়া যাইতেছে, অশ্রু-ভারাক্রান্ত নেত্রে অতীতের দিকে চাহিয়া মহাকবির ভাষায় বলিয়া উঠিতে হয় কুসুম দাম সজ্জিত, দীপাবলী তেজে/ উজ্জ্বলিত নাট্যশালা সম রে আছিল/ এ মোর সুন্দর পুরী, কিন্তু একে একে/ শুকাইছে ফুল এবে, নিভিছে দেউটি/ নীরব রবাব, বীণা, মুরজ, মুরলী। পশ্চাতে উজ্জ্বল গৌরবময় অতীত, সম্মুখে কুহেলিকাচ্ছন্ন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। এই উভয়ের সন্ধিস্থলে কঠোর বর্তমানের ওপর দাঁড়াইয়া অতর্কিত ভাবে মুখ হইতে এই প্রশ্ন বাহির হইয়া পড়ে

আমাদের কি কিছু আশা ভরসা আছে? জগতের অনেক অসত্য, অর্দ্ধ সভ্য জাতি পর্যন্ত দ্রুতবেগে উন্নতির দিকে ধাইয়া চলিল। কেবল কি মুসলমান, বিশেষ বাংলার মুসলমান, জড়ের ন্যায় অচল থাকিবে? তাহার কি কিছু আশা ভরসা নাই? শুধু সে কি জাতীয়-জীবন ঘুচে পরাজিত, লাঞ্ছিত, দলিত মথিত হইয়া তিরোহিত হইবার প্রতীক্ষায় আছে? ভাবিবার কথা বটে!’

বাংলা ভাষার প্রতি তার অকৃত্রিম ভালোবাসাও ছিল তার ইসলামি চিন্তারই অংশ। তিনি মনে করতেন, মাতৃভাষার বিকাশ মানুষের জ্ঞানচর্চা ও আত্মপরিচয় গঠনের অন্যতম ভিত্তি। তাই তিনি বাংলা ভাষায় ইসলামি সাহিত্যচর্চাকে উৎসাহিত করেন এবং মুসলিম সমাজকে মাতৃভাষায় জ্ঞানচর্চার আহ্বান জানান। তার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’ বাংলা ভাষায় মুসলিম সাহিত্য বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রমাণ করে গেছেন, একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মনিষ্ঠ মুসলিম, খাঁটি বাঙালি এবং বিশ্বমানের জ্ঞানসাধক হতে পারেন।