আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। এই আদেশই আপনাদের করা হয়েছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজেদের আমলকে একনিষ্ঠ করুন। এই ব্যাপারে আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহর সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। তার কাছেই সবার প্রত্যাবর্তন। কথা, কাজ ও জীবনের প্রতিটি অবস্থায় সত্যনিষ্ঠাকে অবলম্বন করুন, যাতে আপনারা সফল হতে পারেন।
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে ইমানদাররা! আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করো এবং মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আলে ইমরান ১০২)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালককে ভয় করো, যিনি তোমাদের এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাদের উভয়ের মাধ্যমে বহু নর-নারী পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আর আল্লাহকে ভয় করো, যার নামে তোমরা পরস্পরের কাছে অধিকার দাবি করো এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের ওপর সর্বদা পর্যবেক্ষক।’ (সুরা নিসা ১)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘হে ইমানদাররা! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক ও সত্য কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের আমলগুলো সংশোধন করে দেবেন এবং তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন। আর যে আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহান সফলতা অর্জন করে।’ (সুরা আহজাব ৭০-৭১)
আপনারা হিসাবের দিনের আগে নিজেদের হিসাব গ্রহণ করুন। আপনাদের সামনে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করা হয়, তা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। কেননা মহান আল্লাহ তাদের প্রশংসা করেছেন, যারা সেই সম্পর্ক বজায় রাখে, যা রক্ষা করার নির্দেশ তিনি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘যারা আল্লাহর অঙ্গীকার পূরণ করে এবং অঙ্গীকার ভঙ্গ করে না। যারা সেই সম্পর্ক অটুট রাখে, যা বজায় রাখার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন। তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে এবং কঠিন হিসাবের আশঙ্কা করে। যারা তাদের প্রতিপালকের সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ করে, নামাজ আদায় করে এবং আমি তাদের যে রিজিক দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে। আর যারা উত্তম কাজের মাধ্যমে মন্দকে প্রতিহত করে, তাদের জন্যই রয়েছে পরকালের শুভ পরিণাম।’ (সুরা রাদ ২০-২২)
হে আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহ আপনাদের জান্নাতের দিকে আহ্বান করেছেন। সেই আহ্বানে সাড়া দানকারীরা কোথায়? তিনি এসব আমল ও আমলকারীর প্রশংসা করেছেন। আমলকারীরা কোথায়?
জেনে রাখুন, যারা সেই সম্পর্ক বজায় রাখে, যা রক্ষা করার নির্দেশ আল্লাহ দিয়েছেন, তারাই প্রকৃত অর্থে আল্লাহর প্রতি ইমানদার। তারা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। তারা সৎকাজ সম্পাদন করে। তারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে। কঠিন হিসাবের আশঙ্কা করে এবং সতর্ক থাকে।
তারা মহান আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী ইবাদত করে, নিজেদের নফসকে ধৈর্যের ওপর অবিচল রাখে এবং হারাম কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে। তারা আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। দরিদ্র, প্রতিবেশী ও এতিমদের প্রতি সদাচরণ করে। পিতা-মাতার সঙ্গে উত্তম আচরণ করে। অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে দূরে থাকে। সৎকাজের আদেশ দেয় এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করে। তারা আল্লাহকে অধিক পরিমাণে স্মরণ করে। আর আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ।
হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। নিজেদের জন্য এমন কল্যাণ আগে পাঠিয়ে দিন, যা আপনারা পরকালে লাভ করবেন। মৃত্যুর কারণে সুযোগ হারানোর আফসোস থেকে সতর্ক থাকুন। পরবর্তী জীবনের জন্য আগেই আমল করুন। আপনারা তাদের মতো হবেন না, যারা চলে গেছে, অথচ তাদের আমলনামায় গুনাহে কালিমা রয়ে রয়েছে। দীর্ঘ আশা ও কালক্ষেপণ তাদের প্রতারিত করেছে। যদি তারা প্রতিদানের ব্যাপারে সচেতন থাকত, তবে অবশ্যই তার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করত।
হে মানব জাতি! আপনারা মহান আল্লাহকে যথাযথভাবে ভয় করুন। অধিক পরিমাণে জিকির ও শুকরিয়ার মাধ্যমে প্রতিপালকের সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করুন। অধিক পরিমাণে সদকা করুন। তাহলে আপনারা রিজিকপ্রাপ্ত হবেন, সাহায্য লাভ করবেন এবং অভাবমুক্ত হবেন। দুনিয়ার জীবনে আখেরাতের জন্য পাথেয় সংগ্রহ করুন। সুস্থতা থেকে অসুস্থতার জন্য, অবসর থেকে ব্যস্ততার জন্য, সম্পদ থেকে দারিদ্র্যের জন্য, নিরাপত্তা থেকে ভয়ের সময়ের জন্য এবং আনন্দের সময় থেকে দুঃখের সময়ের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করুন। কেননা সব অবস্থা এক রকম থাকে না। বহু পরিস্থিতি তার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থায় পরিবর্তিত হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর এ দিনগুলো আমি মানুষের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তন করে থাকি।’ (সুরা আলে ইমরান ১৪০)
আল্লাহর কাছে সাহায্য, হেদায়াত, তৌফিক এবং সঠিক পথে অবিচল থাকার প্রার্থনা করছি। কারণ সব বিষয় তারই হাতে। বান্দার হাতে কেবল উপায়-উপকরণ অবলম্বন করা ছাড়া আর কিছুই নেই। অতএব, আপনারা অধিক পরিমাণে তার কাছে দোয়া করুন, ক্ষমা প্রার্থনা করুন, তারই আশ্রয় গ্রহণ করুন এবং তার আনুগত্য ও তার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্যের মাধ্যমে তার নৈকট্য অর্জন করুন।
হে মুসলিমরা! মহান আল্লাহ আমাদের এমন একটি বিষয়ে আদেশ করেছেন, যার সূচনা তিনি নিজেই করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তার ফেরেশতারা নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে ইমানদাররা, তোমরাও তার প্রতি দরুদ পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম পেশ করো।’ (সুরা আহজাব ৫৬) এখানে নবীজির প্রতি মহান আল্লাহর দরুদ পাঠ করার অর্থ হলো, আল্লাহ নবীজির প্রতি অনুগ্রহ করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করবেন।’ (সহিহ মুসলিম)
তিনি ছিলেন মানুষের মধ্যে সর্বাধিক বিনয়ী এবং সর্বাবস্থায় মানুষের জন্য সর্বাধিক উপকারী। তিনি হালাল খাদ্য থেকে যা উপস্থিত থাকত তাই গ্রহণ করতেন। নিজের প্রয়োজনের ওপর অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি ও পরিবারের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিতেন। যা উপস্থিত থাকত, তা কখনো ফিরিয়ে দিতেন না এবং যা উপস্থিত থাকত না, তা সংগ্রহের জন্য কষ্ট করতেন না।
হে আল্লাহ! আপনার বান্দা ও রাসুল, আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন। তাকে প্রশংসিত মর্যাদা দান করুন।
হে আল্লাহ! আবু বকর, ওমর, ওসমান ও আলী (রা.)-এর প্রতি সন্তুষ্ট থাকুন। আপনার নবীর বাকি সব সাহাবির প্রতি, তার পবিত্র ও পুণ্যময় আহলে বাইতের প্রতি এবং কেয়ামত পর্যন্ত যারা উত্তমভাবে তাদের অনুসরণ করবে, তাদের সবার প্রতিও সন্তুষ্ট থাকুন। আপনার অনুগ্রহ ও দয়ার মাধ্যমে আমাদের প্রতিও সন্তুষ্ট থাকুন।
হে আল্লাহ! আপনি ইসলামকে মর্যাদাবান করুন। মুসলমানদের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত করুন। মুসলিম শাসকদের আপনার কিতাব এবং আপনার নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাহ অনুযায়ী পরিচালিত হওয়ার তৌফিক দান করুন। সীমান্তে প্রহরারত আমাদের সৈনিকদের হেফাজত করুন। তাদের সংকল্প দৃঢ় করুন।
হে আল্লাহ! সকল মুমিন নর-নারী, মুসলিম নর-নারী, জীবিত ও মৃত সবাইকে ক্ষমা করে দিন। নিশ্চয়ই আপনি সর্বশ্রোতা, দোয়া কবুলকারী।
হে আল্লাহর বান্দারা! আপনারা অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করুন। কেননা এর মাধ্যমেই অন্তর জীবিত হয় এবং এর মাধ্যমেই গুনাহ ক্ষমা করা হয়। ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর স্মরণই সর্বশ্রেষ্ঠ। আল্লাহ জানেন, তোমরা যা করো।’ (সুরা আনকাবুত ৪৫)
৩ জুলাই শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত
জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন
মুফতি আতিকুর রহমান