ট্রাম্পের ‘ব্যাটল অব হরমুজ’

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে তেহরানের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে গত মঙ্গলবার থেকে ইরানের ১৭০টি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রতিক্রিয়ায় কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনায় ব্যাপক মাত্রায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিয়েছে তেহরান। দুই পক্ষ নতুন করে সংঘাতে জড়ানোয় উপসাগরীয় অঞ্চলে আবারও সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর ব্যাপক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পর হোয়াইট হাউজ এখন হরমুজ প্রণালি ঘিরে এক দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সংঘাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের বরাতে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে এই নতুন সামরিক অভিযানের মেয়াদ ও তীব্রতা কতখানি হবে, তা সম্পূর্ণ নির্ভর করছে তেহরানের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ট্রাম্প প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে ইরান হামলা অব্যাহত রাখবে কি না, তার ওপর ভিত্তি করে এই উত্তেজনা এক-দুই দিন, এক সপ্তাহ কিংবা এক মাসও স্থায়ী হতে পারে।

যে যুদ্ধের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং দেশটির অবশিষ্ট পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা, তা এখন বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ নিয়ন্ত্রণের এক অনির্দিষ্টকালের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। কূটনৈতিক আলোচনা বর্তমানে স্থবির হয়ে পড়ায় ট্রাম্পের কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে ‘সামরিক চাপ’। বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানি হামলার জেরে দুপক্ষের মধ্যে গোলাগুলির পর গত বুধবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন যে, সমঝোতা স্মারকের অধীনে থাকা ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি এখন ‘শেষ’। এরপরই যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছে দ্বিতীয় দফায় হামলা চালায়, যার মধ্যে গত কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইরানের ভেতরের কিছু অবকাঠামোও ছিল। জবাবে ইরান কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার দাবিতে অনড় থাকার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে এই হামলার পরপরই ট্রাম্প এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের বলেন, ইরানি কর্মকর্তারা ‘কিছুক্ষণ আগে ফোন করেছিলেন’ এবং তারা ‘একটি চুক্তি করতে চান’। ট্রাম্প ঠিক কোন ফোনের কথা বলছেন তা স্পষ্ট নয় এবং ইরানি কর্মকর্তারাও তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি যোগাযোগের কোনো তথ্য নিশ্চিত করেননি। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমি জানি না তারা চুক্তির যোগ্য কি না। তারা চুক্তি মেনে চলবে কি না, তা-ও আমি জানি না। সত্যি বলতে, ওরা একপ্রকার পাগল’।

মূলত বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে স্থিতিশীল রাখতেই হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজের অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। আর ইরানের জন্য যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাই মূল উদ্দেশ্য। এই বিষয়টিই ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের মূল শর্ত, আর এর ধারাগুলোর ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণেই চুক্তিটি এখন ভেস্তে যাচ্ছে। চুক্তি অনুযায়ী ইরানকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজের নিরাপদ চলাচলের অনুমতি দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সই করার পরপরই ইরানি কর্মকর্তারা অভিযোগ তোলেন যে, তেহরানের অনুমতি ছাড়া ওমান উপকূলের কাছাকাছি দক্ষিণ লেন দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। সূত্রের বরাতে অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মনে করছেন হোয়াইট হাউজ এখন হামলা বাড়ানোর ক্ষেত্রে নিজেদের সুবিধাজনক অবস্থানে দেখছে। কারণ সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত তেল ট্যাংকার এই প্রণালি দিয়ে পার হতে পেরেছে। এর ফলে নতুন করে সংঘাত শুরু হলেও তেলের দাম হঠাৎ আকাশচুম্বী হবে না বলে প্রশাসন আশ্বস্ত হয়েছে।

এক কর্মকর্তার দাবি, ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের একাংশের ক্ষোভ থেকেই এই বর্তমান উত্তেজনার সৃষ্টি। তারা মনে করে, এই সমঝোতা স্মারক তেহরানের জন্য কোনো বাস্তব সুবিধা বয়ে আনেনি। ওমান উপকূলের দক্ষিণ রুট দিয়ে শত শত জাহাজ পার হওয়ায় হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ কমছিল। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেন অনুমোদন না করায় এবং দেশগুলো সাময়িক ছাড়ের ওপর নির্ভর করতে রাজি না হওয়ায় ইরান তেল বিক্রি করতে সমস্যায় পড়ছিল। তাছাড়া চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরান এখনো পারমাণবিক ইস্যুতে পদক্ষেপ না নেওয়ায়, তাদের অবরুদ্ধ থাকা কোনো তহবিলও মুক্তি পায়নি।