চিনির পাহাড়ে পিঁপলুর অভিযান

এক বনে বাস করত একটা ছোট্ট পিঁপড়ে। নাম তার পিঁপলু। সেই ছোটবেলা থেকে একটা গল্পই শুনে সে বড় হয়েছে। বনের শেষ প্রান্তে নাকি আছে বিশাল এক চিনির পাহাড়। কিন্তু সেই পাহাড়ে খুব কম পিঁপড়েই যেতে পারে। বনের কঠিন পথ আর নানা বিপদ পেরিয়ে তবেই নাকি পৌঁছানো যায় সেই চিনির পাহাড়ে।

অনেক ভেবেচিন্তে এক দুঃসাহসিক অভিযানে যাওয়ার সিদ্বান্ত নেয় পিঁপলু। এসব শুনে তো পাড়া প্রতিবেশী আর বন্ধুরা ওকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল ‘পিঁপলু, তোমার তো সাহস কম না! পথে অনেক বিপদ হতে পারে।’

এসব কথা হেসেই উড়িয়ে দিল পিঁপলু। এক চমৎকার সকালে ব্যাগে সব গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ল ও। ওকে বিদায় জানাতে হাজির হয়েছিল বনের সব পিঁপড়ে। সবাইকে বিদায় জানিয়ে অভিযানে নেমে পড়ল পিঁপলু।

বেশ খানিকটা হাঁটার পর বনের চারপাশটা একেবারেই নতুন লাগল তার। আসলে নিজের বাসা ছেড়ে এতটা দূর কখনো সে আসেনি। বন্ধুরা ঠিকই বলেছিল, যাত্রাপথটা আসলেই কঠিন।

চারদিকটা বেশ ঘন। বনের ঘাসগুলোকে মনে হচ্ছিল বিশাল সব গাছ। হঠাৎ করেই শুরু হলো বৃষ্টি। বৃষ্টির একেকটি ফোঁটাকে মনে হচ্ছিল কামানের গোলা। ওরে বাবা, বৃষ্টির একটা ফোঁটাই যদি মাথায় পড়ে তাহলে তো ভারি বিপদ হবে। কোনো রকমভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে আশ্রয় নিল এক ব্যাঙের ছাতার নিচে। যাক প্রাণটা বাঁচল বোধহয়!

এটা ভাবতে না ভাবতেই শোনা গেল পানির গর্জন। বৃষ্টির পানিতে বনে এলো বন্যা। এখন উপায়? পিঁপলু বুদ্ধি করে গাছের পাতা দিয়ে বানিয়ে ফেলল এক নৌকা। আর ছোট এক কাঠিকে বানাল বৈঠা।

অবশেষে সেই নৌকা বেয়ে নিরাপদেই তীরে পৌঁছাল পিঁপলু। তীরে পৌঁছে এবার সেই চিনির পাহাড়ের খোঁজে লেগে গেল। পথের দিশা পেতে কথা বলল এক রঙিন প্রজাপতির সঙ্গে।

প্রজাপতি মশাই বলল, ‘আমি তো ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াই। ফুলে থাকা মধু খাই। চিনির খোঁজ তো রাখি না বাপু।’

মন খারাপ করে আবার হাঁটতে থাকে পিঁপলু। খানিক হাঁটতেই চোখে পড়ল এক গুবরে পোকা। দারুণ ব্যস্ত। গোলাকার এক পিন্ড ঠেলে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।

তাকে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিল, ‘নিজের কাজ নিয়েই সারা দিন ব্যস্ত থাকি। চিনির পাহাড়ের বিষয়ে কিছু জানি না। তুমি বরং মৌমাছির কাছে খোঁজ করো। ও মনে হয় বলতে পারবে। সারা দিন দেখি বনের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে খালি উড়ে বেড়ায়। কী যে কাজ করে কিছুই বুঝি না।’

বললেই কী আর মৌমাছির সঙ্গে কথা বলা যায়! সাঁই সাঁই করে পিঁপলুর মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যেতে দেখা গেল মৌমাছিকে। কিন্তু কথা বলার জন্য একটু ফুরসত হচ্ছে না ওর। অবশেষে অনেক ডাকাডাকির পর নিচে তাকাল মৌমাছি।

‘আচ্ছা মৌমাছি মশাই, চিনির পাহাড়টা কোথায় বলতে পারো?’

‘ওই যে দূরে বনের শেষ প্রান্তে। ওখানেই আছে চিনির পাহাড়।’

ধন্যবাদ জানিয়ে মৌমাছির বাতলে দেওয়া সেই পথেই হাঁটতে থাকে পিঁপলু। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে সে পৌঁছে যায় এক চিনির কারখানায়। ওখানে আখ থেকে তৈরি করা হয় চিনি। কারখানায় স্তূপ করে রাখা আছে চিনি। পিঁপড়ে বলে ওটাই পিঁপলুর কাছে চিনির পাহাড় বলে মনে হয়।

এত কষ্ট করে এসে চিনির পাহাড়ের চূড়ায় না চড়লে হয়? এবার চিনির পাহাড়ে ওঠা শুরু করল পিঁপলু।

চূড়ায় উঠে ক্লান্তিতে চোখ বুজে এলো ওর। খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে এবার চিনি খাওয়া শুরু করল পিঁপলু। পেট ভরে চিনি খেয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো ও। তার আগে বন্ধুদের জন্য ব্যাগ ভর্তি করে চিনি নিতে ভোলেনি কিন্তু পিঁপলু।

বাড়ি পৌঁছাতেই ওকে অভিনন্দন জানাতে এলো বনের সব পিঁপড়ে।

ওদের শোনাল নিজের সেই দুঃসাহসিক অভিযানের গল্প।

ধীরে ধীরে পিঁপলুর সেই অভিযান পরিণত হয় এক কিংবদন্তিতে।

ঘুরে ঘুরে পিঁপড়েদের বাচ্চা-কাচ্চদের সাহস আর স্বপ্ন দেখার উৎসাহ দিতে থাকে পিঁপলু।

সবাইকে বলতে থাকে, নিজের স্বপ্ন সফল করতে হলে সাহস করে কাজে নেমে পড়তে হবে। তাহলেই আসবে সফলতা।