অভিন্ন প্রশ্নপত্রে প্রকৃতির বাধা

এগারো বছর পর চালু হওয়া অভিন্ন প্রশ্নপত্রের পরীক্ষায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে বন্যা। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষার্থীরা। ইতিমধ্যে গত ৮ জুলাইয়ের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা স্থগিতের পর গতকাল ১১ জুলাই তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষাও স্থগিত করা হয়েছিল। কিন্তু তারপরও বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় আগামী ১৬ জুলাই পর্যন্ত চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা স্থগিত রাখার নির্দেশনা দিয়েছে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড।

এ বিষয়ে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে ও বিভিন্ন বোর্ড চেয়ারম্যানদের নিয়ে অনুষ্ঠিত জুম মিটিংয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা ১৬ জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন পাঁচ জেলায় (চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি) বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ও পাহাড়ধসের কারণে যাতায়াত ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে এসব এলাকার অনেক কেন্দ্র পরীক্ষা নেওয়ার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে বলে আমরা পরীক্ষা স্থগিত রাখতে সম্মত হয়েছি।’

গত ৭ দিন ধরে টানা বর্ষণে ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাহাড়ধসে ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বন্যার পানিতে ভেসে গিয়ে মারা গেছে আরও দুজন। শুধু মৃত্যুই নয় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী, পটিয়া, চন্দনাইশ প্রভৃতি এলাকায় বন্যা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন এলাকায় ঘরের টিনের চাল পর্যন্ত পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এসব এলাকার কেন্দ্রের অবস্থা জানতে কথা হয় উত্তর সাতকানিয়া জাফর আহমদ চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ নিলু মণি শর্মার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার কলেজে ১ হাজার ৬৪ পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। কিন্তু কেন্দ্রের ভেতরে পানি না থাকলেও কেন্দ্রে আসার রাস্তা কোমর সমান পানির নিচে। এতে গাড়ি চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। তাই এ অবস্থায় পরীক্ষা পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে রিপোর্ট দিয়েছি।

এই রিপোর্টের বিষয়ে কথা হয় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, জেলার আওতাধীন বন্যাকবলিত এলাকাগুলোর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি প্রবেশ করে শ্রেণিকক্ষের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে। অনেক কলেজের ল্যাবরেটরি কক্ষগুলোর উপকরণ নষ্ট হয়ে গেছে। পরীক্ষাকেন্দ্রের টেবিল, চেয়ার ও বেঞ্চ পরিষ্কার করতে আরও প্রায় এক সপ্তাহ সময় লাগবে বলে কেন্দ্র সচিবরা জানিয়েছে। তারপরও উপজেলা নির্বাহী অফিসার হয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক থেকে আমাদের কাছে লিখিত রিপোর্ট আসায় সেই অনুযায়ী ১৬ জুলাই পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

বিকল্প প্রশ্নপত্রে হবে স্থগিত বিষয়ের পরীক্ষাগুলো : যেহেতু এবারই প্রথমবারের মতো সারাদেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে; তাই একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের জন্য কি পৃথক প্রশ্নপত্র প্রিন্ট করা হবে? এ ছাড়া এবার ছাপানো দুই সেট প্রশ্নপত্রই কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে কিংবা ট্রেজারিতে জমা রয়েছে। এ বিষয়ে গতকাল শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সংবাদকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোনো অঞ্চলের পরীক্ষা বিঘিœত হলে অন্য প্রশ্নপত্রে পরে সেই পরীক্ষা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে এবার অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা শুরু হলেও দুর্যোগকালীন পরিস্থিতির জন্য প্রতিটি বিষয়ে বিকল্প আরও তিন সেট প্রশ্নপত্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ফলে স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো পরবর্তীতে এই বিকল্প প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান, ‘এবার যে দুই সেট প্রশ্নপত্র ছাপানো হয়েছে সেগুলো দিয়ে আর পরীক্ষা নেওয়া হবে না। আমাদের কাছে প্রশ্নপত্র জমা রয়েছে। জমা থাকা প্রশ্নপত্র থেকে ছাপিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে। তবে এটা ঠিক সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু প্রাকৃতিক কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে।’

নতুন প্রশ্নপত্র বিষয়ে চট্টগ্রামের অন্যতম সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইস্পাহানি পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের রেক্টর লে. কর্নেল (অব.) মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ। দেশের সব শিক্ষার্থীর মেধা যাচাইয়ের জন্য একই ধরনের প্রশ্নে পরীক্ষা নেওয়ার উদ্যোগটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ। এখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে বন্যা দেখা দেওয়ায় হয়তো ভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া হবে, তারপরও এই প্রশ্নগুলোও কেন্দ্রীয়ভাবে চূড়ান্ত করে রাখা হয়েছে, তাই কোনো সমস্যা হবে না।’

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরীক্ষা হয়তো দীর্ঘায়িত হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে মনোযোগ ধরে রাখতে পারে সেজন্য শিক্ষক ও অভিভাবকদের পরীক্ষার্থীদের সঠিকভাবে কাউন্সিলিং করতে হবে।

স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো : বন্যার কারণে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডে গত ৮ জুলাইয়ের ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র ও ১১ জুলাইয়ের তথ্য ও প্রযুক্তি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। এ ছাড়া আগামীকাল ১৩ জুলাই রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্র, হিসাববিজ্ঞান প্রথম পত্র ও যুক্তিবিদ্যা প্রথম পত্র। ১৫ জুলাই রয়েছে পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র, হিসাববিজ্ঞান দ্বিতীয় পত্র ও যুক্তিবিদ্যা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা। ১৬ জুলাই রয়েছে ভূগোল প্রথম পত্রের পরীক্ষা। এসব পরীক্ষা স্থগিত থাকবে এবং ১৮ জুলাই থেকে যথারীতি পূর্বঘোষিত রুটিন অনুযায়ী পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে।

বন্যার উন্নতি ঘটবে : গত শুক্রবার থেকে চট্টগ্রামসহ দেশের পূর্বাঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে এসেছে। আগামী কয়েকদিন আরও কমে আসবে বলে জানান আবহাওয়া অধিদপ্তরের ফোকাস্টিং কর্মকর্তা ড. ওমর ফারুক। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত সপ্তাহের তুলনায় বৃষ্টিপাত অনেক কমে এসেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাঙ্গামাটিতে ৯০, বান্দরবানে ৮৮, চট্টগ্রামের আমবাগানে ১০৬, কক্সবাজারে ৫৫ ও সীতাকু-ে ৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। তবে আজ রবিবার থেকে তা আরও কমে আসবে।

বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান বলেন, ‘দেশের পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকায় বৃষ্টিপাত কমে আসায় এবং উজানে (ভারতীয় অংশে) বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার কথা।’

উল্লেখ্য, গত ২ জুলাই থেকে সারা দেশে অভিন্ন প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়েছে। দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডের ৯২ হাজার ৯০৫ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দিচ্ছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বোর্ডের ১১৪টি কেন্দ্রে ৯৯ হাজার ৬৮৮ জন পরীক্ষা দিচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলার ৬৮ কেন্দ্রে ৭০ হাজার ৯৭৪, কক্সবাজারের ১৮টি কেন্দ্রে ১২ হাজার ২৫৫, রাঙ্গামাটি জেলার ১০টি কেন্দ্রে ৫ হাজার ৪৩৯, খাগড়াছড়ি জেলার ১০টি কেন্দ্রে ৭ হাজার ৩৫৩ ও বান্দরবান জেলার ৮টি কেন্দ্রে ৩ হাজার ৬৬৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে।