নির্জনা খুন বাবার হাতেই

খুলনায় বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধার হওয়া সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৭) হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে পুলিশ। পরিবারের দাবি ছিল, বিয়ের পর স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন নির্জনা। তবে পুলিশের দাবি, তাদের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র। জন্মদাতা বাবার হাতেই খুন হয়েছে ওই শিক্ষার্থী!

কথার অবাধ্য হওয়ায় ক্ষোভের বশে নেশাগ্রস্ত বাবা আলিম হোসেন আকাশ তার মাথার পেছনে আঘাত করলে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় নির্জনার। পরে মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নিরালা এলাকায় ফেলে দেওয়া হয়।

গতকাল শনিবার সকালে খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সদরদপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান এসব তথ্য জানান।

তিনি বলেন, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং নিহতের মা সীমা আক্তারের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি অনুযায়ী, পারিবারিক কলহের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। ঘটনার পর আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে মরদেহ বস্তাবন্দি করে নিরালা এলাকার একটি ভবনের সামনে ফেলে রাখা হয়।

পুলিশ জানায়, শুক্রবার খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিমের আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন নির্জনার মা সীমা আক্তার। পরে তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়।

আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সীমা আক্তার বলেন, অল্প বয়সে পরপর দুটি বিয়ে এবং প্রায়ই পরিবারের কথা অমান্য করে বাড়ির বাইরে অবস্থান করায় নির্জনার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন তার বাবা আলিম হোসেন আকাশ। গত বুধবার সন্ধ্যায় সোনাডাঙ্গার বসুপাড়ার বাসায় এ নিয়ে আবারও পারিবারিক বিরোধ শুরু হয়। একপর্যায়ে রাগের মাথায় আলিম হোসেন আকাশ নির্জনার মাথার পেছনে জোরে আঘাত করেন। এতে সে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যায়।

এরপর মরদেহ গোপন করতে সেটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে নিরালার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর রোডের একটি সাততলা ভবনের সামনে ফেলে রেখে পালিয়ে যান তিনি।

খুলনা সদর থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. আ. সাত্তার জানান, নিহতের মায়ের জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আলিম হোসেন আকাশকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

গত বুধবার রাত ১০টার দিকে নিরালা এলাকার প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার একটি ভবনের সামনে প্লাস্টিকের বস্তাবন্দি অবস্থায় নির্জনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মরদেহ খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।

পরদিন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মরদেহের ছবি দেখে হাসপাতালে গিয়ে মেয়েকে শনাক্ত করেন তার মা। নির্জনা নগরীর সোনাডাঙ্গা মডেল থানার বসুপাড়া বাঁশতলা এলাকার বাসিন্দা এবং সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রথমে দাবি করা হয়েছিল, চলতি বছরের ২১ এপ্রিল নির্জনার বিয়ে হয় এবং তার স্বামী তাকে হত্যা করে থাকতে পারেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু হলেও ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, উদ্ধার হওয়া আলামত, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণে পুলিশের সন্দেহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে পরিবারের সদস্যরাই।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের একপর্যায়ে হত্যার প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসে। এরপর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতেও সেই তথ্যেরই প্রতিফলন ঘটে। হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।