আশ্রয় খুঁজছে আশ্রয়কেন্দ্র

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্র দুর্যোগকালীন জনসাধারণ ও গবাদিপশুর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অবকাঠামোগুলোয় নানা ত্রুটি দেখা দিয়েছে। দেওয়ালে ফাটল, প্লাস্টার ক্ষয়, স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, ছাদে পানি জমে থাকার কারণে মনে হবে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিজেই এখন আশ্রয় খুঁজছে। নষ্ট হয়ে গেছে সোলার সিস্টেম (সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা)। দেশের ভিন্ন এলাকায় ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের সবগুলোতেই এমন সমস্যা পেয়েছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)। সম্প্রতি ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (২য় পর্যায়)’ প্রকল্পের প্রভাব মূল্যায়ন সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইএমইডি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল, প্লাস্টার ক্ষয়, দেওয়াল স্যাঁতসেঁতে, ছাদে পানি জমে থাকা এবং দরজা-জানালার দুর্বলতা দীর্ঘমেয়াদে কাঠামোগত স্থায়িত্ব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এ ছাড়া গভীর নলকূপ ও গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল নির্মাণের ক্ষেত্রেও অসঙ্গতি দেখা গেছে।

জানা গেছে,  ‘উপকূলীয় ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় বহুমুখী ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ (২য় পর্যায়)’ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুলাইয়ে শুরু হয়ে ২০২২ সালের জুনের মধ্যে বাস্তবায়ন হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে।

শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৩৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত। পরে প্রথম সংশোধনীতে ব্যয় বাড়িয়ে ৫৫৬ কোটি ৬ লাখ টাকা করা হয় এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনীতে ব্যয় অপরিবর্তিত রেখে মেয়াদ আরও এক বছর বাড়িয়ে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় সংশোধিত ব্যয়ের বিপরীতে ৫৪৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়।

প্রকল্পে দেশের তিন বিভাগের ১৬ জেলার ৮৬টি উপজেলায় প্রকল্পের আওতায় ২২০টি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। এসব কেন্দ্রে ১৮৬টি গভীর নলকূপ, ১২০টি গবাদিপশুর আশ্রয়স্থল, ২২০টি সোলার সিস্টেম, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা এবং প্রায় ২৯ কিলোমিটার আরসিসি সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে।

আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পের ৯৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ অর্থ ব্যয় করে কাজ শেষ হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বিভিন্ন সেবা ও অবকাঠামো এখন ঝুঁকির মুখে। সব আশ্রয়কেন্দ্রের সোলার সিস্টেম অকার্যকর। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং কার্যকর তদারকির অভাবে এসব সিস্টেম ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে দুর্যোগকালীন সময়ে বিকল্প বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে উপকারভোগীরা বঞ্চিত হচ্ছেন। এ ছাড়া অনেক স্থানে সেপটিক ট্যাংক ও শৌচাগার ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এ ছাড়া বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যথাযথ পরিচর্যার অভাবে কার্যত ব্যবহার হচ্ছে না। আইএমইডির তথ্যমতে, প্রকল্পে ২২০টি গবাদিপশুর আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্য থাকলেও নির্মাণ করা হয়েছে ১২০টি। গভীর নলকূপ স্থাপনের লক্ষ্য ছিল ২২০টি, কিন্তু স্থাপন করা হয়েছে ১৮৬টি। এর মধ্যেও যেসব নলকূপ অকার্যকর হয়ে গেছে সেগুলোও সময়মতো মেরামত করা হচ্ছে না। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রয়োজন ও স্থানভিত্তিক চাহিদা বিবেচনায় নলকূপ বসানো হয়েছে। তবে যেসব আশ্রয়কেন্দ্রে গভীর নলকূপ নেই, সেখানে দুর্যোগের সময় নিরাপদ পানির প্রাপ্যতায় সীমাবদ্ধতা দেখা দিতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আইএমইডি জানায়, প্রকল্পটি উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানুষের জীবন ও সম্পদ সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। প্রকল্পের আওতায় নির্মিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলো দুর্যোগের সময় নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করে প্রাণহানি ও সম্পদহানি কমাতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে জাতীয় জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধিতেও ইতিবাচক অবদান রাখছে। এর ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার মতো দুর্যোগে মানুষের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বেড়েছে এবং দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াও তুলনামূলক দ্রুত হয়েছে।

প্রতিবেদনে সুপারিশ করা হয়েছে, সার্বিকভাবে প্রকল্পটি তার মূল উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়িত্ব ও পূর্ণাঙ্গ কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত কারিগরি জনবল, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা অপরিহার্য। উপজেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্পৃক্ত করে সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে জরুরিভিত্তিতে ভবনের ফাটল, প্লাস্টার ক্ষয়, ছাদের পানি নিষ্কাশন, দরজা-জানালার সংস্কার, সোলার সিস্টেম ও ডিপটিউবওয়েল মেরামত করে সচল করতে হবে। এ ছাড়া নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ, কার্যকর তদারকি এবং অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত