চট্টগ্রামে এখনো পানিবন্দি ৬ লাখ ৬২ হাজার মানুষ

টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট বন্যায় চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও চন্দনাইশে পানি কিছুটা কমলেও প্লাবিত এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ কমেনি। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ভেঙেপড়া যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এখনো লাখো মানুষ মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। বহু ঘরবাড়িতে এখনো পানি জমে থাকায় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অসংখ্য পরিবার পুরোপুরি শুকনো খাবারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত থাকায় প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছানো ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকা তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন।

গতকাল শনিবার বিকেল পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ছয় লাখ ৬২ হাজার মানুষ সম্পূর্ণ পানিবন্দি অবস্থায় আছেন। ৬৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ২২ হাজার ৬০০ জন দুর্গত মানুষ।

বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার অবস্থা ভয়াবহ, দুর্গম এলাকায় পৌঁছাচ্ছে না ত্রাণ : উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়ায়। বাঁশখালীতে এখনো দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সেখানে ১১২ আশ্রয়কেন্দ্রে পাঁচ হাজার ৭৬৮ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। এ উপজেলায় এখন পর্যন্ত তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির অভাব।

উপজেলার প্রধান সড়কের আশপাশের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কিছু সরকারি ও বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী পৌঁছালেও দুর্গম প্রত্যন্ত অঞ্চলে কোনো সাহায্য যাচ্ছে না বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।

বন্যাপরিস্থিতি অবনতি হওয়ার পর থেকে টানা তিন দিন বাঁশখালীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করছেন স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী রিয়াদুল ইসলাম রিয়াদ। তিনি মাঠের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, বাঁশখালী প্রধান সড়কের আশপাশের এলাকায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছালেও দুর্গম ছনুয়া, শেখেরখীল, বাহারছড়া ও কাথরিয়া ইউনিয়ন এখনো পুরোপুরি পানিতে প্লাবিত। এসব এলাকায় এখনো কোনো ত্রাণসামগ্রী যাচ্ছে না। যারা ত্রাণ দিতে আসেন, তারা রাস্তার পাশের সহজ এলাকাগুলোতে ত্রাণ দিয়ে চলে যান। আবার অনেকেই ত্রাণ বিতরণ কেবলই ফটোসেশনে সীমাবদ্ধ।

অপরদিকে সাতকানিয়া উপজেলায় তিন লাখ ৫২ হাজার ৫০০ জন মানুষ এখনো পানিবন্দি হয়ে আছেন। ১৪৭ আশ্রয়কেন্দ্রে  ১২ হাজার ৩০০ দুর্গত লোক আশ্রয় নিয়েছেন। উপজেলার সোনাকানিয়া, কেওচিয়া, ঢেমশা, নলুয়া, কাঞ্চনা, বাজালিয়া ইউনিয়নসহ পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রামীণ সড়কগুলো পুরোপুরি পানির নিচে থাকায় নৌকা ছাড়া চলাচলের কোনো উপায় নেই। ফলে দুর্গত এলাকায় সরকারি ত্রাণ ও শুকনো খাবার পৌঁছাতে প্রশাসনকে বেগ পেতে হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানির সংকট, খাদ্যের অভাব এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।

এদিকে চট্টগ্রাম জেলার ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান জানান, দুর্গতদের জরুরি মানবিক সহায়তা হিসেবে জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে এখন পর্যন্ত ৩০ হাজার ৭০০ প্যাকেট শুকনো খাবার এবং ১৭ হাজার ২৫০ প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগকবলিত মানুষের জন্য সরকারি বিশেষ বরাদ্দ থেকে ৫০০ টন চাল এবং ৪৩ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মাধ্যমে বণ্টন করা শুরু হয়েছে।

স্পিডবোট নিয়ে মাঠে সেনাবাহিনী : ভয়াবহ এই মানবিক বিপর্যয়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে উদ্ধার অভিযান ও ত্রাণ বিতরণ জোরদার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর মূল সড়ক থেকে অন্তত পাঁচ কিলোমিটার ভেতরে ডুবে যাওয়া ঘরগুলো থেকে অসুস্থ ও বৃদ্ধদের স্পিডবোট ও নৌকায় করে উদ্ধার করছেন সেনাসদস্যরা। শুধু উদ্ধার কাজই নয়, অবরুদ্ধ হয়ে থাকা সাধারণ মানুষের মাঝে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রামের অবস্থা ‘ভয়াবহ খারাপ’ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী : গতকাল বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির সঙ্গে এক জরুরি মতবিনিময় শেষে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসেইন চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ভয়াবহ খারাপ’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া আমরা গত চার-পাঁচ দিন ধরে পর্যবেক্ষণ করছি। এখানকার অবস্থা আসলে অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের হাতে পর্যাপ্ত ত্রাণ মজুদ আছে। স্থানীয় প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের লজিস্টিক ও খাদ্য সহায়তা সরবরাহ করা হচ্ছে।