কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ৭ গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। রাস্তা ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে বন্যায় রূপ নিয়েছে। এতে করে শিশু ও নারীসহ অর্ধশতাধিক মানুষ ঠা-াজনিত ও পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। জলাবদ্ধতার কারণে শিক্ষার্থীরা স্কুল ও মাদ্রাসায় যেতে পারছে না। তাদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক স্থানে জলাবদ্ধতায় পুকুরের মাছ ভেসে গিয়ে ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন মাছচাষীরা। ইস্টউড সিটি নামের একটি আবাসন কোম্পানি বালু ফেলে ছোট বড় ৬টি পানি নিষ্কাশনের সরকারি খাল ভরাট করে দখলে নেওয়ায় এ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাঞ্চন পৌরসভার হাটাবো টেকপাড়া, কালাদি, নলপাথর, নরাবো, কোশাব, আইতলা, ডুলুরদিয়া গ্রামে প্রায় ২০ হাজার মানুষের বসবাস। এসব গ্রামের কৃষিজমিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য ছোট বড় সব মিলিয়ে প্রায় ৬টি খাল রয়েছে। খালগুলো দিয়ে বৃষ্টির পানি সরে যেত। কয়েক বছর ধরে ইস্টউড সিটি আবাসন প্রকল্প পানি নিষ্কাশন সরকারি খালগুলো ভরাট করে দখলে নিয়ে গেছে। এতে করে বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে এলাকাগুলো। বিশেষ করে, হান্ডি মার্কেট হতে ডেওরি বিল পর্যন্ত খাল, মুকসুর বাড়ি থেকে মগার বাড়ি পর্যন্ত চিপা খাল, কালাদি থেকে ভুলতা বড় খাল, বাড়ৈপাড় থেকে ডুলুরদিয়া হয়ে নলপাথর খাল, ইকবালেরটেক থেকে নরাব খাল এবং নরাব থেকে নলপাথর পানি নিষ্কাশন খালটি বালু ভরাট করে বন্ধ করে ফেলা হয়েছে।
ওইসব এলাকায় বেশ কয়েকটি পাকা রাস্তা পানিতে ডুবে গেছে। ময়লা ও আবর্জনাযুক্ত এসব পানিতে শিশু, বৃদ্ধ থেকে শুরু করে নারী-পুরুষরা পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। গত কয়েক দিনে অর্ধশতাধিক মানুষ পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।
এসব গ্রামের মানুষ এ সমস্যায় ভুগছেন প্রায় ৬ বছর ধরে। এ ছাড়াও গোলাকান্দাইল, নাগেরবাগ, পাচাইখা, বরাবো, পবনকুলসহ আরও বেশ কয়েকটি এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়রা জানান, গ্রামবাসী বিভিন্ন সময়ে মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালন করেও সরকারি খাল উদ্ধার করতে পারেনি। উপজেলা প্রশাসন সরেজমিনে গিয়ে লোকদেখানো খাল উদ্ধারের কার্যক্রম করলেও পরবর্তী সময়ে আর খাল উদ্ধার হয় না। মানুষের ভোগান্তি থেকেই যায়।
নলপাথর গ্রামের আজু মিয়া জানান, ইস্টউড সিটি বালু ফেলে ভরাট করার কারণে নল পাথর এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তারা কাজে যেতে পারছেন না । জলাবদ্ধতার কারণে রাস্তায় কোমর পর্যন্ত পানি উঠে গেছে। সরকারের কাছে তাদের একটাই চাওয়া, অতি দ্রুত সময়ে যেন খাল খনন করে দেওয়া হয়।
নড়াবো এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা ইমান আলী বলেন, ‘আমার ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। এ কারণে খাবার দাবার রান্না কিছুই করতে পারছি না। অনেক কষ্টের মধ্যে আছি। এসব হাউজিং প্রকল্প বালি ফেলে আমাদের খালগুলো দখল করে রেখেছে। আমরা চাই অতি দ্রুত সময় যেন সরকারি খালগুলো খনন করা হয়।’
কালাদী এলাকার আলী হোসেন বলেন, ‘অল্প বৃষ্টি হলেই আমাদের রাস্তাঘাট তলিয়ে যায়। আমাদের খাল নেই, খালগুলো দখল করে রেখেছে। ৫-৭ দিনের বৃষ্টিতে আমাদের রাস্তাঘাট সব তলিয়ে গেছে। আমাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না। খুব কষ্টের মধ্যে আমাদের জীবন কাটছে এখন।’
টেকপাড়ার রাহেলা বেগম বলেন, ‘৫-৬ দিন যাবত অনেক বৃষ্টি এবং বৃষ্টির কারণে আমাদের ঘরের ভেতরে পানি ঢুকে গেছে। ঘর থেকে বের হতে পারছি না। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না। ঠিকমতো আমরা রান্না ও খাওয়া দাওয়া করতে পারছি না। সব মিলিয়ে খুব কষ্টের মধ্যে আছি। আমাদের দেখারও কেউ নেই।’ অতি দ্রুত সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে ইস্টউড সিটির ল্যান্ড অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, খালের জায়গা রেখেই বালু ভরাট করা হয়েছে।
রূপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাদল কুমার সাহা বলেন, ‘ইদানীং চর্ম ও পানিবাহিত রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। আমরা তাদের চিকিৎসা ও ওষুধপত্র দিচ্ছি। তবে ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি থেকে সবাইকে সাবধান থাকতে হবে।’
কাঞ্চন পৌরসভার প্রশাসক মারজানুর রহমান বলেন, ‘জলাবদ্ধতার বিষয়ে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। হাউজিং প্রকল্প অবৈধভাবে সরকারি খাল বালু দিয়ে ভরাট করার কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় সব থেকে বেশি দুর্ভোগে রয়েছেন নলপাথর, নলিটেক নড়াবো, হাটাবোটেক পাড়া কালাদিসহ ৭ গ্রামের মানুষ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সরকারি খাল উদ্ধার করে জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করব।’
জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধানে অবৈধভাবে ভরাট হওয়া খাল পুনরুদ্ধার, পানি নিষ্কাশনের পথ সচল এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছন এলাকাবাসী। তাদের প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিলে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন হাজারো পানিবন্দি মানুষ।