মিকেল ‘ম্যাজিক’ মেরিনো

ফুটবল মাঠে ভাগ্য আর জেদের মেলবন্ধন যখন ঘটে, তখন সাধারণ একজন খেলোয়াড়ও হয়ে ওঠেন এক উজ্জ্বল গল্পের নায়ক। লস অ্যাঞ্জেলেসের মাঠে শুক্রবার রাতে ঠিক এমনই এক দৃশ্য দেখল বিশ্ব; যেখানে ৮৬ মিনিট পর্যন্ত স্পেনের ভাগ্য ঝুলে ছিল সূক্ষ্ম সুতায়। আগের ম্যাচে পর্তুগালের বিপক্ষে যেভাবে শেষ সময়ে মাঠে নেমে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন মিকেল মেরিনো, বেলজিয়ামের বিপক্ষে ঠিক সেই একই আস্থার জায়গা থেকে তাকে মাঠে নামান কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে। আর কোচের সেই আস্থার প্রতিদান দিতে মেরিনোর সময় লাগল মাত্র দুই মিনিট!

মাঠে নামার মুহূর্তেই বেলজিয়ান গোলরক্ষকের হাত থেকে ফসকে আসা বলটি জালে জড়াতেই যেন ফুটবল বিধাতা নিজেই জয়টি তুলে দিলেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডারের পায়ে। একই আসরে টানা দুই নকআউট ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে জয়সূচক গোল, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন ঘটনা এই প্রথম। তবে মিকেল মেরিনোর কাছে এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; বরং তার ইনজুরি ও লড়াইয়ের এক অবিশ্বাস্য উত্তরণ। গোল করার পর নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে মেরিনো বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য। এমন কিছু ঘটবে তা আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। যখনই আমি মাঠে নামি, আমার কেবল একটিই লক্ষ্য থাকে দলের প্রয়োজনে অবদান রাখা এবং সৃষ্টিকর্তার অশেষ কৃপায় আমি সফল হচ্ছি।’

পাম্পলোনার ছেলে মেরিনোর বড় মঞ্চে জ¦লে ওঠার অভ্যাস নতুন নয়। দেশের জার্সিতে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করার এক সহজাত দক্ষতা তিনি অর্জন করে ফেলেছেন। ২০২৪ ইউরোর কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে জয়সূচক গোলটি এসেছিল তার হেড থেকেই। এক বছর পর ফ্রান্সের বিপক্ষে নেশনস লিগের সেই রোমাঞ্চকর ৫-৪ ব্যবধানের জয়েও তার নাম ছিল স্কোরলাইনে। আর চলতি বিশ্বকাপে পর্তুগালের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের সেই গোল তো এখন স্প্যানিশ ফুটবল রূপকথার অংশ। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দলে রদ্রি, ফাবিয়ান রুইজ, দানি অলমো বা পেদ্রির মতো তারকারা যখন মিডফিল্ড শাসন করেন, তখন মেরিনোর মতো একজন খেলোয়াড়ের বেঞ্চে বসে থাকাটা স্বাভাবিক। কিন্তু তিনি কোনো অভিযোগ ছাড়াই নিজের এই ভূমিকা মেনে নিয়েছেন, কারণ তিনি জানেন, খেলার শেষ কয়েক মিনিটে তার মাঠে নামা মানেই এখন বিপক্ষ দলের জন্য এক চূড়ান্ত সতর্কতা।

মেরিনোর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প। বছরের শুরুতে আর্সেনালের হয়ে খেলতে গিয়ে পায়ের যে স্ট্রেস ফ্র্যাকচারে আক্রান্ত হন, তা চিকিৎসকদের কাছেও ছিল এক নতুন অভিজ্ঞতা। টানা দুই মাস তিনি ছিলেন ঘরবন্দি, হুইলচেয়ার ছাড়া চলাফেরা করাই ছিল অসম্ভব। সেই সময়টায় তার পাশে ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী লোলা। আজ যখন তিনি গোল করে কর্নার ফ্ল্যাগের দিকে দৌড়ান, তখন তার চোখের সামনে ভাসে সেই কঠিন দিনগুলোর স্মৃতি। পাম্পলোনার সেই উৎসবের দিনে তার বাবা অ্যাঞ্জেল মিগেল ঠিক যেভাবে গোল উদযাপন করেছিলেন, মেরিনো বারবার সেই স্মৃতিই ফিরিয়ে আনেন। তার এই গোলগুলো কেবল দেশের জন্য নয়, বরং নিজের বাবার লড়াই এবং নিজের সেই হুইলচেয়ারের দিনগুলোর প্রতি এক নীরব শ্রদ্ধা।

কোচ দে লা ফুয়েন্তে তাকে ‘টেইলর-মেড’ বা এই দলের জন্য বিশেষভাবে তৈরি খেলোয়াড় বলে সম্বোধন করেন। তার বহুমুখী প্রতিভার কারণে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার থেকে স্ট্রাইকার দলের প্রয়োজনে যেকোনো ভূমিকায় তিনি নিজেকে মেলে ধরতে পারেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাকে যখন স্ট্রাইকার হিসেবে নামানোর কথা ভাবছিলেন কোচ, মেরিনো যেন তখন থেকেই মনে মনে গোলটি সাজিয়ে ফেলেছিলেন। তার এই বীরত্বের গল্পের মূলমন্ত্রই হলো ‘রাইট টাইমে, রাইট প্লেস’। তার এই প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি সুন্দর গল্পের অংশ, যেখানে ইনজুরির তিক্ততাকে জয় করে তিনি পৌঁছে গেছেন বিশ্বজয়ের দ্বারপ্রান্তে।