নতুন রূপে ফিরছে বরিশালের জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে অবহেলা আর অব্যবস্থাপনার প্রতীক হয়ে থাকা বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর তীরে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম নতুন রূপে ফিরছে। প্রায় ২১ বছরের স্থবিরতা কাটিয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের (এনএসসি) অধীনে চলমান প্রায় ৬৫ কোটি টাকার মেগা আধুনিকায়ন প্রকল্পের কাজ শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, চলতি বছরের মধ্যেই মাঠটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশ স্টেডিয়াম আবারও ক্রিকেটের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে বলে প্রত্যাশা দক্ষিণাঞ্চলের ক্রীড়াপ্রেমীদেরও।

জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই স্টেডিয়ামটি ১৯৬০ সালে নির্মিত হলেও আন্তর্জাতিক মানের ভেন্যু হিসেবে কখনোই পূর্ণতা পায়নি। ২০০৬ সালে প্রথম দফায় ফ্লাডলাইট, প্যাভিলিয়ন ও মিডিয়া সেন্টার নির্মাণ করা হলেও পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাঠটি ধীরে ধীরে খেলার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে দীর্ঘদিন জাতীয় ক্রিকেট লিগ, বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন সম্ভব হয়নি।

২০২২ সালে এসএসসির উদ্যোগে স্টেডিয়ামটিকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে বৃহৎ আধুনিকায়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রকল্পের আওতায় ইতিমধ্যে নির্মিত হয়েছে আধুনিক পাঁচতলা প্যাভিলিয়ন, আন্তর্জাতিক মানের মিডিয়া সেন্টার, প্যাসেঞ্জার লিফট, নতুন ড্রেসিংরুম, ইনডোর প্র্যাকটিস নেট, উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও আধুনিক ফ্লাডলাইট। সম্পন্ন হয়েছে মূল ক্রিকেট পিচ ও আউটফিল্ডের সংস্কার, যা দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের সবচেয়ে জটিল অংশ হিসেবে বিবেচিত ছিল।

বর্তমানে স্টেডিয়ামে এলইডি ফ্লাডলাইটের চূড়ান্ত সংযোজন, মাঠের সৌন্দর্যবর্ধন, দর্শক গ্যালারির শেষ মুহূর্তের ফিনিশিং ও কারিগরি পরীক্ষার কাজ চলছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সব কাজ শেষ হবে বলে তারা আশাবাদী।

স্থানীয় ক্লাবের ক্রিকেট কোচ জুয়েল মল্লিক জানান, ‘এক সময় মাঠের আউটফিল্ডের মান এতটাই খারাপ ছিল যে, উন্নয়নকাজ বারবার থমকে গেছে। পরে নতুন করে পরিকল্পনা গ্রহণ করে পুরো আউটফিল্ড পুনর্নির্মাণ করা হয়। আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের জন্য যে ধরনের মান দরকার, সেই লক্ষ্যেই এখন কাজ করা হয়েছে।’

স্থানীয় ক্রিকেটারদের মতে, বরিশালের অসংখ্য প্রতিভাবান খেলোয়াড় কেবল অবকাঠামোগত সংকটের কারণে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের সঠিকভাবে তুলে ধরার সুযোগ পাননি। বহু বছর ধরে জাতীয় লিগ, প্রথম বিভাগ কিংবা বড় টুর্নামেন্ট নিয়মিত না হওয়ায় নতুন প্রজন্মের ক্রিকেটারদের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। তরুণ ক্রিকেটার মো. সাদ বলেন, ‘যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ হয়, তাহলে শুধু বরিশাল নয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চলের ক্রিকেটের জন্য এটি বড় সুবিধা এনে দেবে।’

এদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নতুন করে বরিশালকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মানচিত্রে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে। স্টেডিয়ামটি প্রস্তুত হলে এখানে জাতীয় ক্রিকেট লিগ, বয়সভিত্তিক আন্তর্জাতিক সিরিজ, নারী ক্রিকেট ও ভবিষ্যতে বিপিএলের ম্যাচ আয়োজনের সম্ভাবনাও তৈরি হবে। এ বিষয়ে বিসিবির পক্ষ থেকেও ইতিবাচক আগ্রহের কথা বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে।

বরিশাল জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্য সচিব মশিউর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘আমার প্রথম লক্ষ্য ছিল মাঠ দ্রুত প্রস্তুত করা। ইতিমধ্যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক করেছি। এই বছরই যেন বরিশালে বিপিএলের ম্যাচ আয়োজন করা যায়, সে লক্ষ্যেই সব কাজ দ্রুত শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’