ফিফার নতুন নিয়মের প্রথম শিকার এমবোলোর লালকার্ডে ক্ষুব্ধ সুইসরা

ফুটবল বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নিয়েছে সুইজারল্যান্ড। তবে ম্যাচ ছাড়িয়ে এখন ফুটবল বিশ্বে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে সুইস ফরোয়ার্ড ব্রেল এমবোলোর লাল কার্ড। ফিফার নবপ্রবর্তিত ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ বা ভুল পরিচয় সংশোধন আইনের গ্যাঁড়াকলে পড়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছে তাকে, যা বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই নিয়মে প্রথম লাল কার্ডের ঘটনা। এই সিদ্ধান্তকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়ে ফিফা ও রেফারির ওপর ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন।

ঠিক কী ঘটেছিল মাঠে?

কানসাস সিটির ম্যাচটিতে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর ৬৭ মিনিটে ড্যান এনদোয়ের গোলে সমতায় ফেরে সুইজারল্যান্ড। সুইসদের তখন জয়জয়কার অবস্থা। এর ঠিক ৫ মিনিট পর, অর্থাৎ ৭২ মিনিটে ঘটে সেই বিতর্কিত ঘটনা।

আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের একটি চ্যালেঞ্জের মুখে মাঠের ওপর ছিটকে পড়েন সুইস স্ট্রাইকার ব্রেল এমবোলো। পর্তুগিজ রেফারি জোয়াও পিনহেইরো শুরুতে মনে করেছিলেন পারেদেস ফাউল করেছেন এবং তিনি আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে হলুদ কার্ড দেখান। কিন্তু ঠিক তখনই হস্তক্ষেপ করে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি।

রেফারিকে অন-ফিল্ড মনিটর দেখার অনুরোধ জানানো হয়। ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায়, পারেদেসের শরীরের সাথে কোনো কন্টাক্ট হওয়ার আগেই এমবোলো ডাইভ দিয়েছেন। তার মানে রেফারি ভুলবশত পারেদেসকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন।

ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো রেফারি ভুল করে এক দলের খেলোয়াড়কে শাস্তি দেন কিন্তু অপরাধটি আসলে অন্য দলের খেলোয়াড় করে থাকেন (এখানে ডাইভ দিয়ে ফাউলের অভিনয়), তবে ভিএআর-এর সাহায্যে তা সংশোধন করা যাবে।

মনিটর দেখে এসে রেফারি পিনহেইরো পারেদেসের হলুদ কার্ড বাতিল করেন। ‘ভুল পরিচয় সংশোধন’ প্রোটোকল মেনে ডাইভ দেওয়ার অপরাধে ব্রেল এমবোলোকেই হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। প্রথমার্ধে ইতিমধ্যেই একটি হলুদ কার্ড দেখা (পারেদেসকে ফাউল করায়) ২৯ বছর বয়সী রেনেী এই ফরোয়ার্ডকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড অর্থাৎ লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়।

১০ জনের দলে পরিণত হওয়া সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত লড়াই করলেও শেষ রক্ষা হয়নি। ১১২ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেজ এবং ১২১ মিনিটে লাউতারো মার্তিনেসের গোলে জয় নিশ্চিত করে আর্জেন্টিনা। মাঠ ছাড়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন এমবোলো, সতীর্থরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন।

"এই নিয়ম ফুটবলকে ধ্বংস করেছে" — সুইস কোচ

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ ধরে রাখতে পারেননি সুইস মাস্টারমাইন্ড মুরাত ইয়াকিন। তিনি বলেন, "আমাদের এমন একটি নিয়মের কারণে শাস্তি দেওয়া হয়েছে যা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং ফুটবলের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। পরিস্থিতিটা ছিল খুবই সাধারণ, রেফারির খেলা চালিয়ে যেতে দেওয়া উচিত ছিল। ভিএআর-এর এই অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ আমাদের পুরো ম্যাচটাকে ধ্বংস করে দিয়েছে। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে সমতায় ফেরার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতেই ছিল। আমার ছেলেরা আজ সত্যিকারের হিরো, এভাবে বিদায় নেওয়াটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক।

মিডফিল্ডার রেমো ফ্রয়লারও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, "ফিফাকে অবশ্যই আমাদের কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে যে কীভাবে ভিএআর এমন একটা সিদ্ধান্ত নেয়।"

"নিজের দলকে ডুবিয়েছেন এমবোলো" — ফুটবল পণ্ডিতদের বিশ্লেষণ

কোচ ও খেলোয়াড়রা ক্ষুব্ধ হলেও ফুটবল বিশ্লেষকরা এমবোলোর প্রতি খুব একটা সহানুভূতি দেখাচ্ছেন না। আইটিভিতে সাবেক এমএলএস স্ট্রাইকার ব্র্যাডলি রাইট-ফিলিপস বলেন, 'সুইজারল্যান্ডের বাকি খেলোয়াড়দের জন্য আমার কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু এমবোলোর জন্য নয়। সেমিফাইনালে যাওয়ার সুযোগটা সে নিজেই তার দলকে হাতছাড়া করিয়েছে।'

সাবেক জ্যামাইকান ফুটবলার জোবি ম্যাকঅ্যানাফ যোগ করেন, 'স্লো মোশনে সবকিছুই আরও নিখুঁতভাবে দেখা যায় এবং সেখানে পরিষ্কার যে এটি সিমুলেশন (ডাইভ) ছিল। এমবোলো তার সতীর্থদের বিপদে ফেলেছেন।'

কী এই নতুন আইন?

রেফারিদের প্রধান পিয়েরলুইজি কোলিনার বিশেষ অনুরোধে ফিফা এই বিশ্বকাপে কিছু নতুন নিয়ম এনেছে। আগের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ফাউলের ঘটনায় রেফারি কার্ড দেওয়ার পর খেলা শুরু হয়ে গেলে বা ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দিলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকতো না। কিন্তু নতুন নিয়মে, যদি রেফারি সম্পূর্ণ বিপরীত দলের কাউকে ভুল করে কার্ড দেন, তবে ভিএআর মনিটর দেখে মূল অপরাধীকে (যেমন এখানে ডাইভ দেওয়া খেলোয়াড়কে) সনাক্ত করে কার্ড দেওয়া যাবে। টুর্নামেন্টের শুরুতে নেদারল্যান্ডস বনাম যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচেও এই নিয়মের আংশিক ব্যবহার দেখা গিয়েছিল।