গণতন্ত্রের নতুন দিগন্ত

আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে, কিছু মুহূর্ত শুধু একটি রায়, সিদ্ধান্ত বা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সেগুলো গণতান্ত্রিক অভিযাত্রাকে নতুন অর্থ দেয়, রাষ্ট্রচিন্তাকে নতুন দিকনির্দেশনা এবং ইতিহাসের গতিপথে নতুন অধ্যায় সূচনা করে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ এবং সাম্প্রতিক হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ঠিক এমন মুহূর্তের সাক্ষী হলো। এটি নিছক আইনি রায় নয়; বরং জাতির নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রয়াস, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদলের নিশ্চয়তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জনগণের বিশ্বাস পুনঃস্থাপনের এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

১৯৯৬ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা সাংবিধানিক রূপ লাভ করে। সংশোধনীটি ছিল দেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ঘটনা। এই ব্যবস্থার মূল কাঠামো ছিল সহজ, অথচ কার্যকর। নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে, যার নেতৃত্বে

থাকবেন সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি অথবা সংবিধানে বর্ণিত অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তি। সরকারের দায়িত্ব হবে কেবল রুটিন প্রশাসনিক কাজ পরিচালনা করা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন সম্পন্ন করা।  সরকারের দায়িত্বের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল, নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দেওয়া, প্রশাসনযন্ত্রে দলীয়করণ রোধ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ এবং সব রাজনৈতিক দলকে সমান সুযোগ প্রদান করা। এই ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশে^র সামনে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পালাবদল। যে দেশে নির্বাচনের ফল নিয়ে সন্দেহ থাকে, যে দেশে ক্ষমতাসীন দল নিজের অনুকূলে প্রশাসন সাজিয়ে নির্বাচন করে, সেই দেশে গণতন্ত্র কেবল কাগজে-কলমে টিকে থাকে, বাস্তবে নয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাজনৈতিক সংকটের একটি

বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে আবার আবির্ভূত হলো।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার পালাবদল যখন প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মে ঘটে, তখন রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস পায়, বিনিয়োগের পরিবেশ স্থিতিশীল হয় এবং জনগণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পায়। আবার যখন এই ব্যবস্থা অনুপস্থিত থাকে, তখন প্রতিটি নির্বাচনের আগে দেশ এক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিমজ্জিত হয়। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সফলতা ও ব্যর্থতা নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। এর পক্ষে যুক্তি যেমন শক্তিশালী, তেমনি বিপক্ষেও যুক্তির অভাব নেই। সফলতার দিক থেকে বলা যায়, এই ব্যবস্থা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করে।

২০১১ সালের দিকে তাকালে দেখা যায়, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে একটি রায় দেয়। এই রায়ের ভিত্তিতে ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করা হয়, যার মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে সংবিধান থেকে বিলুপ্ত করা হয়। একই সঙ্গে গণভোটের বিধানও বাতিল করা হয়েছিল। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের প্রায় চুয়ান্নটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত ছিল তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তি। এই সিদ্ধান্তের পর থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন-পূর্ব সংকট নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়। কিন্তু এবার ২০২৬ সালে বিএনপি সরকারের সময় এর আপাত সমাধান হলো।

সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত চুয়াত্তর পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সবশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিই নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।’ যা পূর্ববর্তী বিতর্কের একটি বড় জায়গা সমাধান করে দিয়েছে। এ ছাড়া রায়ে বলা হয়েছে, ‘আসন্ন চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকেই এই ব্যবস্থা কার্যকর হবে।’ আদালতের এই সিদ্ধান্ত শুধু অতীতের একটি ভুল সংশোধনের প্রয়াস নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট রূপরেখা তৈরির প্রচেষ্টা। আইনজীবীরা জানিয়েছেন, বর্তমান সংসদ চাইলে এই ব্যবস্থার প্রয়োজনীয় সংযোজন বা বিয়োজন করার ক্ষমতা রাখে। অর্থাৎ ব্যবস্থাটি একেবারে অপরিবর্তনীয় নয়, বরং সময়ের প্রয়োজনে সংস্কার আনার সুযোগ সংসদের হাতে রাখা হয়েছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য। একদিকে সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা, অন্যদিকে প্রয়োজনে সংস্কারের নমনীয়তা।  সাম্প্রতিকতম ঘটনাপ্রবাহে দেখা যায়, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের রায় সম্পূর্ণভাবে বহাল রেখেছেন, যার ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পাশাপাশি সংবিধানে গণভোট ব্যবস্থাও পুনরায় ফিরে এসেছে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশকের একটি রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্কের অবসান ঘটল বলে অনেকে মনে করছেন। গণভোট ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সরাসরি জনমত যাচাইয়ের একটি সাংবিধানিক পথ পুনরায় উন্মুক্ত হলো।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনর্বহাল, বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ মোড়। তবে মনে রাখা জরুরি, কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো একা গণতন্ত্রের সব সংকট দূর করতে পারে না। তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি হাতিয়ার মাত্র। এর সফল প্রয়োগ নির্ভর করবে রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক সহনশীলতা, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, প্রশাসনযন্ত্রের নিরপেক্ষতা এবং সর্বোপরি জনগণের সচেতন অংশগ্রহণের ওপর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রত্যাবর্তন যদি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, রাজনৈতিক সহিংসতা হ্রাস করতে পারে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করতে পারে, তবে এই ঐতিহাসিক রায় প্রকৃত অর্থে সার্থক হবে। আজকের এই সাংবিধানিক পরিক্রমা আগামী দিনের গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পথে একটি মজবুত ভিত্তি হয়ে উঠুক এটাই সময়ের দাবি ও জাতির প্রত্যাশা।

লেখক : কলাম লেখক ও গবেষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

sultanmh17@gmail.com