ফ্রান্স-স্পেন প্রতিশোধ আর আধিপত্যের লড়াই

২০০৬ সালে হানোভারের সেই সন্ধ্যাটা এখনো স্পেন সমর্থকদের বুকে কাঁটার মতো বিঁধে আছে। জিনেদিন জিদানের পায়ের জাদুতে সেদিন থমকে যায় লা রোহারা। ৩-১ ব্যবধানে হেরে রাউন্ড অব ১৬ থেকেই বিদায় নেয় দলটি। বিশ্বকাপে দুই দলের সেটাই ছিল প্রথম এবং একমাত্র দেখা। দুই দশক পর সেই স্মৃতির জ্বালা এখনো স্পেনের ফুটবলারদের রক্তে মিশে আছে। আজ টেক্সাসের আরলিংটনে এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের গ্যালারি যখন গমগম করবে, তখন ওই পুরনো ক্ষততে কি প্রলেপ দিতে পারবে স্প্যানিশরা, নাকি এবারও একই পরিণতি বরণ করতে হবে তাদের! ফ্রান্সের বুকেও জ্বলছে প্রতিশোধের আগুন। দে লা ফুয়েন্তের দলের কাছে হেরে সর্বশেষ ইউরোর সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়ে তারা। এবার দুই দলের সামনে বিশ্বকাপের ফাইনালের টিকিট ছাপিয়ে এটা হয়ে উঠবে প্রতিশোধ, ইতিহাস আর আধিপত্যেরও লড়াই।

ফ্রান্স নাকি স্পেন? এই কৌতূহল এখন গোটা ফুটবল দুনিয়াকে মাতিয়ে রেখেছে। বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে টুর্নামেন্টের সবচেয়ে ভয়ংকর দুই দল। যাদের লড়াইকে বিশ্লেষকরা আগেভাগেই নাম দিয়ে ফেলেছেন ফাইনালের আগে আরেক ফাইনাল। এবারের বিশ্বকাপে এখনো একটি ম্যাচেও হারেনি ফ্রান্স-স্পেন। যদিও সেমিফাইনালে ওঠার পথ দুই দলের জন্য ছিল দুই মেরুর গল্প। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ২-০ গোলের জয়ে অনেকটা নির্বিঘেœই শেষ চারের টিকিট পায় দিদিয়ের দেশমের দল। বেলজিয়ামের বিপক্ষে স্পেন সেমিফাইনালে পৌঁছেছে হৃদস্পন্দন থামিয়ে দেওয়ার মতো নাটকীয় পরিস্থিতির জন্ম দিয়ে। শেষ মুহূর্তে পাওয়া ২-১ ব্যবধানের রুদ্ধশ্বাস জয়ে ২০১০ সালের পর বিশ্বকাপের শেষ চারে পা রেখেছে দলটি।

এই নিয়ে টানা তৃতীয়বার কোনো বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স-স্পেন। যদিও সাম্প্রতিক ইতিহাস স্পষ্টভাবেই স্পেনের পক্ষে। ২০২৪ ইউরোর সেমিফাইনালে র‌্যান্ডাল কোলো মুয়ানির গোলে এগিয়ে থেকেও লামিন ইয়ামাল আর দানি ওলমোর গোলে ২-১ ব্যবধানে হারতে হয় ফরাসিদের। এরপর নেশন্স লিগের গোলবন্যার লড়াইয়ে ৫-৪ ব্যবধানে জয় পায় স্পেন। টানা দুই বড় মঞ্চে হারের তিক্ত স্মৃতি নিয়েই তৃতীয়বারের মতো স্পেনের মুখোমুখি হবে ফ্রান্স। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ৩৮ বার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল, জয়-পরাজয়ের হিসেবে ব্যবধান সামান্যই। লা রোজারা জিতেছে ১৮ ম্যাচে, ফরাসিদের জয় ১৩টি এবং বাকি ৭ ম্যাচ অমীমাংসিতভাবে শেষ হয়। কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে একমাত্র লড়াই সেই ২০০৬ সালের স্মৃতিটাই এখনো ফরাসিদের গর্বের সবচেয়ে বড় পুঁজি।

এবারের বিশ্বকাপে আক্রমণে সবচেয়ে ভয়ংকর দলগুলোর একটি ফ্রান্স। ছয় ম্যাচে ১৬ গোল করে তারা বারবার তছনছ করে দিয়েছে প্রতিপক্ষের রক্ষণকে। অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে একাই ৮টি গোল করেছেন, সঙ্গে তিনটি অ্যাসিস্ট নিয়ে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার আগে তিনি। সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপের ২০টি ম্যাচ খেলার মাইলফলক ছোঁয়ার কীর্তি গড়েন ২৭ বছর বয়সী এই ফুটবলার, পাশাপাশি হুগো লরিসের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা ফরাসি ফুটবলারের তালিকাতেও নাম লিখিয়েছেন তিনি। রক্ষণেও এবার আগের চেয়ে শক্তিশালী ফ্রান্স, নকআউট পর্বে একটি গোলও হজম করেনি তারা।

অন্যদিকে স্পেনেও ধারাবাহিক ফুটবলের ফুল ফুটিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এসেছে। তবে আক্রমণে যেন খানিকটা ছন্দহীন দেখাচ্ছে তাদের। শেষ দুই নকআউট ম্যাচেই জয় নিশ্চিত করতে যোগ করা সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। এমনকি চোট কাটিয়ে টুর্নামেন্টে ফেরা লামিন ইয়ামাল নিজের ছন্দ দেখাতে পারেননি, যা ২০২৪ ইউরোতে স্পেনকে শিরোপা এনে দিয়েছিল। ইয়ামালকে নিয়ে ভয় নয়, সতর্ক ফরাসিরা। ডিফেন্ডার ইব্রাহিমা কোনাতে বলেন, ‘কাউকেই ভয় পাওয়া উচিত নয়। আমরা এখন যতটা সম্ভব ভালোভাবে প্রস্তুতি নেব এবং আশা করি, শেষ পর্যন্ত ফল আমাদের পক্ষেই যাবে।’ স্পেনের প্রশংসাও ঝরে তার কণ্ঠে, ‘স্পেন অসাধারণ দল। তাদের দলে অনেক উচ্চমানের খেলোয়াড় রয়েছে। তাই আমরা শুধু একজন খেলোয়াড়কে কেন্দ্র করে পরিকল্পনা করব না।’

এদিকে স্পেনও জানে, ফ্রান্সকে হারাতে নিখুঁত ফুটবল খেলতে হবে তাদের। কোচ লা ফুয়েন্তে বলেন, ‘ফ্রান্স দারুণ ছন্দে রয়েছে এবং আমাদের খেলার ধরন আলাদা। আমরা প্রতিপক্ষকে সর্বোচ্চ সম্মান করি, তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, যেকোনো দলকে হারানোর সামর্থ্য আমাদের আছে।’ একই সঙ্গে শেষ দুই সেমিফাইনালে নিজেদের আধিপত্যের কথাও মনে করিয়ে দেন তিনি, ‘তাদের অসাধারণ শক্তির কথা আমরা জানি। তবে এটাও জানি, আমরাই একমাত্র দল, যারা তাদের দুটি সেমিফাইনালে হারিয়েছে।’

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণী সংস্থা অপ্টার সুপারকম্পিউটার বলছে, নির্ধারিত সময়ে ফ্রান্সের জয়ের সম্ভাবনা ৪২.১ শতাংশ, স্পেনের ৩১.৮ শতাংশ। ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর সম্ভাবনা ২৬.১ শতাংশ। সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে, এই লড়াই কোনোভাবেই একপেশে হবে না। মাঠের লড়াইয়ের বাইরে এই ম্যাচ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি সেমিফাইনালগুলোর একটি হতে যাচ্ছে। দুই দলের খেলোয়াড়দের সম্মিলিত বাজারমূল্য প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৩৬,৬০০ কোটি টাকা। যেখানে ফ্রান্সের স্কোয়াডের মূল্য প্রায় ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার, স্পেনের প্রায় ১.৪৩ বিলিয়ন ডলার।

এসব থেকে চোখ সরিয়ে জয় ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা নেই দুই দলের। জিতলে টানা তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠবে ফ্রান্স। এমন কীর্তি এর আগে গড়েছে কেবল ব্রাজিল আর জার্মানি। অন্যদিকে স্পেনের চোখ ২০১০ সালের ফাইনালের টিকিট পেতে। ইউরোপের এই দুই দলের আধিপত্যের লড়াইয়ে এগিয়ে যাবে কে? উত্তর মিলবে আগামীকাল রাতে, যখন রেফারির শেষ বাঁশি বেজে উঠবে এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে।